E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদ: মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার ও নীতি নির্দেশে চ্যালেঞ্জ

২০২৬ মার্চ ১৩ ১৮:১৩:৪৫
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদ: মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার ও নীতি নির্দেশে চ্যালেঞ্জ

দেলোয়ার জাহিদ


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ১২ মার্চ ২০২৬ সালে। দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক শোষণ ও নিষ্ঠুরতার পর এই অধিবেশন একটি নতুন গণতান্ত্রিক সূচনার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অসংখ্য শহীদ, নির্যাতিত, এবং সাধারণ মানুষের ত্যাগের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি জনগণের কাছে সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংসদ হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিজয়ী দলকে এই যাত্রায় নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে, যা জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে যা সহজ ছিল না।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ

অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা যুদ্ধ ও পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদ, আহত এবং নির্যাতিতদের ত্যাগ স্মরণ করেন। তিনি বিশেষভাবে ছাত্র-জনতা, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন, যারা অত্যাচার, নিপীড়ন এবং মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন।

তিনি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার অবদান ও সংগ্রাম স্মরণ করেন এবং বলেন, তিনি কখনো স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপস করেননি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও প্রথমবার বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য ও সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন এবং সংসদে দল-মত নির্বিশেষে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবেন। তার লক্ষ্য স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়া।

ত্রয়োদশ সংসদের এই অধিবেশন ইতিহাসে অনন্য। দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী ও তাবেদারি শাসনের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রবীণ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সভাপতির প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ইতিহাসে নজিরবিহীন হলেও প্রথম সংসদের প্রেক্ষাপটের মতো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

সংসদীয় গণতন্ত্র: নীতি ও বাস্তবতা

সংসদীয় গণতন্ত্র আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে ব্যাপকভাবে গৃহীত রাজনৈতিক ব্যবস্থা। যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত এই ব্যবস্থা ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে অসংখ্য উপনিবেশ-পরবর্তী রাষ্ট্রে গৃহীত হয়েছে। তত্ত্বগতভাবে এটি জবাবদিহিতা, সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ভোটারদের প্রতি প্রতিক্রিয়াশীলতা নিশ্চিত করার জন্য ডিজাইন করা হলেও বাস্তবায়নে অনেক ক্ষেত্রে এর প্রভাব সীমিত।

দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখায়, কেবল সংবিধান বা কাঠামো থাকলেই গণতন্ত্রের জবাবদিহিতা বজায় থাকে না। নির্বাহী আধিপত্য, দুর্বল বিরোধী দল এবং রাজনৈতিকীকৃত প্রতিষ্ঠান সংসদীয় তদারকিকে কার্যকরভাবে সীমিত করে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় ঐক্যের নামে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্বার্থবিরোধী চক্রকে পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পর্যায়ে নিয়ে আসে। কথিত বিরোধী দল রাষ্ট্রের স্বাধীনতার অবমাননা এবং যুদ্ধাপরাধীদের নামে পার্লামেন্টে শোক প্রস্তাব আনার মতো কর্মকাণ্ড করেছে। যা ক্ষমার অযোগ্য।

বাংলাদেশ এই দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যা দেখায় কীভাবে সংসদীয় কাঠামো জবাবদিহিতার ক্রমাগত সংকটের সাথে সহাবস্থান করতে পারে।

সংসদীয় জবাবদিহিতা আদর্শিক ভিত্তি

সংসদীয় গণতন্ত্রের বৈধতা কয়েকটি মূল নীতির উপর নির্ভর করে:

নির্বাহী শাখা সংসদের কাছে জবাবদিহি করে। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা সংসদের আস্থা বজায় রাখতে হবে এবং অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে অপসারণযোগ্য হতে হবে।

সংসদ গণতান্ত্রিক আলোচনার কেন্দ্র। বিতর্ক, কমিটির তদারকি এবং আইনসভার যাচাই-বাছাই সরকারের নীতিমালা প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তদারকি নিশ্চিত করে।

শক্তিশালী বিরোধী দল অপরিহার্য। বিরোধী দল নীতিমালা যাচাই, মন্ত্রীদের প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা রাখে।

স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর নির্ভরতা। আদালত, নির্বাচন কর্তৃপক্ষ, দুর্নীতি দমন সংস্থা এবং গণমাধ্যম রাজনৈতিক প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে।

যাইহোক, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এই আদর্শ নীতি গুলো কার্যকর ভাবে প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করে।

দক্ষিণ এশিয়ার সংসদীয় কাঠামো চ্যালেঞ্জ

কার্যনির্বাহী আধিপত্য

একক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হলে নির্বাহী কার্যকরভাবে সংসদে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। এতে সংসদ স্বাধীন তদারকি ফোরাম নয়, সরকারের নীতি অনুমোদনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

দুর্বল বিরোধী প্রতিষ্ঠান

বিরোধী দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকলে আইন প্রণয়নের তদারকি দুর্বল হয়। বয়কট বা সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা সংসদীয় বিতর্কের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনীতিকরণ

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও জনপ্রশাসন রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হলে জনগণের আস্থা হ্রাস পায়। গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা বজায় রাখতে প্রতিষ্ঠান গুলির স্বায়ত্তশাসন অপরিহার্য।

নির্বাচনী বৈধতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ

প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন রাজনৈতিক বিভাজন বাড়াতে পারে। বাংলাদেশে নির্বাচনী বিরোধ এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শাসন ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা কে প্রভাবিত করেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক পরিণতি

কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো ফলে উদ্ভূত প্রভাব:

সংসদীয় তদারকি দুর্বল

নির্বাহী শাখার সিদ্ধান্ত ক্ষমতার ঘনত্ব

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের উপর জনসাধারণের আস্থা হ্রাস

বহির্ভূত সংসদীয় রাজনৈতিক সংহতির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি

সময়ের সঙ্গে, এই পরিস্থিতি স্বল্পমেয়াদী ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণের চেয়ে অগ্রাধিকার দেয়।

বাংলাদেশের প্রবাসী অভিজ্ঞতা: একটি পর্যবেক্ষণ

স্মৃতিপটে ভেসে উঠে আমার প্রবাস জীবনের কয়েকটি অধ্যায়। স্পেনে ইউনিভার্সিটি অব ভিগো’র রিসার্চ ফ্যাকাল্টি মেম্বার হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মানবাধিকার ও সাংবাদিকতা নিয়ে কাজ করছিলাম। ২০০০ সালের ১১ জুন, দিওরিওডে পন্টেভেদ্রা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রচ্ছদ প্রতিবেদন, যার শিরোনাম ছিল:

"আমি আমার গর্ব হারিয়ে ফেলেছি" -স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনাকে জীবনের পলে পলে লালন করে, সে দেশের অধঃপতন মানিয়ে নেওয়া কষ্টকর।"

এই প্রতিবেদন দেখায় কীভাবে সংসদীয় কাঠামো জবাবদিহিতার ক্রমাগত সংকটের সাথে সহাবস্থান করতে পারে।

পাঠ ও নীতি-উপসংহার

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার নীতি ও বাস্তব শাসনে রূপান্তরিত করা একটি ধারাবাহিক চ্যালেঞ্জ। কার্যকর বিরোধী দল, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শ বজায় রাখা কঠিন।

ত্রয়োদশ সংসদ কেবল ইতিহাসের স্মরণ নয়; এটি দেশের ভবিষ্যত গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। রাষ্ট্র ও সমাজ কে শক্তিশালী করার জন্য রাজনৈতিক, নৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এই সংসদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূলত জবাবদিহিতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিতকরণ প্রতিষ্ঠানগুলির শক্তির উপর নির্ভরশীল। রাজনৈতিক মেরুকরণ, নির্বাহী আধিপত্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা একত্রিত হলে সংসদীয় কাঠামো স্থায়ী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতি প্রতি টেকসই প্রতিশ্রুতি অপরিহার্য। কেবলমাত্র এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র তার মূল প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারে—জনগণের সেবা করে তাদের প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

লেখক : স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মুক্তিযোদ্ধা, সভাপতি, বাংলাদেশ নর্থ আমেরিকান জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক, এডমন্টন, আলবার্টা, কানাডা।

পাঠকের মতামত:

১৩ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test