E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

পর্ব: ০২

বেগম জিয়ার মৃত্যু এবং কিছু কথা

২০২৬ জানুয়ারি ০৮ ১৮:১৬:১৫
বেগম জিয়ার মৃত্যু এবং কিছু কথা

শিতাংশু গুহ


‘বেগম জিয়ার মৃত্য ও কিছু কথা’ শীর্ষক একটি নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ আমি লিখেছিলাম বেগম জিয়ার মৃত্যু’র পর, এটি ধারাবাহিকতা। কান টানলে মাথা আসে, বেগম জিয়ার কথা এলে স্বাভাবিকভাবে তারেক জিয়ার কথা আসবে। তারেকের এতকাল পরিচিতি ছিলো ছিলো ‘খাম্বা তারেক’, ‘হাওয়া ভবন’ বা ‘দশ ট্রাক’ অস্ত্র অথবা ২১ আগষ্ট গ্রেনেড বিস্ফোরণের নায়ক হিসাবে। এখন তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, হয়তো শিগগিরই ভারমুক্ত হবেন, নির্বাচন হলে হয়তো ‘প্রধানমন্ত্রী’ হবেন, তবে ক’দিনের মধ্যেই তার দেশে ফেরার ‘হানিমুন’ কেটে যাবে। যেমন খালেদা জিয়া সম্পর্কে মানুষের ‘মিথ’ও কেটে যাবে। 

বেগম জিয়ার মৃত্যুতে আগেই শোক প্রকাশ করেছি, তার আত্মার শান্তি কামরা করেছি। তারা জানাজায় ঐতিহাসিক লোক সমাগমে আমি অভিভূত। এটি স্বাভাবিক ছিলো, সাথে সাথে আমার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে যে, গোলাম আজমের জানাজায় বা জিয়াউর রহমানের জানাজায় ব্যাপক জনসমাগম হয়েছিলো। সদ্য হাদীর জানাজায় ভীড় উপচে পড়েছিলো। এঁরা সবাই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারক-বাহক, দেশের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মান্ধ, সুতরাং জানাজায় তো মানুষ হবেই। এছাড়া সাধারণ মুসলমান যেকোন জানাজায় সুযোগ থাকলে অংশ নিয়ে থাকে, এদের সংখ্যা কম নয়। দুঃখের বিষয় জানাজায় অংশ নিতে আসা একজনকে আওয়ামী কর্মী সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়েছে।

বেগম জিয়া গণতন্ত্রের মানসপুত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সাধারণ ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক। এরশাদ বিরোধী গণআন্দোলন এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যে শুভ সূচনা হয়েছিলো, বেগম জিয়ার ক্ষমতালিপ্সা এবং ফলশ্রুতিতে ‘ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান’, ১৫ই ফেব্রুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন সেটি ব্যর্থ করে দেয়। এরআগে ‘মাগুরা নির্বাচন’ তাকে স্পষ্টত: ‘স্বৈরাচারী’ হিসাবে প্রমান করে দেয়। ২০০১’র সাম্প্রয়দায়িক নির্যাতন এবং ২০০৬-এ ক্ষমতায় থেকে যেতে তিনি কি কান্ডটাই না করলেন! ফলশ্রুতিতে ২০০৭-২০০৮ মঈন-ফখরুদ্দিন তত্ববধায়ক সরকার। এসব বিবেচনায় নিলে তাঁকে ‘গণতন্ত্রের হত্যাকারী’ হিসাবে চিহ্নিত করা সহজ।

এ লেখায় বেগম জিয়ার কিছু অতীত কর্মকান্ড নিয়ে আলোচনা করতে চাই, তিনি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, তাই আলোচনা-সমালোচনা হতেই পারে। বেগম জিয়া ১৯৯৪ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দিয়েছেন, সেই মামলা মাথায় নিয়ে তিনি মারা যান। একই বছর বেগম জিয়ার পুলিশ জাহানারা ইমামকে লাঠিপেটা করে কারণ তিনি গোলাম আজম, নিজামী ও অন্য রাজাকারদের বিচার চেয়েছিলেন। খালেদা জিয়া রাজাকারদের রক্ষা করতে চেয়েছেন, তিনি ছিলেন ‘রাজাকার শিরোমনি’। ১৯৯৫ সালে সারের দাবিতে আন্দোলনরত ১৮ জন কৃষককে হত্যা করেন বেগম জিয়া। একই বছর শেখ হাসিনা সিলেট-ঢাকা ট্রেনে যাত্রাকালে বৃষ্টির মত গুলিবর্ষণ করা হয়।

১৯৯৬ সালে পাতানো নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ৩০জন নেতাকর্মী খুন হয়, এবং ৩ মাসের হরতালে বেগম জিয়ার পুলিশের হাতে ২০০ নেতাকর্মী নিহত হয়। ঐ পাতানো নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু’র স্বীকৃত খুনী রশিদকে বিরোধী দলীয় প্রধান বানানো হয়? বেগম জিয়া কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের নামকরণ করেন ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর’। শেখ হাসিনা এটিতে হাত দেননি। এরপর শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম বিমান বন্দরের নাম ‘এম হান্নান বিমানবন্দর’ করেন। বেগম জিয়া ক্ষমতায় এসে সেটি পরিবর্তন করে ‘শাহ-আমানত বিমান বন্দর’ রাখেন। এম মান্নান চট্টগ্রাম থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে প্রথম স্বাধীতা ঘোষণা করেছিলেন, বেগম জিয়ার সেটি অসহ্য ছিলো। এরপর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে জিয়া বাদ দিয়ে ‘শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ রাখেন। দুই নেত্রী ফাইটে জিতে যায় মৌলবাদীরা, অথচ ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমান বন্দর যথাক্রমে বঙ্গবন্ধু ও জিয়ার নামে রাখলে তো কোন ক্ষতি ছিলোনা।

খালেদা জিয়ার মঈনুল রোডের বাড়িটি দিয়েছেন এরশাদ। খালেদা জিয়া সেটি সাদরে গ্রহন করেন। অথচ বিএনপি দাবি করে এরশাদ জিয়াউর রহমানের খুনের সাথে জড়িত। একইভাবে আওয়ামী লীগও মনে করে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু খুনের সাথে জড়িত। খালেদার বাড়ী নিয়ে প্রথমত শেখ হাসিনা কোন উচ্চবাচ্চ করেননি। শেখ হাসিনা ১৯৯৪ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি ‘জাদুঘর’ ঘোষণা করেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার নামে দুটি বাড়ী বরাদ্ধ হয়, কারণ ঢাকায় তাদের কোন স্থায়ী ঠিকানা ছিলোনা। ২০০১-এ ক্ষমতায় এসে বেগম জিয়া সেই বাড়ী দুটি’র বরাদ্ধ বাতিল করেন। এরপর শেখ হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় এসে খালদা জিয়াকে মইনুল রোডের বাড়ী থেকে উচ্ছেদ করেন।

জিয়ার লাশ নিয়ে বিতর্ক প্রথম দিন থেকেই ছিলো। যেই লাশ নিয়ে বিশাল জানাজা হয়, তখনি লোকে বলেছে বাক্স খালি। এমনকি খালেদা জিয়াকেও লাশ দেখতে দেয়া হয়নি। জিয়াউর রহমানের লাশ কবরে নেই, এ বিতর্ক প্রথম তুলেন বিএনপি’র প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরী, এবং একারণে তিনি জিয়ার কবর জিয়ারত করতে অস্বীকার করেছিলেন। বেগম জিয়ার হাত থেকে বাঁচতে তাকে প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দৌড়ে পালাতে হয়? তার ওপর হামলা হয়, তার গুলশানের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। অসংখ্য সেনা-অফিসারের হত্যাকারী জিয়ার ওপর সেনা সদস্যদের আক্রোশ ছিলো। তার লাশ হালদা নদীতে ফেলে দেয়া হয়। জনশ্রুতি আছে যে, পরে তার দেহের কিছু কিছু অংশ চট্টগ্রামে কবর দেয়া হয়। বলা হয়ে থাকে সেটি পরে জিয়ার কফিনে রাখা হয়।

খালেদা জিয়ার জন্মদিন নিয়ে বিভ্রান্তি শুরু হয় ৯০’র দশক থেকে। ৮০’র দশকে এনিয়ে কোন বিভ্রান্তি ছিলোনা। তার স্কুলের জন্মদিন ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫। তার বাবা ইস্কান্দার মির্জা বিচিত্রার সাক্ষাৎকারে একই কথা বলেছেন। কেন তিনি হটাৎ করে ১৫ই আগষ্ট তার জন্মদিন পালন করতে শুরু করেন কেজানে? দু:খঁজনক হচ্ছে বঙ্গবন্ধু হত্যা দিবসে তিনি ঘটা করে নিজের জন্মদিন পালন করতেন। জন্মদিন নিয়ে ঘাপলা তিনি নিজে সৃষ্টি করলেও তাঁর মৃত্যুদিন নিয়ে ঘাপলায় তার হাত নেই। সামাজিক মাধ্যমে এনিয়ে যথেষ্ট কথাবার্তা হচ্ছে। এক ভদ্রলোক ২০শে ডিসেম্বর এক পোস্টিং-এ বলেছেন, ‘তারেক আসবেন ২৫ ডিসেম্বর, খালেদা জিয়া মারা যাবেন ৩০শে ডিসেম্বর’। লোকজন তার কাছে লটারির নাম্বার চাচ্ছিলো, এজন্যে যে তিনি নিশ্চয় ভবিষ্যৎ জানেন?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত ঘটনা হচ্ছে ‘গ্রেনেড হামলা’। শাহবাগ ও রমনা থানা মামলা নেয়নি, ঘটনাস্থলে এম্বুলেন্স যায়নি। আইভী রহমান, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও অন্যদের রিক্সা ও ঠেলাগাড়িতে হাসপাতালে নেয়া হয়। সরকারি হাসপাতাল চিকিৎসা দেয়নি। এরপর ‘জজ মিয়া’ নাটক। হাসিনাকে দেখতে যাননি খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া নিজেই বলেছিলেন যে, শেখ হাসিনা ভ্যানিটি ব্যাগে গ্রেনেড নিয়ে গেছেন। খন্দকার মোশাররফ বলেছিলেন, ‘ওগুলো সামান্য ঘটনা’। ২০০৬ সালে বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলনরত ৩১জনকে খালেদা জিয়ার পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছিলো। ২০০২ সালে খালেদা জিয়া ভারতকে গ্যাস দিতে চেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ আন্দোলন করে তা ঠেকায়। খালেদা জিয়া গোপালগঞ্জের নাম বদলে দিতে চেয়েছিলেন।

পদ্মাসেতু জোড়াতালি দিয়ে বানানো বলে খালেদা জিয়া তার কর্মীদের তাতে উঠতে নিষেধ করেছিলেন। বিএনপি এখন বলে, ওটা শেখ হাসিনা’র বাপের টাকায় বানায়নি। খালেদা জিয়ার আমলে একবার ‘সাবমেরিন’ কেনার প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেছিলেন, ‘ওটা পানিতে ডুবে যাবে’। খালেদা জিয়া নেদারল্যান্ডস থেকে কম্পিউটার কেনার চুক্তি শেষমেশ বাতিল করে দেন কারণ ঐ কোম্পানীর ব্র্যান্ডের নাম ছিলো, ‘টিউলিপ’! তিনি ভেবেছেন ওটা রেহানা’র মেয়ের নামে, তিনি জানতেন না যে, নেদারল্যান্ডস টিউলিপ ফুলের জন্যে বিখ্যাত। রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর গাড়িতে হামলা শুরু বেগম জিয়ার আমলে, গোপালগঞ্জে শেখ হাসিনা’র গাড়িতে হামলা দিয়ে তিনি তা শুরু করেন। ‘আপোষহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়ার স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ার ইতিহাস নেই.। ১৯৯৬ ও ২০০৬-এ দু’বার জনগণকে রক্ত দিয়ে তাকে ক্ষমতা থেকে নামাতে হয়? শেখ হাসিনা ২০০১-এ সহেজে ক্ষমতা ছেড়ে দেন্ এবং এরপর তিনি খালেদার কাছে ক্ষমতা না ছাড়ার ইতিহাস শেখেন।

খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশে প্রথম স্বৈরাচারী মহিলা প্রধানমন্ত্রী। আমি হন্যে হয়ে খুঁজেও খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রের জন্যে কি করেছেন তা পাইনি। আপনি খুঁজুন ও বলুন খালেদা জিয়া কি করেছেন? শেখ হাসিনাকে আপনি সারাদিন গালাগালি দিতে পারেন, কিন্তু আজকের উন্নত বাংলাদেশ তিনি গড়েছেন। আগামী দিনে মানুষ খালেদা জিয়াকে ভুলে যাবে, কারণ দেশের জন্যে তিনি কিছুই করেননি। আর শেখ হাসিনাকে মানুষ ভুলতে পারবে না, কারণ চারিদিকে যা কিছু উন্নয়ন সবই তার অবদান।

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী।

পাঠকের মতামত:

১০ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test