E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

টেকসই উন্নয়ন বোঝাপড়া: সংস্কৃতি কেন্দ্রিক তাত্ত্বিক কাঠামো

২০২৬ জানুয়ারি ১১ ১৮:১৭:০১
টেকসই উন্নয়ন বোঝাপড়া: সংস্কৃতি কেন্দ্রিক তাত্ত্বিক কাঠামো

ওয়াজেদুর রহমান কনক


টেকসই উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে যে এই উপাদানগুলো একা সমাজে দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর পরিবর্তন আনতে পারে না। উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তা মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, আচরণ এবং সামাজিক সম্পর্কের ভেতরে প্রবেশ করে। এই প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতি টেকসই উন্নয়নের একটি মৌলিক তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা উন্নয়নকে কেবল নীতিগত বা পরিসংখ্যানগত লক্ষ্য নয়, বরং মানবিক ও সামাজিক রূপান্তরের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বোঝার সুযোগ দেয়।

সংস্কৃতি মানুষের জীবনযাপনের ধরন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার কাঠামো নির্ধারণ করে। মানুষ কীভাবে শিক্ষা গ্রহণ করে, কীভাবে প্রকৃতি ও পরিবেশকে দেখে, কীভাবে নারী-পুরুষের ভূমিকা ব্যাখ্যা করে বা সামাজিক বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করে—এসবই সাংস্কৃতিকভাবে নির্মিত। ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা যতই সুস্পষ্ট হোক না কেন, সেগুলো বাস্তবায়ন তখনই কার্যকর হয়, যখন তা সংশ্লিষ্ট সমাজের সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। এই কারণেই সংস্কৃতিকে উন্নয়নের একটি সহায়ক উপাদান নয়, বরং তাত্ত্বিক কাঠামোর কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তাত্ত্বিকভাবে সংস্কৃতি ও টেকসই উন্নয়নের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে একাধিক সমাজতাত্ত্বিক ও উন্নয়ন তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলো দেখায় যে উন্নয়ন কেবল সম্পদের বণ্টন বা নীতিমালার প্রশ্ন নয়; এটি ক্ষমতা, অংশগ্রহণ, জ্ঞান ও আচরণের রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত। এই তত্ত্বসমূহের আলোকে টেকসই উন্নয়নকে বোঝা মানে মানুষের দৈনন্দিন চর্চা, সামাজিক সম্পর্ক এবং সমষ্টিগত স্মৃতির ভেতর দিয়ে পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করা। ফলে এই তাত্ত্বিক কাঠামো এসডিজিকে একটি বাহ্যিক লক্ষ্য হিসেবে নয়, বরং সমাজের অভ্যন্তরীণ রূপান্তরের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে।

টেকসই উন্নয়নকে বোঝার প্রচলিত কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবেশ—এই তিনটি স্তম্ভের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে একবিংশ শতাব্দীর গবেষণা, নীতিনির্ধারণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা ক্রমেই স্পষ্ট করেছে যে এই তিনটি স্তম্ভ একা মানবসমাজে দীর্ঘস্থায়ী রূপান্তর নিশ্চিত করতে সক্ষম নয়। এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতেই “সংস্কৃতি”কে টেকসই উন্নয়নের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করার তাত্ত্বিক প্রস্তাব উঠে আসে। Culture as the Fourth Pillar of Sustainable Development তত্ত্ব অনুযায়ী, উন্নয়ন কেবল বস্তুগত কল্যাণের প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের অর্থবোধ, পরিচয়, মূল্যবোধ, আচরণ ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। সংস্কৃতি মানুষের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো গড়ে তোলে, ফলে উন্নয়ন নীতির গ্রহণযোগ্যতা, স্থায়িত্ব ও সামাজিক মালিকানা নির্ভর করে সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তার সামঞ্জস্যের ওপর। এই তত্ত্ব উন্নয়নকে একটি মানবকেন্দ্রিক ও মূল্যভিত্তিক প্রক্রিয়া হিসেবে পুনর্নির্ধারণ করে, যেখানে সংস্কৃতি আর সহায়ক নয়, বরং মৌলিক চালিকাশক্তি।

এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত Cultural Capital Theory, যা পিয়ের বুরদিয়োর সমাজতাত্ত্বিক চিন্তা থেকে বিকশিত। এই তত্ত্ব সংস্কৃতিকে একটি অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী পুঁজি হিসেবে ব্যাখ্যা করে। ভাষা দক্ষতা, শিক্ষা, রুচি, শিল্পচর্চা, ঐতিহাসিক জ্ঞান ও সামাজিক আচরণ—এসব উপাদান ব্যক্তিকে সমাজে অবস্থান নিতে, সুযোগ কাজে লাগাতে এবং ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে চলাচল করতে সহায়তা করে। টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব দেখায় যে অর্থনৈতিক পুঁজি ছাড়া উন্নয়ন অসম্পূর্ণ, কারণ সাংস্কৃতিক পুঁজির অসম বণ্টন সামাজিক বৈষম্যকে পুনরুৎপাদন করে। যখন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল অভিব্যক্তিতে প্রবেশাধিকার সীমিত থাকে, তখন উন্নয়ন কেবল একটি শ্রেণি বা গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে এসডিজি বাস্তবায়নে সাংস্কৃতিক পুঁজির বিস্তৃতি ও গণতান্ত্রিকীকরণ একটি নৈতিক ও কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে ওঠে।

Social Practice Theory এই তাত্ত্বিক কাঠামোকে আরও গভীরতা দেয়, কারণ এটি উন্নয়নকে নীতিগত ঘোষণার স্তর থেকে দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাসের স্তরে নামিয়ে আনে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজ মূলত গঠিত হয় মানুষের পুনরাবৃত্ত আচরণ, রুটিন ও সামাজিক চর্চার মাধ্যমে। মানুষ কীভাবে পানি ব্যবহার করে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে, শিক্ষা গ্রহণ করে, লিঙ্গ ভূমিকা পালন করে বা প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে—এসবই সামাজিক অনুশীলনের অংশ। টেকসই উন্নয়ন তখনই বাস্তব হয়, যখন এই দৈনন্দিন অনুশীলনগুলো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। সংস্কৃতি এখানে একটি মধ্যস্থ শক্তি হিসেবে কাজ করে, কারণ গান, গল্প, আচার, লোকজ জ্ঞান ও শিল্প মানুষের আচরণগত কাঠামোকে প্রভাবিত করে। ফলে পরিবেশবান্ধব বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির সফলতা নির্ভর করে সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে তার সংযোগের ওপর।

এই তিনটি তত্ত্বের সঙ্গে Participatory Development Theory একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক মাত্রা যুক্ত করে। এই তত্ত্ব উন্নয়নকে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো প্রকল্প হিসেবে না দেখে মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এখানে উন্নয়নের মূল প্রশ্ন হয়ে ওঠে—কার কণ্ঠ শোনা হচ্ছে এবং কার অভিজ্ঞতা মূল্য পাচ্ছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এই অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে, কারণ মানুষ নিজের ভাষা, গল্প ও শিল্পের মাধ্যমে উন্নয়ন আলোচনায় যুক্ত হতে পারে। নাটক, গান, কমিউনিটি আর্ট বা স্থানীয় উৎসব কেবল সাংস্কৃতিক প্রকাশ নয়; এগুলো ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্বিন্যাসের মাধ্যম, যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিজস্ব বয়ানে উন্নয়নকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।

এই চারটি তত্ত্ব একত্রে একটি সমন্বিত তাত্ত্বিক কাঠামো গড়ে তোলে, যেখানে টেকসই উন্নয়নকে অর্থনৈতিক দক্ষতা বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার চেয়ে বেশি একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। সংস্কৃতি এখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মানবিক অর্থ দেয়, সামাজিক নীতিকে দৈনন্দিন চর্চায় রূপান্তরিত করে এবং উন্নয়নকে মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে এসডিজি বাস্তবায়ন একটি বাহ্যিক নীতিগত লক্ষ্য না থেকে ধীরে ধীরে একটি অভ্যন্তরীণ সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

১২ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test