E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

সংবাদকর্মীদের আস্থার আকাশ: অধিকার আদায়ের মিছিলে অবিনাশী আলতাফ মাহমুদ

২০২৬ জানুয়ারি ২২ ১৮:৫০:০৫
সংবাদকর্মীদের আস্থার আকাশ: অধিকার আদায়ের মিছিলে অবিনাশী আলতাফ মাহমুদ

মানিক লাল ঘোষ


বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও সাংবাদিক ইউনিয়ন আন্দোলনের ইতিহাসে আলতাফ মাহমুদ একটি নাম নয়, বরং একটি প্রতিষ্ঠানের নাম। ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি রাজধানীর বিএসএমএমইউ হাসপাতালে এই গুণী মানুষটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার চলে যাওয়ার মাধ্যমে সংবাদকর্মী সমাজ এমন এক অভিভাবককে হারিয়েছে, যিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে সহকর্মীদের স্বার্থকে সবসময় বড় করে দেখতেন।

আলতাফ মাহমুদের সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয়েছিল অনেকটা লড়াই করে। তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে এসে তিনি জাতীয় গণমাধ্যমে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘ সময় জনপ্রিয় দৈনিক ‘ডেস্টিনি’ পত্রিকায় নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে তিনি দৈনিক ‘খবর’ সহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছেন। তার পেশাদারিত্বের মূল ভিত্তি ছিল সততা এবং নিরপেক্ষতা।

তিনি দীর্ঘ সময় সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত থাকলেও তার মূল পরিচিতি গড়ে ওঠে একজন বলিষ্ঠ শ্রমিক নেতা হিসেবে। তিনি কেবল ডেস্কে বসে খবর সম্পাদনা করেননি, বরং খবর যারা তৈরি করেন—সেই সাংবাদিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য রাজপথে জীবন পার করেছেন। সাংগঠনিক জীবনে তিনি সাংবাদিকদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর শীর্ষপদে আসীন ছিলেন:

বিএফইউজে (বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন): মৃত্যুপূর্ব পর্যন্ত তিনি বিএফইউজে-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে তিনি এই সংগঠনের মহাসচিব হিসেবেও অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

ডিইউজে (ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন): সাংবাদিকদের রুটি-রুজির লড়াইয়ের সূতিকাগার ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের তিনি একাধিকবার সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

আলতাফ মাহমুদ মানেই ছিল রাজপথে ব্যানার হাতে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া এক মুখ। তার নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল সাংবাদিকদের বেতন কাঠামোর জন্য নবম ওয়েজ বোর্ড গঠন ও বাস্তবায়নের আন্দোলন।

অনশন ও অবস্থান কর্মসূচি: মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা, যখন প্রচণ্ড রোদ বা বৃষ্টি উপেক্ষা করে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তিনি দীর্ঘ সময় অবস্থান কর্মসূচিতে বসে থাকতেন। তিনি বলতেন, "মালিকদের মুনাফা বাড়ে, কিন্তু যে সাংবাদিক রক্ত পানি করে খবর আনেন, তার ঘরে কেন চাল থাকবে না?"

সচিবালয় ঘেরাও ও লবিং: তিনি কেবল রাজপথেই সরব ছিলেন না, বরং সরকারের উচ্চপর্যায়ে গিয়ে যুক্তিতর্ক দিয়ে সাংবাদিকদের দাবিগুলো তুলে ধরতেন। তার অকাট্য যুক্তির সামনে অনেক সময় নীতিনির্ধারকরাও নতি স্বীকার করতে বাধ্য হতেন।

সাংবাদিকদের বিপদে তিনি কীভাবে পাশে দাঁড়াতেন, তার অসংখ্য স্মৃতি আজও সহকর্মীদের মুখে মুখে ফেরে।

বকেয়া বেতন আদায়ের স্মৃতি: একবার একটি বড় সংবাদপত্রে কয়েক মাসের বেতন বকেয়া ছিল। আলতাফ মাহমুদ গভীর রাত পর্যন্ত সেই প্রতিষ্ঠানের সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং ঘোষণা দিয়েছিলেন—"বেতন না হওয়া পর্যন্ত কোনো সাংবাদিক এই আঙিনা ছাড়বে না।"

অসুস্থ সাংবাদিকের পাশে: তিনি নিজে অসুস্থ থাকার সময়ও অনেক জুনিয়র সাংবাদিকের চিকিৎসার জন্য ফান্ড সংগ্রহ করেছেন। নিজের পকেটে টাকা না থাকলেও তিনি ফোন করে কারো না কারো মাধ্যমে সাহায্যের ব্যবস্থা করে দিতেন।

সাংবাদিকরা রাজনৈতিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত হলেও আলতাফ মাহমুদ ছিলেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। তিনি রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন ঠিকই, কিন্তু যখনই কোনো সাধারণ সাংবাদিক বিপদে পড়েছেন, তিনি তার রাজনৈতিক পরিচয় দেখেননি। জুনিয়র সাংবাদিকদের জন্য তার দরজা সবসময় খোলা থাকতো।

বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমে যখন কর্পোরেট সংস্কৃতি প্রবল হচ্ছে এবং সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে, তখন আলতাফ মাহমুদের মতো নেতার অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হয়। তিনি কেবল দাবি আদায়ের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাংবাদিকদের নৈতিক শক্তির আধার। "সাংবাদিকতা রক্ষা করতে হলে আগে সাংবাদিককে রক্ষা করতে হবে"— এই মূলমন্ত্রটি তিনি প্রতিটি সভায় উচ্চকণ্ঠে বলতেন।

আলতাফ মাহমুদ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার আদর্শ ও দিকনির্দেশনা আজও সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর জন্য পাথেয়। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা যতকাল টিকে থাকবে, শোষিত ও অধিকারবঞ্চিত সংবাদকর্মীদের হৃদয়ে আলতাফ মাহমুদ বেঁচে থাকবেন এক অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি।

পাঠকের মতামত:

২২ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test