E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

ইরান যুদ্ধে কূল-কিনারা না পেয়ে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন ট্রাম্প

২০২৬ মার্চ ২২ ১৭:৪১:৩৮
ইরান যুদ্ধে কূল-কিনারা না পেয়ে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরান যুদ্ধের তিন সপ্তাহ শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছেন; যা ক্রমেই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী, মিত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুদ্ধ কেবল এক ‘সাময়িক অভিযান’ হবে বলে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে ইরানের আরও সৈন্য মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে।

বিপর্যস্ত ট্রাম্প অবশ্য আত্মপক্ষ সমর্থন করে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোকে ‘কাপুরুষ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিতে সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানানোয় ন্যাটোর পাশে আর না দাঁড়ানোরও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প বলেছেন, সামরিক অভিযান পরিকল্পনা অনুযায়ীই এগোচ্ছে। তবে শুক্রবার ‘যুদ্ধে সামরিক বিজয় অর্জিত হয়েছে’ বলে তিনি যে ঘোষণা দিয়েছেন; বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইরান পারস্য উপসাগরে তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে এবং পুরো অঞ্চলে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রকে ‘নির্বোধ’ সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরে রাখার অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্প এখন নিজের শুরু করা এই যুদ্ধের ফলাফল কিংবা এর প্রচার; কোনোটিই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। যুদ্ধের কোনও সুনির্দিষ্ট প্রস্থান পরিকল্পনা না থাকায় ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং তার দলের ভবিষ্যৎ; উভয়ই ঝুঁকির মুখে। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা টিকিয়ে রাখা নিয়েও টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।

রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় প্রশাসনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‌‌‘‘ট্রাম্প নিজেই নিজের জন্য ‘ইরান যুদ্ধ’ নামের একটি খাঁচা তৈরি করেছেন এবং এখন তিনি সেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। এটিই এখন তার চরম হতাশার কারণ।’’

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ইরানের অনেক শীর্ষ নেতাকে নিশানা করে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে; দেশটির নৌবাহিনীর বেশিরভাগ অংশ ডুবিয়ে দেওয়া এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, এসব নজিরবিহীন সামরিক সাফল্য।

• ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

গত এক সপ্তাহে কূটনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক—সবক্ষেত্রেই ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌবাহিনী মোতায়েনে ন্যাটোর সদস্য ও অন্যান্য বিদেশি অংশীদারদের অস্বীকৃতিতে ট্রাম্প বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছেন।

এই আলোচনার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি বলেছেন, ট্রাম্প যাতে একা হয়ে না পড়েন, সেজন্য হোয়াইট হাউসের কিছু উপদেষ্টা তাকে দ্রুত একটি ‘সম্মানজনক প্রস্থানের পথ’ খোঁজার এবং সামরিক অভিযানের পরিসর সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এই যুক্তি ট্রাম্পকে কতটুকু প্রভাবিত করতে পারবে, তা এখনও অস্পষ্ট।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, মিত্রদের এই অনীহা কেবল একটি অপরিকল্পিত যুদ্ধে জড়ানোর ভয় নয়; বরং গত ১৪ মাসে ট্রাম্পের প্রথাগত মার্কিন মিত্রদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করারই প্রতিফলন। ইসরায়েলের সঙ্গেও মতভেদ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে ইসরায়েলি হামলা সম্পর্কে তিনি আগে কিছু জানতেন না। যদিও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সমন্বয় করা হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নিয়ে ট্রাম্প এখন উভয় সঙ্কটে পড়েছেন এবং তিনি কোন পথে এগোবেন সেটির কোনও পরিষ্কার রূপরেখা কিংবা ইঙ্গিত নেই।

তিনি সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে এবং মার্কিন অভিযান আরও তীব্র করতে পারেন। এমনকি খারগ দ্বীপে ইরানের তেল কেন্দ্র দখল অথবা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী যন্ত্রের খোঁজে ইরানের উপকূল বরাবর সৈন্য মোতায়েন করতে পারেন। কিন্তু এতে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক দায়বদ্ধতার ঝুঁকি থাকবে, যার বিরোধিতা করবে মূলত মার্কিন জনগণ।

অথবা, যেহেতু উভয় পক্ষই আপাতত আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে, ট্রাম্প বিজয় ঘোষণা করে সরে আসার চেষ্টা করতে পারেন। এতে উপসাগরীয় মিত্ররা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। কারণ তাদের সামনে থাকবে এক আহত ও বৈরী এমন এক ইরান; যে দেশটি তখনও অপরিশোধিত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করতে এবং উপসাগরে নৌচলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার কথা অস্বীকার করেছে।

শুক্রবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন সামরিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার অতিরিক্ত মেরিন ও নৌ সেনা মোতায়েন করছে। যদিও ইরানে স্থল অভিযান চালানোর জন্য মার্কিন সৈন্য পাঠানোর বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের ‘মেইক আমেরিকা গ্রেইট এগেইন’ আন্দোলনের ওপর একসময়ের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং প্রভাবশালী মার্কিনিরা এই সংঘাতের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন। যদিও সমর্থক গোষ্ঠী এখন পর্যন্ত তার পাশেই দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্যাসের দাম বাড়তে থাকলে এবং মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হলে আগামী সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

রিপাবলিকান স্ট্রেটেজিস্ট ডেভ উইলসন বলেন, ‘‘অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যখন স্পষ্ট হতে শুরু করবে, তখন মানুষ বলতে শুরু করবে, আমি আবার কেন গ্যাসের চড়া দাম দিচ্ছি?... আগামী মাসে আমি ছুটি কাটাতে পারব কি না, তা এখন হরমুজ প্রণালি কেন নির্ধারণ করছে?’’

• ভুল হিসাব-নিকেষ

মার্কিন প্রশাসনের দুটি সূত্র বলছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর হোয়াইট হাউসে বর্তমানে এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে, সংঘাতের পরিণতি নিয়ে আরও আগে থেকে বিশদ পরিকল্পনা করা উচিত ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ইরানের প্রতিক্রিয়া বুঝতে না পারা। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ইরান তার অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বহর দিয়ে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে আঘাত হানছে এবং বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল চলাচলের পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে।

সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের ওপর ট্রাম্পের ক্ষোভ বাড়ছে। যুদ্ধের নেতিবাচক খবর প্রচার করায় তিনি গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ‘দেশদ্রোহিতার’ ভিত্তিহীন অভিযোগও তুলছেন।

ওবামা প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ট্রাম্প এখন সংবাদপ্রবাহ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। কারণ কেন তিনি দেশকে যুদ্ধে জড়ালেন এবং এর শেষ কোথায়; সেটি তিনি ব্যাখ্যা করতে পারছেন না।

সূত্র: রয়টার্স।

(ওএস/এসপি/মার্চ ২২, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

২২ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test