E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস 

গুম প্রতিরোধ করুন, ন্যায় ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করুন

২০২৫ আগস্ট ২৯ ১৭:৫১:৫৬
গুম প্রতিরোধ করুন, ন্যায় ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করুন

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ


মানব সভ্যতার ইতিহাসে কিছু অপরাধ আছে, যা কেবল ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজকে আতঙ্কিত করে তোলে। গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া তেমনই এক ভয়ংকর অপরাধ। কাউকে হঠাৎ করে রাষ্ট্রীয় বা অরাষ্ট্রীয় শক্তির দ্বারা আটক বা অপহরণ করা হলো, অথচ তার অবস্থান বা ভাগ্য অস্বীকার করা হচ্ছে—এটাই গুম। এতে ভুক্তভোগী আইনের সুরক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, আর তার পরিবার বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা ও যন্ত্রণায় কাটায়। এই অমানবিক পরিস্থিতি প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের স্মরণ এবং রাষ্ট্রগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাতে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস।

দিবসটির সূচনা

২০০৬ সালে জাতিসংঘ গৃহীত করে “সকল ব্যক্তিকে জোরপূর্বক গুম থেকে সুরক্ষা দেওয়ার আন্তর্জাতিক কনভেনশন” যেখানে স্পষ্টভাবে গুমকে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ২০১০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৩০ আগস্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা করে। এর উদ্দেশ্য হলো—গুমের শিকারদের স্মরণ করা। তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো।ভবিষ্যতে এ অপরাধ প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

গুম এখনো পৃথিবীর বহু দেশে বাস্তবতা। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে ৪১টি দেশের ৬৮৯টি নতুন গুম মামলা পর্যালোচনার জন্য গৃহীত হয়েছে।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (RSF)-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, বর্তমানে নিখোঁজ ৯৫ সাংবাদিকের মধ্যে ৪৩ জন গুমের শিকার। কলম্বিয়ায় দীর্ঘ সংঘাতের সময়কালে ১.৫ লক্ষাধিক মানুষ গুম হয়েছেন। সিরিয়ায় ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮২,০০০ মানুষ নিখোঁজ হয়ে গেছে।

এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে—গুম কেবল কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক মানবাধিকার সংকট।

বাংলাদেশে গুমের চিত্র

বাংলাদেশেও গুম বহু বছর ধরে উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার জানিয়েছে, ২০০৯–২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে অন্তত ৭০৯ জন গুম হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৭১ জন উদ্ধার বা আদালতে হাজির হয়েছেন, ৮৩ জন নিহত এবং ১৫৫ জন এখনো নিখোঁজ। ভুক্তভোগীরা প্রধানত রাজনৈতিক কর্মী, মানবাধিকার রক্ষাকারী বা ভিন্নমতাবলম্বী। গুম শুধু ভুক্তভোগীকে নয়, তার পরিবারকেও ধ্বংস করে দেয়। পরিবার প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তা, ভয়, সামাজিক অপমান ও আর্থিক সংকটে ভুগতে থাকে।

২০২৫ সালে বাংলাদেশের উদ্যোগ

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে, যা আশার আলো দেখায়। আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগদান: ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ICPPED-এ স্বাক্ষর করেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

গুম অনুসন্ধান কমিশন: ২০২৪ সালের আগস্টে কমিশন গঠিত হয়, যেখানে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৮০০-এর বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে।

জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ: বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশকে স্বাধীন তদন্ত, ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সংস্কার করার পরামর্শ দিয়েছেন।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এসব পদক্ষেপ কতোটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে।

গুমের বহুমুখী প্রভাব

১. পরিবারে মানসিক আঘাত :- গুমের ফলে পরিবার চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে। স্বজন কোথায় আছে, কেমন আছে—এই অজানার বোঝা তাদের প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয়।

২. অর্থনৈতিক ক্ষতি :- গুমের শিকার যদি উপার্জনক্ষম হন, তবে পরিবার দ্রুত আর্থিক সংকটে পড়ে। সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়, চিকিৎসা ব্যাহত হয়, দারিদ্র্য বেড়ে যায়।

৩. সামাজিক ভাঙন :- গুম হওয়া পরিবারের প্রতি সমাজে সন্দেহ বা দূরত্ব তৈরি হয়। ফলে তারা সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ে।

৪. নারীর ওপর চাপ :- পরিবারের পুরুষ সদস্য গুম হলে নারীরা জীবিকার দায়ে বাইরে বের হতে বাধ্য হয়। এতে তারা সামাজিক বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হন।

৫. শিশুদের ভবিষ্যৎ সংকট :- গুম হওয়া পরিবারের শিশুরা মানসিক আঘাতের কারণে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে, ভয় ও হতাশায় ভুগে।

৬. সমাজে ভয় ও আতঙ্ক :- গুমের কারণে সাধারণ মানুষ মত প্রকাশে ভয় পায়। সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী ও শিক্ষার্থীরা চুপ হয়ে যায়।

৭. গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত :- যখন ভিন্নমত দমন করতে গুম ব্যবহৃত হয়, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয় এবং রাজনৈতিক বহুমত নষ্ট হয়।

৮. বিচারহীনতা :- গুমের অভিযোগ অনেক সময় পুলিশ নেয় না। তদন্ত হলেও ফল পাওয়া যায় না। এতে অপরাধীরা দায়মুক্তি পেয়ে যায়।

৯. মানবাধিকারের ক্ষয় :- গুম মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়। পরিবারও কোনো আইনি সুরক্ষা পায় না।

১০. রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহানি :- বারবার গুম হলে জনগণ রাষ্ট্রের আইন ও ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা হারায়। এতে রাষ্ট্র ও নাগরিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়।

গুম প্রতিরোধে করণীয়

১. আইনগত পদক্ষেপ : গুম প্রতিরোধে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো এটিকে স্বাধীন অপরাধ হিসেবে জাতীয় আইনে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা। আন্তর্জাতিক কনভেনশন (ICPPED) অনুযায়ী আইন প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে। আটক বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আইনি অনুমতি, নথিভুক্তকরণ ও আদালতের তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

২. রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা : গুমের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি অভিযুক্ত হয় রাষ্ট্রীয় বাহিনী। তাই নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে হবে। আটক বা গ্রেপ্তারের সময় পরিবারের কাছে তথ্য সরবরাহ বাধ্যতামূলক করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করলে অপব্যবহার কমবে।

৩. স্বাধীন তদন্ত কমিশন : গুমের অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। এ কমিশন যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারে এবং দোষীদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে পারে।

৪. ভুক্তভোগী পরিবারের সহায়তা: গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের জন্য ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা উচিত। পাশাপাশি আইনি সহায়তা ও সামাজিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিতে হবে।

৫. নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম : নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম গুম প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সচেতনতা বৃদ্ধি, জনমত গঠন এবং ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা তাদের দায়িত্ব। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার পথে বাধ্য করতে পারে।

৬. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা : গুম প্রতিরোধে জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করে রাষ্ট্রগুলোকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা যায়। এ ছাড়া আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অভিন্ন মানদণ্ড তৈরি করাও কার্যকর হতে পারে।

৭. শিক্ষা ও মানবাধিকার সচেতনতা : স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানবাধিকার শিক্ষা প্রচলন করতে হবে। নাগরিকরা যদি নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়, তবে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতায় বাধ্য করা সহজ হবে।

৮. প্রযুক্তির ব্যবহার : আটক ও গ্রেপ্তারের তথ্য অনলাইনে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। ডিজিটাল ডাটাবেইজে নাগরিকদের প্রবেশাধিকার দিলে গোপন আটক বা গুমের ঝুঁকি কমবে।

দিবসটির তাৎপর্য

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস শুধু একটি স্মরণ দিবস নয়, এটি আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতীক। গুমের শিকার হওয়া মানুষ শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি ভোগে না, তাদের পরিবারও দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা, মানসিক যন্ত্রণা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভুগে। এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এমন অপরাধ কখনোই সহ্য করা যায় না এবং এ ধরনের লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।

ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাদের পুনর্বাসন, মানসিক সহায়তা এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য। রাষ্ট্রকেও জবাবদিহি করতে বাধ্য করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে আর কোনো নাগরিকের সঙ্গে এই ধরনের অন্যায় না ঘটে।

সর্বোপরি, এই দিবস আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানবাধিকারের মূল্য শেখায়। এটি শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে, যাতে তারা ন্যায্যতা, মানবিকতা এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়। গুম প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি করা মানে মানবতার জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা গড়া।

পরিশেষে বলতে চাই, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০২৫ শুধুমাত্র একটি স্মরণ দিবস নয়; এটি মানবতার প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের প্রতীক। গুম এক ঘৃণ্য অপরাধ, যা ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনকে ধ্বংস করে। বিশ্বের অনেক দেশে এখনও গুমের ঘটনা ঘটছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ। তবুও কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ আশা জাগাচ্ছে। বাংলাদেশে গঠন করা হয়েছে গুম অনুসন্ধান কমিশন, এবং আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগদানও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে শুধু আইন বা কমিশন গঠনের মাধ্যমে কাজ শেষ হয় না। বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হলো আসল পরীক্ষার ক্ষেত্র। রাষ্ট্র ও সমাজকে মিলিতভাবে দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে আর কোনো নাগরিক গুমের শিকার না হয়। আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক— কোনো মানুষ যেন আর গুম না হয়; প্রত্যেক নাগরিক যেন নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত জীবনের অধিকার পায়।

লেখক : সংগঠক, কলাম লেখক ও গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।

পাঠকের মতামত:

২৯ আগস্ট ২০২৫

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test