E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

মুক্তিযুদ্ধের এক বীরউত্তম 

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৭ ১৭:৩৫:৩২
মুক্তিযুদ্ধের এক বীরউত্তম 

রহিম আব্দুর রহিম


মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের অন্যতম দূরদর্শী ও সাহসী সামরিক নেতৃত্বের নাম মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। তিনি ছিলেন ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার। ১৯৭১ সালে যাঁর নেতৃত্বে  চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে শক্তিশালী  প্রতিরোধ। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ছক আঁকছিল, তখন তিনি  চালান এক দুঃসাহসিক অগ্রিম আক্রমণ (প্রি-এম্পটিভ অ্যাটাক)। এতে করে হানাদারদের রক্তক্ষয়ী পরিকল্পনার গতি থমকে যায়। এরপর  তিনি টানা ৩৯ দিন চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের এলাকা শত্রুমুক্ত রাখতে লড়াই চালান। 

বীরত্বপূর্ণ ও কৌশলগত এই অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘বীর উত্তম’-এ ভূষিত করে। রফিকুল ইসলামের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার নাওড়া গ্রামে। বাবা আশরাফ উল্লাহ ছিলেন স্কুল পরিদর্শক এবং মা রহিমা বেগম ছিলেন গৃহীনি। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে রফিকুল সবার বড়। বাবার চাকরির সুবাদে তাঁর শৈশব কেটেছে দেশের নানা প্রান্তে। শিক্ষা জীবনে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা মডেল হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করেন, ভর্তি হোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। পরে ১৯৬৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ ছেড়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন।

১৯৬৫ সালে কাকুল মিলিটারি একাডেমি থেকে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন ও ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে কমিশন লাভ করেন। সামরিক পদে থেকেও তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন; কাজ করেছেন ইউপিপি (UPP) সংবাদসংস্থায়। ১৯৬৮ সালে লাহোর থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বদলি হয়ে আসার পর রফিকুল ইসলাম, যশোর সেনানিবাসে রেজিমেন্ট অ্যাডজুট্যান্ট, পরবর্তীতে দিনাজপুরে ইপিআরের ৮ নম্বর উইংয়ের অ্যাসিসট্যান্ট উইং কমান্ডার এবং ১৯৭০ সালের শুরুতে চট্টগ্রাম সেক্টর ইপিআর হেডকোয়ার্টারে অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অস্ত্র ভর্তি সোয়াত জাহাজ এবং বিমানে করে সৈন্য পূর্বপাকিস্তান ঢোকছিলো, তখন তিনি নিজের অধিনস্থ বাঙালি ইপিআর অফিসার ও সৈনিকদের প্রস্তুতি শুরু করেন।

২৪ মার্চ রাতেই তাঁর প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয় এবং২৫ মার্চ কালরাতে তা প্রকাশ্যে রূপ নেয়। হালিশহরে ইপিআর সদরদপ্তর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অবাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের আটক করার পাশাপাশি রেলওয়ে হিলে তৈরি করা হয় অস্থায়ী হেডকোয়ার্টার। তাঁর পরিকল্পনা ছিল ইপিআর, ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং সেনানিবাসের সব বাঙালি সৈন্যকে এক ছাতার নিচে এনে চট্টগ্রাম বন্দর ও এয়ারফিল্ড পুরোপুরি নিজেদের দখলে নেওয়া। এদিকে পাকিস্তানি বালুচ রেজিমেন্ট সেনানিবাসে অবস্থানরত সহস্রাধিক বাঙালি সদস্যকে নির্বিচারে হত্যা করে। রফিকুল ইসলাম অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়েই শহর প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২৫ মার্চ থেকে ২ মে, টানা ৩৯ দিন রফিকুল ইসলামের কৌশলী নেতৃত্বে বীর বাঙালি সেনারা পাকিস্তানি বাহিনীকে বেকায়দায় ফেলে। বিশেষ করে কুমিল্লা থেকে আসা ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফির শক্তিশালী বহরকে কুমিরার অ্যামবুশে প্রতিহত করার ঘটনাটি মুক্তিযুদ্ধে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। ওই একটি যুদ্ধেই ৭২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়, ফলে পাক সেনারা শহরজুড়ে গণহত্যার সাহস হারিয়ে ফেলে।

মে মাসের শুরুতে রসদ ও গোলাবারুদের সংকটে বাধ্য হয়ে তিনি রামগড় সীমান্ত দিয়ে ভারতের সাব্রুমে অবস্থান নেন, যা পরবর্তীতে ১ নম্বর সেক্টরের সদরদপ্তর (হরিনা) হিসেবে ইতিহাসে সংযুক্ত। ১৯৭১ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার হিসেবে মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দেন। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর, রফিকুল ইসলামের উপস্থিতিতেই চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানো হয়। ১৯৭২ সালে তিনি অবসর নেন। পরে তিনি ইংরেজি দৈনিক ‘দি পিপলস ভিউ’-এর সহযোগী সম্পাদক পদে যোগদান করেন, পাশাপাশি দেশের প্রধান প্রধান পত্রিকায় কলাম লেখতে থাকেন। ১৯৮১ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেন।

১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে তিনি উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) হিসেবে নৌ-পরিবহন এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে তিনি চাঁদপুর-৫ আসন থেকে নির্বাচনে করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবার গৌরব অর্জন করেন।এই আসন থেকে বেশ ক'বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক সেবার পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চাও করতেন। তাঁর লেখিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে;এ টেল অফ মিলিয়ন্স (১৯৭৪), লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে (১৯৮১), মুক্তির সোপান তলে (২০০১)। গবেষণা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৯ সালে তাঁকে 'বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার'-এ ভূষিত করা হয়। একজন অকুতোভয় রণনেতা বীর উত্তম রফিকুল ইসলাম সবার মন-মননে চির স্মরণীয়, বরণীয় হয়ে আছে এবং থাকবে।

লেখক: নাট্যকার ও গবেষক।

পাঠকের মতামত:

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test