E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

সুকুমার বড়ুয়া’র ‘ঠিক আছে ঠিক আছে’ বই প্রসঙ্গ

২০২৬ জানুয়ারি ০৯ ১৭:৪৬:৩৯
সুকুমার বড়ুয়া’র ‘ঠিক আছে ঠিক আছে’ বই প্রসঙ্গ

আবদুল হামিদ মাহবুব


বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলা ভাষাভাষী শিশু থেকে বুড়ো ছড়াপ্রেমিদের মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় জীবিত ছড়াকার ছিলেন সুকুমার বড়ুয়া। বাংলাদেশ আর ভারত বলি কেনো! সারা পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষীদের মাঝেই তিনি জনপ্রিয় ছিলেন।

আমাদের প্রিয় ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়ার প্রয়াণ ঘটলো এই ছাব্বিশ সালের দুই জানুয়ারি। তাঁকে নিয়ে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাজার হাজার পোস্ট হয়েছে। পত্রপত্রিকার সাময়িকী গুলোতে একের পর এক লেখা বেরোচ্ছে। সকল লেখকই তার অন্যান্য লেখার পাশাপাশি বহুল উচ্চারিত (পঠিত) একটি ছড়াকে সামনে এনেছেন। ছড়াটি হচ্ছে 'ঠিক আছে'

অসময়ে মেহমান
ঘরে ঢুকে বসে যান
বোঝালাম ঝামেলার
যতগুলো দিক আছে
তিনি হেসে বললেন
ঠিক আছে ঠিক আছে ।

রেশনের পচা চাল
টলটলে বাসি ডাল
থালাটাও ভাঙা-চোরা
বাটিটাও লিক আছে
খেতে বসে জানালেন
ঠিক আছে ঠিক আছে ।

মেঘ দেখে মেহমান
চাইলেন ছাতাখান
দেখালাম ছাতাটার
শুধু কটা শিক আছে
তবু তিনি বললেন
ঠিক আছে ঠিক আছে ।

কিন্তু 'ঠিক আছে ঠিক আছে' নামে সুকুমার বড়ুয়ার একখানা ছড়ার বই প্রকাশ হয়েছিল, সেটা অনেকেই জানেন না। আমি জানতাম, কিন্তু ওই সময়ে (তাঁর মুত্যুর পর পর) বইখানা হাতের কাছে পাইনি। আমার বাসা বদলের টানাটানিতে কোথায় পড়েছিল! সেটা বের করতে পারিনি। আজ বইয়ের সেল্ফে অন্য আরেকখানা বই খুঁজতে গিয়ে এই বইটা সামনে আসলো।

এই বই প্রকাশ করেছিলেন প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশের লেখক কাজল রশীদ। কাজল রশীদরা দেশে থাকতে লেখালেখি নিয়ে উন্মাদনাময় সময় পার করেছেন। সেই বিলেতে গিয়েও এই লেখালেখির উন্মাদনায় তারা এখনো আছে। তাদের প্রকাশনীর নাম 'প্রবাস প্রকাশনী'। প্রবাস প্রকাশনী থেকে ২০০৬ সালে সুকুমার বড়ুয়ার 'ঠিক আছে ঠিক আছে' বইখানা প্রকাশ হয়েছিল।

'ঠিক আছে ঠিক আছে' বইয়ের প্রচ্ছদ এবং অলংকরণ করেছেন শিল্পী ধ্রুব এষ। বইয়ের ভিতরের প্রতিটি পৃষ্ঠা কমলা রঙের কাগজে ছাপা। অলংকরণ গুলোও এক কথায় দুর্দান্ত। ছাপাটা আমার কাছে এক্কেবারে নির্ভুল মনে হয়েছে। কোন ভুল বানান চোখে পড়েনি। এই ছড়াগ্রন্থে দুই পৃষ্ঠাব্যাপি 'প্রসঙ্গ কথা' শিরোনামে ভূমিকা লিখেছিলেন খ্যাতিমান কবি আসাদ চৌধুরী। ভূমিকা লিখতে গিয়ে আসাদ চৌধুরীকে অনেকগুলো প্রবন্ধ পড়তে হয়েছে। যাদের যে প্রবন্ধ পড়েছেন তাদের নাম ধরে ধরে সেটা উল্লেখ করেছেন। আজ কবি আসাদ চৌধুরীও ইহলোকে নেই। এই সুযোগে তাঁকেও শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। ৪৮ পৃষ্ঠার বইয়ের মূল্য রাখা হয়েছিল ১৫০ টাকা। সম্ভবত প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আর কেউ এই বইয়ের নতুন সংস্করণ করেননি। প্রবাস প্রকাশনী কর্ণধারদের এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

এই বইয়ের প্রকাশনা উপলক্ষে আতাউর রহমান মিলাদ, কাজল রশীদ, আবু মাকসুদ তাদের উদ্যোগে প্রকাশিত ছোটকাগজ 'শব্দপাঠ'র নামে প্রবর্তিত সম্মাননা পদকও সুকুমার বড়ুয়াকে ওই বছরই দেওয়া হয়। পদক নেওয়ার জন্য সুকুমার বড়ুয়া মৌলভীবাজারে এসেছিলেন। সম্ভবত তার সাথে তখন শিহাব শাহরিয়ার কিংবা সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালও (তারা দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন অবশ্যই। কিন্তু সঠিকজন কে ছিলেন মনে করতে পারছি না) এসেছিলেন। তারা একরাত আমার বাসায় থেকেছেন। পরের দিন অনুষ্ঠান শেষ করে চলে যান।

প্রবাস প্রকাশনীর কাজ নিয়ে যখন বলছি; তখন আরেকটু বলে নিই। এই সাহিত্য উন্মাদরা দেশের অনেক অবহেলিত লেখককে খুঁজে খুঁজে বের করেছে। তাদের অগ্রন্থিত লেখাগুলো খুঁজে বের করে সেগুলো 'সমগ্র' আকারে প্রকাশ করেছে। তাদের মধ্যে অন্তত দুজনের নাম আমি উল্লেখ করতে পারি। একজন বাউন্ডুলে স্বভাবের কবি শহীদ সাগ্নিক অন্যজন রম্যলেখক আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী। তারা তাদের শিক্ষক দেশের খ্যাতিমান কবি শাহজাহান হাফিজের ‘কবিতাসমগ্র- ১’ও প্রবাস প্রকাশনী প্রকাশ করেছে। এর বাইরে আরো অনেকের বইগুলো প্রকাশের দায়িত্ব পালন করেছে কাজল রশীদরা। এই তালিকায় সম্ভবত গল্পকার আকমল হোসেন নিপুর একখানা বইও আছে।

আসলে লিখতে গিয়ে আমি প্রসঙ্গ ছেড়ে চলে গেছি। বলছিলাম সুকুমার বড়ুয়ার কথা। তিনি এক রাত আমার বাসায় যাপন করার কারণে তার সম্পর্কে আমার অনেক কিছু জানা হয়েছিল। এক্কেবারে সহজ সরল সাধারণ একজন মানুষ। তার সেই ছোটবেলার সংগ্রামের কথা, অবহেলা পেয়ে পেয়ে বেড়ে ওঠার কথা, কোন ধরনের সংকোচ না করে অবলীলায় আমাকেসহ আমাদের সকলের কাছে বলেছিলেন।

সুকুমার বড়ুয়া ছোটদের ছড়া লেখার জন্য বেশি জনপ্রিয় হলেও তিনি রাজনৈতিক সমাজসচেতন ছড়াও লিখেছেন। আমিও যেহেতু ছড়া লিখি। আমার বেশিরভাগ ছড়াই রাজনীতি ও সমাজঘনিষ্ঠ। সেই কারণে আমি 'ঠিক আছে ঠিক আছে' বইখানা থেকে সুকুমার বড়ুয়া একটি ছড়া নিম্নে তুলে দিচ্ছি। এই ছড়ায় রাজনীতি ও সমাজের একটি বলিষ্ঠ রূপ তিনি তুলে ধরেছেন। এ ছড়া শিরোনাম 'হোমরা চোমরা'।

ওই চেয়ারে হোমরা বসেন
ওই চেয়ারে চোমরা
দুই জনারই মুখ দু'খানা
সদাই থাকে গোমড়া।

যেমন নামি তেমন দামি
সামনে গেলে ভয়েই ঘামি
ভীষণ রকম মান্য করি
আমরা এবং তোমরা।

চলন বলন পোশাক আশাক
আচার ভারি উচ্চ
আলতু ফালতু লোকের মতো
নয়তো মোটেই তুচ্ছ।

কোন কারণে দাম কমে যায়
কোন কথাতে মান কমে যায়
অষ্টপ্রহর অস্থিরতা
যেমন ফুলের ভোমরা।
এই সমাজে তারাই হলেন
হোমরা এবং চোমরা।

আমি চাইলে সুকুমার বড়ুয়াকে নিয়ে কিছু স্মৃতি লিখতে পারতাম। কারণ একটি রাত তিনি আমার আলয়ে কাটিয়েছেন। কিন্তু না, এখানে আমি সেই স্মৃতি কথা লিখছি না। অনেকে তাকে নিয়ে স্মৃতি লিখছেন, লেখালেখি বিশ্লেষণ করে আলোচনা লিখছেন, ছড়াকাররা তাঁকে নিয়ে লিখছেন শত শত ছড়া।আমিও কয়েক বছর আগে তাঁকে নিয়ে একটি ছড়া লিখেছিলাম। এখানে সেটা তুলে দিচ্ছি। ছড়াটি ছিলো এমনÑ

এই কথা চাপা নেই
নয় কথা ঘরোয়া
বলে দিই সেই কথা
না করেই পরোয়া।

নন রাজা মহারাজা
তিনি তো ছড়াকার
ছড়া লিখে জয় করা
রাজ্যটা গড়া তাঁর।

এই কথা জানে সবে
আছে যত পড়ুয়া
সেই তিনি ছড়াকার
সুকুমার বড়–য়া।

আমি কোন স্মৃতিকথা লিখলাম না। তার ছড়াকর্ম নিয়ে কোন আলোচনাও করলাম না। কেবল যেটা করেছি, সেটা হচ্ছে; আমি প্রবাস প্রকাশনীর কাজল রশীদদের 'ঠিক আছে ঠিক আছে' বইখানা প্রকাশের সেই মহোত্তম কাজের কথাটা স্মরণ করে রাখছি। স্মরণ করছি, আর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি প্রয়াত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়াকে।

পাঠকের মতামত:

১২ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test