E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

ভালোগুলো মনে রেখে এগিয়ে যেতে চাই

২০২৬ মার্চ ০৬ ১৭:৫০:৫১
ভালোগুলো মনে রেখে এগিয়ে যেতে চাই

আবদুল হামিদ মাহবুব


প্রথম প্রথম আমাদের অনেক কিছুই দেখানো হয়। কিছুদিন যাওয়ার পর দেখা যায় সেই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসানো। যদি এমন ধারাবাহিকতা থাকে তাহলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। দেশ চলবে একটা নিয়মতান্ত্রিক অবস্থার মধ্য দিয়ে। আর যদি নতুন অবস্থায় প্রচার পাওয়া, বাহ্ বাহ্ কুড়ানো, এসব উদ্দেশ্যে এমন করা হয়, তাহলে জনগণের কোন লাভ হবে না। মন্ত্রীরা মিডিয়ায় ভালো কাভারেজ পাবেন, তারদের ছবি ও নাম প্রচার হবে। এই পর্যন্তই শেষ হয়ে যাবে। আমি চাইবো, না কেবল আমি একা না, আমরা সবাই চাইবো মন্ত্রীদের এইরূপ তৎপরতা আগামী পুরো দায়িত্বকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

কথাগুলো মাথায় আসলো আমাদের ভূমি প্রতিমন্ত্রীর (গত ৪ মার্চ'২০২৬) একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস পরিদর্শনের সংবাদ চিত্র দেখে।নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি উপজেলার ইউনিয়ন ভূমি অফিসে প্রতিমন্ত্রী মহোদয় গিয়ে হাজির হলেন সকাল আটটা ৫৫ মিনিটে। তখনো পরিচ্ছন্নকর্মী ছাড়া অফিসে কেউ আসেনি। অফিস চালু হওয়ার সময় সকাল ৯ টা। কিন্তু সবকটি রুম তালাবদ্ধ। প্রতিমন্ত্রী মহোদয় তালাবদ্ধ দরজার কাছে অফিসের বারান্দায় একটি চেয়ারে বসে পড়লেন। সেবা গ্রহীতারা আসতে শুরু করলেন। তিনি তাদের সাথে কথাবার্তা বলছিলেন। তারা কে কি কাজে এসেছেন? কি কি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন? এসবই শুনছিলেন। এভাবেই কাটে প্রায় ৪৫ মিনিট। তারপর অফিসে আসেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তিনি ঘড়ি দেখিয়ে বললেন অফিস খোলার সময় নয়টা, আর আপনি এসেছেন পৌনে দশটায়। তখনো ওই অফিসের অন্যান্য সহকারীরা আসেননি।

মন্ত্রী যে এই অফিসে যাবেন সেটা কিন্তু আমাদের সাংবাদিকরা আগেই জেনে গিয়েছিলেন! না জানলে তারা ফুটেজ নিতে পারতেন না। মন্ত্রীর কথাও রেকর্ড করতে পারতেন না। বোঝা যায় সাংবাদিকদের জানিয়েই মন্ত্রী ওই অফিসের কর্মকাণ্ড দেখতে গিয়েছেন। এ থেকে আমি অনুমান করি, তার এসব কাজ সংবাদপত্রে কভারেজ পাওয়ার একটা ইচ্ছে ছিল। তিনি আগেই হয়ত তাঁর প্রোগ্রাম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন। সেই কারণে টিভি ও সংবাদপত্রে তিনি কাভারেজটাও পেয়েছেন। লেখাটাকে নেতিবাচক করছি না। এটাকে ইতিবাচক ঘটনা হিসাবে ধরে নিয়েই পরবর্তী কথাগুলো বলে নিই।

ওই ভূমি অফিস পরিদর্শন কালে কর্মকর্তা বলি, আর কর্মচারীই বলি, তার চেয়ার দেখে আমাদের প্রতিমন্ত্রী মহোদয় আঁতকে উঠেছেন। তিনি প্রশ্ন করেছেন এত বড় চেয়ার কেন? তাকে সেই চেয়ারে বসার জন্য বলা হলেও তিনি কর্মকর্তার সামনে সাধারণ মানুষ বসার যে চেয়ার রাখা ছিল, সেটাতে বসেছেন। এটাও প্রশংসনীয় বিষয়। যার চেয়ার, সেটা তারই। যত বড় কর্মকর্তাই যেখানেই যান না কেনো, নির্দিষ্ট কারো চেয়ারে অন্য কেউ বসা যথাযথ কিংবা শোভনও নয়। আমাদের এই প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের সেই বোধটুকু আছে দেখে, আমি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেই সাধুবাদ জানাচ্ছি। কারণ মাঠ পর্যায়ে আমার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে আমি দেখেছি অনেক বড়কর্তা তাঁর অধস্তনদের অফিস পরিদর্শনে গিয়ে নিম্ন কর্মকর্তার চেয়ারেখানাতে বসে পড়েন। এক্ষেত্রে আমাদের মন্ত্রী অবশ্যই ব্যতিক্রম দেখিয়েছেন।

আমাদের ভূমি অফিসগুলো দুর্নীতিতে আখণ্ড নিমজ্জিত, এমন অভিযোগ নতুন নয়। ভূমি মালিকরা, যারা প্রয়োজনের তাগিদে বাধ্য হয়ে ভূমি অফিসে যান, তারা হাড়ে হাড়ে টের পান হয়রানী কাকে বলে! আমাদের মন্ত্রী মহোদয় যখন সাধারণ পাবলিক ছিলেন, নিশ্চয়ই তার কিংবা তার পরিবারের কারো না কারো সেই অভিজ্ঞতা আছে।

সংবাদপত্রে দেখলাম ওই ভূমি অফিস পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিমন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, ‘সারা দেশের ভূমি অফিসগুলো নিয়েই প্রশ্ন আছে। অনেক অভিযোগ–অনুযোগ আছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ভূমি অফিসের সেবা দানকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সেবা গ্রহীতাদের দূরত্ব আছে। তাঁরা সঠিকভাবে বলেন না, কোন সেবা পেতে কতো সময় লাগতে পারে। আমাদের প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক মনোভাব এখনো বিরাজমান। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা কর্মচারী হিসেবে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নির্দেশে বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি।’

তার এই সংক্ষিপ্ত কথায় পুরো চিত্র উঠে এসেছে। এখন তার হাত দিয়ে এই চিত্রটা কিভাবে পাল্টায় আমরা সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকবো। মন্ত্রী মহোদয়কে এটাও মনে রাখতে হবে আমলাদের পরিচালনা করা অনেক জটিল। কোন সহজ বিষয় প্রবর্তন করার চেষ্টা করলে আমলারা সেটাকে জটিল ও কঠিন করতে এটা-ওটা সামনে এনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেন। এখানে মন্ত্রী মহোদয়কে দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিতে হবে। আমরা আশা রাখতে চাই তারেক রহমানের সরকার আমলাদের প্রাধান্য না দিয়ে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে সকল বিষয়ের উত্তরণ ঘটানোর সঠিক পথ নির্ধারণ করে সামনে এগোবেন।

এদেশের মানুষ রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে বেশি কিছু তো আশা করে না। তাদের আশাটা হচ্ছে; কোন ধরনের অবৈধ লেনদেন ছাড়া শান্তি স্বস্তিতে ঠিক সময়ে ঠিক কাজটা করিয়ে নিতে পারা। ভূমি প্রতিমন্ত্রীর তৎপরতায় এই আশাটা অন্তত রাখতেই চাই। তিনি তার মন্ত্রণালয়ের সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে জনগণের সেবক হিসেবে গড়ে তুলবেন।

আর আমাদের এই ভূমি প্রতিমন্ত্রী দেশের একজন খ্যাতিমান আইনজীবীও বটে। আইনগত ফাঁক-ফোকর সব তার নখ দর্পণে আছে। তাঁকে যা-তা বলে কিংবা বুঝিয়ে কেউ পার পাবেন আমার মনে হয় না। উপর ঠিক থাকলে নিচের দিকের সবাই আলিফের মতো সোজা থাকবে। নয়- ছয় করার সাহস পাবে না।

মন্ত্রী মহোদয় নারায়ণগঞ্জের একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস দেখেছেন। আমি বলব, তিনি অন্যান্য জেলার আরো ভূমি অফিসগুলো দেখবেন। শুধু ইউনিয়ন ভূমি অফিস না, উপজেলা ভূমি অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে, একটি নামজারী মামলা সর্বোচ্চ কতদিন পড়ে আছে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) দৈনিক কতটি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন? সাপ্তাহ কিংবা মাসে কতটি আছে অনিষ্পন্ন? কতগুলো বাতিল হয়েছে? বাতিল হওয়া মামলাগুলোর কারণগুলো খতিয়ে দেখার পন্থা থাকতে হবে? আমার নিজের অভিজ্ঞতা হচ্ছে; (সেটা অবশ্য তিন বছর আগের) ঘুষ না দেওয়ার কারণে সকল কিছু ঠিক থাকার পরও এক আত্মীয়ের নামজারী মামলা বাতিল করে দেওয়া হয়েছিলো।

ঘুস দুর্নীতির ব্যাপারে এই সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। এমন জিরো টলারেন্সের কথা আমরা ফ্যাসিস্ট হাসিনার সময়ও শুনেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে দেখেছিলাম পুরো উল্টা। সকল অফিসে বলগাহীন ঘুস গ্রহণের মহোৎসব চলেছে। মুখে এক বলে হাসিনা সরকার করেছিল আরেক। তারেক রহমানের সরকারের ক্ষেত্রে এবার এমনটা হবে না বলেই বিশ্বাস রাখতে চাই।

নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা শুরুতে যে পারফরম্যান্স দেখাচ্ছেন, তাতে আমরা সাধারণ মানুষ হিসাবে আশায় বুক বাঁধছি। তবে এক দুজনের লাগামহীন কথাবার্তা আমাদের আশাহতও করছে। মন্দগুলো দূরে সরিয়ে আমরা ভালোগুলো মনে রেখে সামনে এগিয়ে যেতে চাই। আগামী দিনগুলো বাংলাদেশের মানুষের ভালোয় ভালোয় ভরে উঠুক। আমি সেই প্রত্যাশা রাখছি। নিশ্চয়ই এই প্রত্যাশা রাখছে দেশের মানুষও।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।

পাঠকের মতামত:

০৭ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test