E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

‘ছয় লাশের বিনিময়ে কেবল কোটা সংস্কার হতে পারে না’

২০২৬ জুলাই ১৬ ১৪:৫০:২৯
‘ছয় লাশের বিনিময়ে কেবল কোটা সংস্কার হতে পারে না’

স্টাফ রিপোর্টার : ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন সারা দেশে আরও তীব্র ও বিস্তৃত রূপ নেয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ, পুলিশ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং প্রাণহানির ঘটনায় আন্দোলন নতুন মোড়ে পৌঁছে।

দিনের শেষে ছয়জনের মৃত্যুকে সামনে রেখে আন্দোলনের সমন্বয়কেরা ঘোষণা দেন, ‘ছয় লাশের বিনিময়ে কেবল কোটা সংস্কার হতে পারে না’।

এদিন এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের পেছনে সরকারকে উৎখাতের দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র রয়েছে।
তিনি আরও মন্তব্য করেন, লন্ডন থেকে তারেক রহমান এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি বলেন, আদালতের রায় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী এদিন দুপুর ২টা থেকে আন্দোলনকারীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান নেন। তবে সকাল থেকেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকার বনানী, কুড়িল মোড়, নতুন বাজার ও মেরুল বাড্ডা এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন।

এছাড়া রাজধানীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট অবরোধ করে দুপুর নাগাদ পুরো ঢাকা কার্যত স্থবির করে দেন আন্দোলনকারীরা।

একই সময়ে ময়মনসিংহ, বগুড়া, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমর্থনে সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। অনেক স্থানে ছাত্রলীগ ও পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাল্টা কর্মসূচি দেয় ছাত্রলীগ। তারা দুপুর আড়াইটা থেকে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে টিএসসিতে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা জোরালো অবস্থান নিলেও ছাত্রলীগকে অবস্থান নিতে দেখা যায়নি।

এদিন দুপুর ২টার দিকে সরকারি তিতুমীর কলেজ, বিএএফ শাহীন কলেজ, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিসহ আরও কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মহাখালীতে সমবেত হতে শুরু করেন। পরে তারা রেললাইন অবরোধ করে সারা দেশের সঙ্গে রেলযোগাযোগ বন্ধ করে দেন।

দুপুর ১টার দিকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ, আইডিয়াল কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এতে মিরপুর সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরে দুপুর ২টার দিকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে এলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

ঢাকার বাইরেও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষ হয়। এতে ১৬ জুলাই একদিনেই ৬ জন নিহত হন। এছাড়াও সারা দেশে অনেক আন্দোলনকারী আহত হন। অনেকে হন গুলিবিদ্ধ।

রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে দাঁড়ালে তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি মারা যান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাকে হত্যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনকারীদের মধ্যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে।

চট্টগ্রামে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন। শহরের মুরাদপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর অস্ত্রধারীরা গুলি ছুড়লে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। রাজধানীর ঢাকা কলেজের সামনে সংঘর্ষে দুজনের মৃত্যু হয়।

দেশব্যাপী এমন পরিস্থিতিতে সরকার পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান) এবং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শ্রেণি কার্যক্রমও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এছাড়া বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় সব শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।

দেশব্যাপী বিক্ষোভ দমাতে এদিন বিকেলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও রাজশাহীতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের কক্ষসহ ১৫টি কক্ষে ভাঙচুর চালান। মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়।

সারা দেশে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। দেশের প্রায় সাতটি জেলায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উত্তাল হয়ে ওঠে। ছাত্রলীগ সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়।

এদিন রাত ৮টায় শহীদ মিনার থেকে কর্মসূচি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। পরে তারা শহীদ মিনার থেকে উপাচার্যের বাসভবন হয়ে রাজু ভাস্কর্যে যেতে চাইলে আন্দোলনকারীরা তাদের বাধা দেন। পরে সেখানেই কর্মসূচি সমাপ্ত করা হয়।

রাতে সমন্বয়করা নিজেদের মধ্যে অনলাইনে একটি সভা করেন। সেখানে তারা একমত হন যে, ছয়টি লাশের বিনিময়ে কেবল কোটা সংস্কার হতে পারে না। পরে রাতে তারা পরদিন আশুরা উপলক্ষে গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিলের ঘোষণা দেন।

শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগের হিড়িক
১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর রাত থেকেই ছাত্রলীগের একাধিক পদধারী নেতা পদত্যাগ করতে শুরু করেন। তারা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি এটি বিভিন্ন ক্যাম্পাসেও ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রায় অর্ধশত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী পদত্যাগ করেন।

ঢাবির হলগুলোতে ছাত্রলীগ নেতাদের কক্ষে ভাঙচুর
এদিন ক্ষুব্ধ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ছাত্রলীগ নেতাদের কক্ষে ভাঙচুর চালান শিক্ষার্থীরা। ১৬ জুলাই রাতে রোকেয়া হলে প্রথম ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে হল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আতিকা বিনতে হোসাইনসহ ছাত্রলীগের একাধিক নেত্রীকে হল থেকে বের করে দিয়ে শিক্ষার্থীরা হলকে ছাত্রলীগমুক্ত ঘোষণা করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের অন্যান্য হলেও ভাঙচুর হয়।

পরদিন সকালের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ছাত্রলীগ নেতাদের কক্ষ ভাঙচুর করা হয়। তবে খবর পেয়ে আগেই পালিয়ে যান ছাত্রলীগের নেতারা। ক্যাম্পাস থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর তারা আর হলে ফিরতে পারেননি। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রলীগের নেতারা পালিয়ে যান।

দুই বছর উপলক্ষে কর্মসূচি
জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

(ওএস/এএস/জুলাই ১৬, ২০২৬)










পাঠকের মতামত:

১৬ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test