E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

মার্ক টালি: একাত্তরের কণ্ঠস্বর ও বাঙালির অকৃত্রিম বন্ধু

২০২৬ জানুয়ারি ২৭ ১৮:৫৫:৫৮
মার্ক টালি: একাত্তরের কণ্ঠস্বর ও বাঙালির অকৃত্রিম বন্ধু

মানিক লাল ঘোষ


১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যখন ঢাকার আকাশে বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা উড়ছিল, সেই আনন্দের ঢেউ কেবল এ দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সেই স্পন্দন পৌঁছে গিয়েছিল লন্ডনের বুশ হাউসেও। আর সেই স্পন্দনকে বিশ্ববাসীর কানে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম কারিগর ছিলেন স্যার মার্ক টালি। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে কলম আর কণ্ঠকে অস্ত্র বানিয়ে যিনি লড়াই করেছিলেন, তিনি কেবল একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক নন—তিনি আমাদের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন পুরো পূর্ব পাকিস্তানকে একটি মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছিল, তখন বিশ্বজুড়ে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে প্রবল অপপ্রচার (প্রোপাগান্ডা) চালানো হচ্ছিল। সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার সেই মিশনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বিবিসিতে কর্মরত মার্ক টালী।

দিল্লিতে বিবিসির ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে আসা লাখ লাখ শরণার্থীর আর্তনাদ এবং রণাঙ্গনের বীরত্বের কথা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন। তাঁর বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনের কারণেই বিশ্ববাসী জানতে পেরেছিল যে, এটি কোনো 'গৃহযুদ্ধ' নয়, বরং একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

একাত্তরে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে 'আকাশবাণী' আর 'বিবিসি' ছিল আশার বাতিঘর। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর যখন মার্ক টালীর ভরাট গলায় সংবাদের শিরোনাম শুরু হতো, তখন গ্রাম-বাংলার মানুষ রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করত।

নির্ভরযোগ্যতা: তৎকালীন মানুষ পাকিস্তানি রেডিওর মিথ্যাচারের চেয়ে মার্ক টালীর সংবাদকে বেশি বিশ্বাস করত।

যোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা: রণাঙ্গনে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তাঁর পাঠানো সংবাদগুলো ছিল অক্সিজেনের মতো। তাঁর কণ্ঠ শুনে যোদ্ধারা সাহস পেতেন, বুঝতেন বিশ্ব তাঁদের পাশে আছে।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি যুদ্ধের ময়দান ও শরণার্থী শিবিরের যে চিত্র তুলে ধরেছিলেন, তা আজও ইতিহাসের অমূল্য দলিল হয়ে আছে। একজন ব্রিটিশ হয়েও বাংলাদেশের প্রতি তাঁর টান ছিল প্রশ্নাতীত।
২০১২ সালে যখন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে, তখন তিনি বলেছিলেন—বাংলাদেশের মানুষের এই ভালোবাসা তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন। তিনি কেবল সংবাদ পরিবেশন করেননি, তিনি বাঙালির আবেগ ও বঞ্চনার ভাষাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন বিশ্ববিবেকের দরবারে। "মার্ক টালী কেবল সাংবাদিক নন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অলিখিত রাষ্ট্রদূত।"

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে মার্ক টালীর নাম অক্ষয় হয়ে থাকবে। আজ যখন আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে বাস করছি, তখন তাঁর সেই দুঃসাহসিক সাংবাদিকতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।

বিবিসির প্রখ্যাত সাংবাদিক ও বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু মার্ক টালী ৯০ বছর বয়সে গত ২৫ জানুয়ারি, রবিবার ভারতের নয়াদিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে (ম্যাক্স হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আর আমাদের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের পাতায় মার্ক টালী চিরকাল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন। তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি।

পাঠকের মতামত:

২৭ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test