E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

ধানসিঁড়ি ও জীবনানন্দ: রূপসী বাংলার চিরন্তন হাহাকার

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ১৭ ১৭:৩৪:৩৫
ধানসিঁড়ি ও জীবনানন্দ: রূপসী বাংলার চিরন্তন হাহাকার

মানিক লাল ঘোষ


১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালের এক নিভৃতচারী ব্রাহ্ম পরিবারে যখন এক শিশুর জন্ম হলো, তখন কেউ কি ভেবেছিল এই মানুষটিই একদিন হয়ে উঠবেন বাংলা কবিতার ‘শুদ্ধতম’ কণ্ঠস্বর? আজ সেই মরমী কবি জীবনানন্দ দাশের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী। রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে যিনি আধুনিকতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন, প্রকৃতির গহীন কোণে খুঁজে পেয়েছিলেন বিষণ্ণতার এক অনন্য কারুকাজ। নাগরিক কোলাহল ছেড়ে তিনি বারবার ফিরে গিয়েছেন বাংলার নিসর্গে, যেখানে ধুলোবালি আর ঘাসের ঘ্রাণে মিশে আছে এক শাশ্বত একাকীত্ব।

জীবনানন্দ দাশ এবং ধানসিঁড়ি নদী— এই দুটি নাম এখন অবিচ্ছেদ্য। ঝালকাঠি জেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া এই সরু নদীটি কবির কাছে কেবল একটি জলধারা ছিল না, ছিল এক পরম আশ্রয় এবং জন্মান্তরের আকাঙ্ক্ষা। নাগরিক ক্লান্তি যখন কবিকে গ্রাস করত, তিনি মানসচক্ষুতে ফিরে যেতেন সেই ধানসিঁড়ির তীরে। তাঁর কাছে এই নদী ছিল বাংলার শাশ্বত রূপের প্রতিনিধি। ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে— এই বাংলায়’— এই চরণের মাধ্যমে কবি মৃত্যুকে তুচ্ছ করে প্রকৃতির মাঝে বেঁচে থাকার যে তীব্র বাসনা প্রকাশ করেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল।

জীবনানন্দ ছিলেন মূলত প্রকৃতির কবি, কিন্তু তাঁর সেই প্রকৃতি আমাদের চেনা সবুজ বনানীর চেয়েও গভীর। তিনি দেখিয়েছেন ঘাসের শিশিরবিন্দুতে কীভাবে মহাকালের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। তিনি এমন এক সময়ে কবিতা লিখেছেন যখন বিশ্বযুদ্ধ আর মন্বন্তর মানুষের অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই তাঁর কবিতায় প্রকৃতির স্নিগ্ধতার পাশাপাশি মিশে আছে এক অদ্ভুত বিপন্নতা ও একাকীত্ব। তাঁর কবিতায় তুচ্ছ ঘাস আর লতা-পাতার পাশাপাশি উঠে এসেছে ব্যবিলন, মিশর আর অশোকের সময়ের ধূসর ইতিহাস।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ আমরা যাঁকে নিয়ে এত গর্ব করি, সেই জীবনানন্দ দাশ জীবদ্দশায় ছিলেন চরম অবহেলিত ও একাকী। দারিদ্র্য আর বেকারত্ব ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। তাঁর কবিতাকে সে সময়কার অনেক সমালোচকই ‘ can provide we are the world's most unique voice. ‘দুর্বোধ্য’ বলে তকমা দিয়েছিলেন। কিন্তু কবি ছিলেন অবিচল। ১৯৫৪ সালে ট্রাম দুর্ঘটনায় তাঁর আকস্মিক মৃত্যু যেন তাঁর কবিতার সেই করুণ সুরেরই এক বাস্তব প্রতিফলন। তাঁর মৃত্যুর পর ট্রাঙ্ক থেকে উদ্ধার হওয়া শত শত পাণ্ডুলিপি আজ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

আজকের যান্ত্রিক পৃথিবীতে যখন নদীগুলো হারিয়ে যাচ্ছে আর প্রকৃতি ধুঁকছে, তখন জীবনানন্দের কবিতা আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে। ধানসিঁড়ি নদী আজ মৃতপ্রায়। কবির সেই স্বপ্নের নদীকে পলি আর দখলমুক্ত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ধানসিঁড়িকে বাঁচিয়ে রাখা মানে কেবল একটি জলাধারকে রক্ষা করা নয়, বরং আমাদের সাহিত্যিক ঐতিহ্য ও কবির স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা। আজ তাঁর জন্মদিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক— প্রকৃতিকে ভালোবেসে জীবনানন্দের সেই 'রূপসী বাংলা'কে আগলে রাখা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

পাঠকের মতামত:

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test