E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতে না খেয়ে থাকছে বড়রা

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৭ ১৫:৫০:২৪
শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতে না খেয়ে থাকছে বড়রা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের শিবিরে যেদিন কমিউনিটি রান্নাঘর থেকে দুপুরের খাবার দেওয়া হয়, সেদিন কিছুটা স্বস্তি পান ৪৫ বছর বয়সী মেরভাত রাদওয়ান। হাঁড়ি হাতে ছোট ভাগনে উবাইকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চলে যান রান্নাঘরের দিকে।

কিন্তু সাতজনের পরিবারের জন্য সেই খাবার মোটেও যথেষ্ট নয়। তাই খাবারের পরিমাণ বাড়াতে যা পাওয়া যায়, তা-ই যোগ করেন তিনি। কখনো ত্রাণের প্যাকেট থেকে পাওয়া টুনা মাছ, শিম বা মটরশুঁটি সেই খাবারের সঙ্গে মেশানো হয়।

রাদওয়ান বলেন, কখনো রান্না করা খাবার দেওয়া হলেও সাতজনের জন্য তা যথেষ্ট হয় না। তাই অন্য কিছু জোগাড় করে খাবারটা বাড়ানোর চেষ্টা করি।

কমে গেছে কমিউনিটি রান্নাঘরের খাবার
স্বল্প বা কোনো আয় নেই—এমন পরিবারগুলোর খাবারের অন্যতম প্রধান ভরসা গাজার কমিউনিটি রান্নাঘরগুলো। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এসব রান্নাঘরের কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে কমে গেছে।

রাদওয়ানের বাস্তুচ্যুত শিবিরের কাছে থাকা রান্নাঘরটি প্রায় দুই মাস বন্ধ ছিল। পরে সেটি আবার চালু হলেও সপ্তাহে মাত্র দুইদিন খাবার দিচ্ছে।

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি গাজায় ১৬৫টি কমিউনিটি রান্নাঘর থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ খাবার দেওয়া হতো।

জুলাইয়ে রান্নাঘরের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১০২টিতে। প্রতিদিন খাবার সরবরাহও নেমে আসে প্রায় ৬ লাখ ৯৮ হাজারে।

অর্থের তীব্র সংকট ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ বলা হয়েছে।

খাদ্য ও রান্নার প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে দাতব্য সংস্থাগুলোকে।

বাবা-মা হারানো তিন শিশুর দায়িত্ব
রাদওয়ানের নিজের তিন ভাগনে-ভাগনির দায়িত্বও এখন তার কাঁধে। ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর উত্তর গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন তার ৩৮ বছর বয়সী ভাই মোহাম্মদ। প্রাণ হারান তার ভাইয়ের স্ত্রী ৩৩ বছর বয়সী আনোয়ারও। তাদের এক বছর বয়সী ছেলে ইউসুফও ওই হামলায় প্রাণ হারায়।

তবে তাদের আরও তিন সন্তান বেঁচে যায়। ১৪ বছর বয়সী নাইফের মাথায় ধাতব টুকরা ঢুকে যায়। ১১ বছর বয়সী হাবিবের শরীর পুড়ে যায়। আর উবাই গুরুতরভাবে দগ্ধ হয়।

গত নয় মাস ধরে তারা দেইর আল-বালাহর একটি তাঁবুতে বসবাস করছে। তাদের সঙ্গে রয়েছেন রাদওয়ানের ৭০ বছর বয়সী বাবা এবং ৪০ বছর বয়সী বোন সানা।

পরিবারের কোনো প্রাপ্তবয়স্কেরই নিয়মিত আয়ের উৎস নেই। তাই একদিন থেকে আরেকদিন বেঁচে থাকতে তাঁদের নির্ভর করতে হচ্ছে ত্রাণ ও দাতব্য সহায়তার ওপর।

শিশুদের জন্য খাবার, বড়দের অনাহার
বাবা-মাকে হারানোর পর শিশুরা মানসিকভাবেও ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাবারসহ মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে না পারার কষ্ট।

রাদওয়ানের কথায়, শিশুদের দায়িত্ব নেওয়া শুধু তাদের ঘরে তুলে নেওয়া নয়। এর সঙ্গে খাবার, পানীয়, খরচসহ তাদের সব প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্বও রয়েছে। খাবারের সংকট দেখা দিলে পরিবারের বড়রা নিজেদের খাবার কমিয়ে দেন, যাতে শিশুরা অন্তত যথেষ্ট খাবার পায়।

রাদওয়ান জানান, তার বৃদ্ধ বাবা নাতি-নাতনিরা যথেষ্ট খেয়েছে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নিজে খাবার খান না।

মাংস বিলাসিতা, সবজিও নাগালের বাইরে
পরিবারটির কাছে এখন মাংস প্রায় বিলাসিতার মতো। তাজা সবজিও পাওয়া কঠিন। একদিকে সরবরাহ কম, অন্যদিকে দাম অনেক বেশি।

গাজার কিছু সংগঠন মাঝেমধ্যে সবজি বিতরণ করে। তবে সেই সরবরাহ নিয়মিত নয়।

১১ বছর বয়সী হাবিবের সুস্থতার জন্য পুষ্টিকর খাবার খুব প্রয়োজন। চিকিৎসক তাকে ঘন ঘন পানি পান করতে বলেছেন। পাশাপাশি, শসার মতো পানির পরিমাণ বেশি এমন খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

কিন্তু এক কেজি শসার দাম প্রায় ১৫ শেকেল। টমেটোর দাম ১০ থেকে ১২ শেকেল পর্যন্ত। এই দামও পরিবারের জন্য বহন করা কঠিন।

রাদওয়ান বলেন, উবাই বা অন্য শিশুরা শসা চাইলে তিনি মাত্র তিনটি শসা কিনতে পারেন।

টিনের খাবারে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
গাজায় বাজারে খাবার পাওয়া গেলেও অনেক পরিবারের পক্ষে তা কেনা কঠিন। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জুলাইয়ে জানিয়েছিল, উচ্চ দামের কারণে অনেক পরিবার তাজা সবজি, ফল ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার কিনতে পারছে না।

প্রায় ৭৭ শতাংশ পরিবার এ ধরনের খাবার সংগ্রহে সমস্যার কথা জানিয়েছে। কারণ সীমিত আয় দিয়ে এসব প্রয়োজনীয় খাবার কেনা সম্ভব হচ্ছে না।

রাদওয়ানের পরিবারের ক্ষেত্রেও খাদ্যতালিকার এই একঘেয়েমি এখন শিশুদের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে।

হাবিব প্রায় এক বছর ধরে কিডনিতে পাথরের সমস্যায় ভুগছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার এবং প্রায় পুরোপুরি টিনজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীলতার সঙ্গে এই সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।

কিন্তু তাজা খাবারের দাম বেশি হওয়ায় হাবিবের খাদ্যাভ্যাস বদলানো কঠিন। ত্রাণের প্যাকেটেও বেশিরভাগ সময় টিনজাত খাবারই থাকে।

ত্রাণে জীবনরক্ষা, পুষ্টিতে হার
রাদওয়ানের মতো পরিবারগুলোর জন্য দাতব্য সংস্থার খাবার সহায়তা পরের দিনটি পার করার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু শুধু পেট ভরানোই যথেষ্ট নয়। খাবারে বৈচিত্র্য না থাকলে শিশুদের স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গাজার খাদ্যসংকট তাই শুধু একবেলা খাবার পাওয়ার সংকট নয়। এটি শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়েও গভীর সংকট তৈরি করছে।

তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা

(ওএস/এএস/সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২৬)




পাঠকের মতামত:

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test