E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

জিন্না বেগমের ছাগল পালনের সংগ্রামী গল্প 

২০২৬ এপ্রিল ২৩ ১৪:১৬:৫৪
জিন্না বেগমের ছাগল পালনের সংগ্রামী গল্প 

রূপক মুখার্জি, নড়াইল : চিত্রা নদীর কূল ঘেঁষা ছোট্ট গ্রাম। গ্রামের পাশ দিয়ে আকা-বাঁকা পাকা সড়ক। সড়ক দিয়ে যেতে যেতে চোখে পড়ে একটি ঝুপড়ি ঘর। তাতে নেই কোনো দরজা-জালানা।

ঘরটির ভেতর বসে একপাল ছাগলকে খাবার দিচ্ছেন ষাটোর্ধ্ব এক নারী। আর ঘরটির উঠানজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছাগল। কোনোটি পাতা খাচ্ছে, কোনোটি মনের আনন্দে লাফালাফি করছে; কোনোটি আবার ওই নারীর কোল ঘেঁষে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাঝে মধ্যে কোনোটিকে আদর করে বুকে জড়িয়ে ধরছেন ওই নারী।

দৃশ্যটি নড়াইল সদর উপজেলার আউড়িয়া ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামের। ছাগল পালন করা ওই নারীর নাম জিন্না বেগম (৬৫)। তিনি কমলাপুর গ্রামের মুকুন্দ বৈরাগীর স্ত্রী।

গত শুক্রবার (১০ এপ্রিল) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় জিন্না বেগমের সঙ্গে।

এসময় তিনি জানান, সাত বছর আগে ছাগল পালন করা শুরু করেন তিনি। দুটি ছাগল দিয়ে খামার শুরু করলেও এখন তার রয়েছে ৩৫টি।

তিনি বলেন, ‘ছাগল পালতি গিলি রান্না খাওয়া ঠিকমতো হয় না। আজ রাতি রান্দি আর কাল রাতে রান্দি। কোনো কোনো সময় চিড়ে, মুড়ি এডা-ওডা খাই। এগ্যের খাবার গুছাব না- আমি ঠিকমতো খাব। আমি ঠিকমতো খাতিও পারিনে বাপ।’

৩৫ বছর আগে জিন্না বেগমের স্বামী মুকুন্দ বৈরাগী তালপাতার তৈরি হাত পাখা বাড়িতে তৈরি করতেন। সেই হাত-পাখা বাজারে বাজারে বিক্রি করে বেড়াতেন মুকুন্দ। বাজারে হাত-পাখা বিক্রির সুবাদে পরিচয় হয় জিন্না বেগমের সঙ্গে। এক পর্যায়ে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তারা। দুইজন আলাদা ধর্মের অনুসারী হলেও একসময় বিয়ে করেন তারা। তবে ধর্ম ভিন্ন হলেও তাদের সংসার জীবনে কোন অসুবিধা হয় নাই। বর্তমানে স্বামী মুকুন্দ বৈরাগী অসুস্থ।

জিন্না বেগম আরো জানান, গত ঈদুল ফিতরে ১৫টি ছাগল বিক্রি করেছেন তিনি। দেশি জাতের ছাগল হওয়ায় বিক্রি করতে বাজারে যাওয়া লাগে না। ছাগল পালনে যা আয় হয়, তা দিয়েই অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে সংসার চালায় জিন্না বেগম।

জিন্না বেগম আরো বলেন, ‘স্বামী স্ত্রী মিলে দুই সদস্যের পরিবার আমার। স্বামী অসুস্থ। সে এহন মুরব্বি হয়ে গেছে। এহন চলতি পারে না। ছাগল পালি বেচিকিনি আর খাই।’

জিন্না বেগমকে দেখে আশপাশের অনেকে ছাগল পালন শুরু করেছেন। বিশেষ করে নারীরা তার কাছ থেকে দেশি জাতের ছাগল নিয়ে গড়ে তুলেছেন পারিবারিক খামার। তার দেখাদেখি স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেক নারী।

কমলাপুর গ্রামের পামেলা রানি বলেন, ‘জিন্না বেগমের ছাগল পালন দেখে, আমিও ছাগল পালন শুরু করেছি। ছাগল পালনে যা আয় হয়, তা দিয়ে আমাদের ঘরের আসবাবপত্র ও আমার হাতখরচ হয়ে যায়। এ ছাড়া সংসারের নানা উপকরণ কিনতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকা লাগে না।’

ছাগলের জাত ভালো হওয়ায় গ্রাম থেকেই তার পালিত ছাগল বিক্রি হয়ে যায়। বিয়ের অনুষ্ঠান বা সামাজিক কাজে মাংসের প্রয়োজনে স্থানীয়রা তার কাছ থেকে ছাগল কেনেন।

নড়াইল পৌর এলাকার বাসিন্দা শাকিল আহমেদ বলেন, ‘আমাদের তারাপুর এলাকায় বিয়ের অনুষ্ঠানে খাসির মাংসের জন্য জিন্না বেগমের কাছ থেকে খাসি কিনে নিয়ে যাই। মাংস বেশ সুস্বাদু। অনেক ক্ষেত্রে দালালের মাধ্যমে পশু কেনাবেচা করলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার কাছ থেকে খাসি কেনায় আমরা লাভবান হয়েছি।’

নড়াইল সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা দেবাশীষ কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘নড়াইল ছাগল পালনের জন্য একটা উপযুক্ত জেলা। জেলার সদর উপজেলার আউড়িয়া ইউনিয়নের জিন্না বেগম তার নিজ বাড়িতে ছাগলের খামার গড়ে তুলেছেন। তার দেখাদেখি ওই এলাকার নারীরা ছাগল পালনে আগ্রহী হয়েছেন। এতে বেকার নারীরা স্বাবলম্বী হয়ে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখছেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে ভ্যাকসিনসহ খামারিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’

(আরএম/এএস/এপ্রিল ২৩, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

২৩ এপ্রিল ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test