E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

বাংলাদেশে ক্যানসার রোগী ও মৃত্যুহার ক্রমবর্ধমান

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ০৩ ১৭:৫২:৩৭
বাংলাদেশে ক্যানসার রোগী ও মৃত্যুহার ক্রমবর্ধমান

ওয়াজেদুর রহমান কনক


ক্যানসার আজ আর কেবল একটি চিকিৎসাজনিত রোগ হিসেবে বিবেচিত নয়; এটি আধুনিক সভ্যতার অন্যতম জটিল জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। জিনতত্ত্ব, পরিবেশ, জীবনযাপন, খাদ্যব্যবস্থা, নগরায়ণ এবং বৈষম্যপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবার সম্মিলিত প্রভাবে ক্যানসার এখন বৈশ্বিক বাস্তবতা। বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যার আয়ু বৃদ্ধি, সংক্রামক রোগের তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপনের বিস্তার ক্যানসারের প্রকোপ বাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ক্যানসারের বড় একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও আচরণগত ঝুঁকির ফল, যা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ক্যানসার বোঝার দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। এখন ক্যানসারকে একটি একক রোগ হিসেবে নয়, বরং কোষের জিনগত ও এপিজেনেটিক পরিবর্তনের ফল হিসেবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিগ ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে টিউমারের আচরণ পূর্বাভাস দেওয়া, চিকিৎসার প্রতিক্রিয়া অনুমান করা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে গবেষণায় উঠে আসছে, সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থান, শিক্ষা, পুষ্টি এবং মানসিক চাপ ক্যানসারের ঝুঁকি ও চিকিৎসা-ফলাফলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ আজ আর শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসার বিষয় নয়; এটি প্রতিরোধ, সচেতনতা, স্বাস্থ্যসমতা এবং মানবিক সহমর্মিতার সমন্বিত প্রয়াস।

এই বাস্তবতায় ক্যানসারকে মোকাবিলা করতে হলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির পাশাপাশি প্রয়োজন জনস্বাস্থ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, তথ্যভিত্তিক নীতি নির্ধারণ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ কমানো, পরিবেশ সুরক্ষা এবং রোগীর মানসিক ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা—এসবই ক্যানসার মোকাবিলার সমান গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্যানসারের গুরুত্ব তাই কেবল রোগ নিরাময়ের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জীবনের মান, মানবিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যসম্মত সমাজ গড়ে তোলার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

৪ ফেব্রুয়ারি পালিত বিশ্ব ক্যানসার দিবস আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য এবং মানবিক নৈতিকতার একটি সম্মিলিত প্রতিফলন। এই দিনটি কেবল একটি নির্দিষ্ট রোগকে স্মরণ করার আনুষ্ঠানিক উপলক্ষ নয়; বরং এটি মানবসভ্যতার বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জীবনের প্রতি সম্মিলিত অঙ্গীকারের প্রতীক। ক্যানসার এমন একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যচ্যালেঞ্জ, যা জাতি, শ্রেণি, ধর্ম কিংবা ভৌগোলিক সীমারেখা মানে না। তাই বিশ্ব ক্যানসার দিবসের গুরুত্ব নিহিত রয়েছে এর সর্বজনীনতা এবং বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে, যেখানে চিকিৎসা, প্রতিরোধ, সচেতনতা ও সহমর্মিতা একসঙ্গে আলোচিত হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে ক্যানসার গবেষণা একটি দীর্ঘ ও জটিল অভিযাত্রা। প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিসের সময় থেকেই এই রোগ সম্পর্কে ধারণা থাকলেও আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসা মূলত উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি লাভ করে। কোষতত্ত্ব, জেনেটিক্স এবং মলিকিউলার বায়োলজির বিকাশ ক্যানসারকে কেবল একটি অজানা ও অনিবার্য রোগ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। আজকের যুগে টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, প্রিসিশন মেডিসিন এবং জিনোমিক প্রোফাইলিং ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। রোগীর জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করার সক্ষমতা চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি বৈপ্লবিক অর্জন, যা শুধু জীবনকাল বাড়াচ্ছে না, রোগীর জীবনমান উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে ক্যানসার কেবল একটি চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক সমস্যা নয়; এটি গভীরভাবে জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ক্যানসারের একটি বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং পরিবেশগত দূষণ এই রোগের প্রধান ঝুঁকির কারণ। তাই বিশ্ব ক্যানসার দিবস জনস্বাস্থ্য সচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে, যেখানে প্রতিরোধমূলক আচরণ, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং সময়মতো রোগ শনাক্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার পেছনে দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া এবং চিকিৎসা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা বড় ভূমিকা রাখে, যা স্বাস্থ্যসমতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্ব ক্যানসার দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। ক্যানসার আক্রান্ত ব্যক্তি শুধু শারীরিক কষ্টেই ভোগেন না; তাদের মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপও বহন করতে হয়। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা রোগী ও তার পরিবারের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সহানুভূতিশীল ভূমিকা ছাড়া ক্যানসার মোকাবিলা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। রোগীর মর্যাদা রক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি আধুনিক চিকিৎসার নৈতিক ভিত্তির অংশ। বিশ্ব ক্যানসার দিবস তাই চিকিৎসকদের পাশাপাশি নীতিনির্ধারক, গবেষক, সমাজকর্মী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্যানসার এখন ধীরে ধীরে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবো ক্যান্সার অবজারভেটরি–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং একই বছরে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। পুরুষদের মধ্যে মুখ ও মুখগহ্বর, খাদ্যনালী এবং ফুসফুসের ক্যানসার বেশি দেখা যায়, আর নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার একটি বড় সমস্যা। জাতীয় পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার রেজিস্ট্রি না থাকায় প্রকৃত রোগীর সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশে ক্যানসার বৃদ্ধির পেছনে তামাকজাত দ্রব্যের ব্যাপক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, আর্সেনিক দূষিত পানি এবং ভাইরাসজনিত সংক্রমণ বড় ভূমিকা রাখছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক রোগী দেরিতে শনাক্ত হন, ফলে চিকিৎসার সাফল্য কমে যায়। পাশাপাশি ক্যানসার চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় রোগী ও পরিবারের জন্য বড় অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বিশ্ব ক্যানসার দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ক্যানসার মোকাবিলা শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়; এটি সচেতনতা, প্রতিরোধ, ন্যায়ভিত্তিক স্বাস্থ্যনীতি এবং মানবিক সহমর্মিতার সমন্বিত প্রয়াস। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে এই সমন্বিত উদ্যোগই ক্যানসার নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test