E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা 

২০২৬ মার্চ ০৬ ১৭:৩৯:৫০
অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা 

ওয়াজেদুর রহমান কনক


রাজনীতি কখনো কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; অনেক সময় তা মানুষের জীবনসংগ্রাম, স্বপ্ন এবং ন্যায্যতার দাবির এক দীর্ঘ ইতিহাস। বাংলাদেশের ইতিহাসেও এমন কিছু রাজনৈতিক ধারার জন্ম হয়েছে, যেগুলো নিছক দলীয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের অধিকার, শ্রমের মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে সামনে এনেছে। এই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হলো বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি।

৭৮ বছরের পথচলায় এই দলটির ইতিহাস মূলত মানুষের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা রাজনীতির ইতিহাস—ক্ষুধা, বঞ্চনা, শ্রমের ন্যায্য মূল্য, গণতন্ত্র এবং সমতার দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংগ্রামের ইতিহাস। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিকাশ, সামাজিক আন্দোলন এবং প্রগতিশীল চিন্তার ধারাকে বোঝার জন্য তাই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা ও নেতৃত্বের ইতিহাস বিশ্লেষণ করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

উপমহাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূচনা ঘটে মূলত রুশ বিপ্লব-এর আদর্শিক প্রভাবের মাধ্যমে। সমাজতন্ত্র, শ্রমিক অধিকার ও সাম্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা দ্রুতই ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী ও শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ পূর্ববাংলায় সংগঠিত কমিউনিস্ট রাজনীতির ধারাবাহিকতা থেকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সূচনা ঘটে। যদিও তখন অঞ্চলটি ছিল পাকিস্তানের অংশ, তবুও পার্টির রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল সামন্তবাদ, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং সামরিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে সংগঠিত করা।
পাকিস্তান আমলে বামপন্থী রাজনীতির ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চললেও কমিউনিস্ট পার্টি বিভিন্ন গণআন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বিশেষত ভাষা আন্দোলন-এ দলটির কর্মী ও সমর্থকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ গড়ে ওঠে, তার সঙ্গে বামপন্থী রাজনীতির একটি গভীর সম্পর্ক ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি তখন ভাষা, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক ন্যায্যতার প্রশ্নকে একত্রিত করে একটি গণমুখী রাজনৈতিক চেতনা তৈরিতে অবদান রাখে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা নতুনভাবে নির্ধারিত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, ভূমি সংস্কার, শ্রমিক অধিকারের প্রশ্ন এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতে পার্টি বিভিন্ন রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই সময় পার্টি শ্রমিক সংগঠন, কৃষক সমিতি এবং ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির ইতিহাসে এই সংগঠনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করেছে, যেখানে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং রাজনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা ও আলোচনা চলেছে।

৭৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসকে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, সংগঠনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তির প্রতিনিধিত্ব করেছে। যদিও নির্বাচনী রাজনীতিতে দলটি সবসময় বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি, তবুও রাজনৈতিক মতাদর্শ, সামাজিক আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশে এর ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে কমিউনিস্ট পার্টির অবদান মূলত তিনটি স্তরে প্রতিফলিত হয়েছে—ঔপনিবেশিক ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং স্বাধীনতার পর সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে ধারাবাহিক রাজনৈতিক অবস্থান। এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে, যা আজও দেশের রাজনৈতিক চিন্তায় প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সিপিবির ভূমিকা ছিল বহুমুখী ও গৌরবোজ্জ্বল। কেবল আদর্শিক সমর্থন বা প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থেকে তারা ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের সাথে মিলে প্রায় ২০ হাজার প্রশিক্ষিত সদস্যের একটি বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠন করে সরাসরি রণক্ষেত্রে লড়াই করেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের সমর্থন আদায়ের পেছনেও দলটির ছিল কার্যকর ভূমিকা। বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়নের 'ভেটো' এবং স্বাধীনতার পর চট্টগ্রাম বন্দর মাইনমুক্ত করার পেছনে সিপিবির রাজনৈতিক সংযোগ এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে। তৎকালীন প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে কমরেড মণি সিংহের অন্তর্ভুক্তিকরণ মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের অবদানেরই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।

স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশেও সিপিবি তার লড়াকু চরিত্র বজায় রেখেছে। পঁচাত্তর পরবর্তী সামরিক শাসন এবং আশি ও নব্বইয়ের দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দলটি রাজপথের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে। ১৫ দলীয় জোট গঠন ও লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে বুর্জোয়া দলগুলোর সাথে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দলটির তাত্ত্বিক ও কৌশলগত নেতৃত্ব ছিল অনন্য। যদিও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যে স্থবিরতা আসে, তার ধাক্কা সিপিবিতেও লেগেছিল এবং ১৯৯৩ সালে দলটিতে বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ঘটে। তবে সেই সংকট কাটিয়ে কমরেড ফরহাদের মতো দূরদর্শী নেতাদের উত্তরসূরিরা পার্টিকে পুনর্গঠিত করে "বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প" শক্তির স্লোগান নিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন।

নির্বাচনী রাজনীতির হিসাব-নিকাশে সিপিবির শক্তি হয়তো সবসময় বড় হয়ে ওঠেনি, কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল বাঁকবদলে এই সংগঠনটি একটি শক্তিশালী "ইন্টেলেকচুয়াল ও পলিটিক্যাল প্রেসার গ্রুপ" হিসেবে কাজ করেছে। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও বহু প্রতিকূলতার মাঝেও গত ৭৮ বছর ধরে তারা সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের যে মশাল বহন করে চলেছে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক অপরিহার্য অংশ।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

০৭ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test