E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

টিকা থেকে ট্র্যাজেডি: সাফল্যের গল্প যখন ইউনূস জমানার ব্যর্থতার দায়ে ম্লান

২০২৬ মার্চ ৩১ ১৭:৪১:৩৪
টিকা থেকে ট্র্যাজেডি: সাফল্যের গল্প যখন ইউনূস জমানার ব্যর্থতার দায়ে ম্লান

মানিক লাল ঘোষ


বাংলাদেশ একসময় বিশ্বের কাছে টিকাদান কর্মসূচির এক রোল মডেল ছিল। গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (GAVI)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের এই সাফল্যকে স্বীকৃতি দিয়ে ২০১৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে "ভ্যাকসিন হিরো" পুরস্কারে ভূষিত করেছিল। সেই অর্জন ছিল সরকারের দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য বিনিয়োগ ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস পরিশ্রমের ফসল। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগ পর্যন্ত দেশের টিকাদান কর্মসূচি (EPI) ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং চেইন অফ কমান্ড ছিল অটুট। তখন টিকার কোনো কৃত্রিম সংকট ছিল না এবং কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনায় ছিল না কোনো শিথিলতা। কিন্তু সেই সাফল্যের চূড়া থেকে আজ আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি?

রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খবর আমাদের শিউরে দিচ্ছে। চলতি মার্চ মাসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কেবল হাম ও সংশ্লিষ্ট জটিলতায় শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ৪০ ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন বাড়ছে লাশের মিছিল। বিশেষ করে ‘হাম’ শব্দটি আজ দেশের মা-বাবার কাছে এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গত এক মাসে ১৯ শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের পুরো স্বাস্থ্যখাতের দেউলিয়াপনার এক বীভৎস দলিল। ৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশজুড়ে এই ‘হাম ট্র্যাজেডি’ জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ৪১ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এই বিশাল বাজেট থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে টিকার চরম সংকট কেন তৈরি হলো? সম্প্রতি বিএনপি সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন এক অনুষ্ঠানে বলেন যে, "বিগত আট বছর দেশে হামের কোন টিকাই দেওয়া হয়নি।

তবে তাঁর এই বক্তব্যের সাথে তীব্র দ্বিমত পোষণ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৫ আগস্টের আগে যেখানে টিকাদান কর্মসূচি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলেছে এবং মাঠপর্যায়ে ভ্যাকসিনের কোনো সংকট ছিল না, সেখানে বর্তমান প্রশাসনের অধীনে এসে সরবরাহ ব্যবস্থা কেন মুখ থুবড়ে পড়ল? মূলত বিগত সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টার অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত এবং অযোগ্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর কারণেই আজ শিশুদের জীবন ঝুঁকির মুখে। গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরজাহান বেগমকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টিও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনায় তাঁর অভিজ্ঞতা থাকলেও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক ভ্যাকসিন ডিপ্লোমেসি সম্পর্কে তাঁর বিন্দুমাত্র পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, যার চরম মূল্য দিচ্ছে দেশের শিশুরা।

বিশাল অংকের বাজেট থাকা সত্ত্বেও কেন জীবন রক্ষাকারী টিকা আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেল? অভিযোগ উঠেছে যে, সংস্কারের নামে স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ড. ইউনূসের অনুগত ব্যক্তিদের বসিয়ে এক ধরনের লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকে ভ্যাকসিনের সাপ্লাই চেইন যেভাবে ভেঙে পড়েছে, তা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের চরম দুর্নীতি ও অপরাধমূলক উদাসীনতারই প্রমাণ। যখন শিশুদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়, তখন বরাদ্দকৃত কোটি কোটি টাকা কোথায় ব্যয় হয়েছে? কার পকেটে ঢুকেছে সেই প্রশ্ন আজ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

শিশুমৃত্যুর এই ক্রমবর্ধমান মিছিল দেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন উত্তাল। ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দাবি উঠেছে যে, এই "গণ-শিশুমৃত্যু"র দায় প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকেই নিতে হবে। শিশুদের জীবন রক্ষাকারী টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারাকে "পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড" হিসেবে অভিহিত করে নেটিজেনরা তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছেন।

স্বাস্থ্যখাতের এই বিপর্যয় আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়: উন্নয়ন শুধু পুরস্কার জেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সেই অর্জনকে ধরে রাখার সক্ষমতার মধ্যেই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়। ৫ আগস্টের আগে যে দেশ টিকাদানে বিশ্বকে পথ দেখিয়েছে, আজ সেই দেশেই ‘হাম আতঙ্ক’ শিরোনাম হচ্ছে—এটা কেবল দুঃখজনক নয়, চরম লজ্জাজনক। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে একজন অনভিজ্ঞ ব্যক্তিকে বসিয়ে জনগণের জীবন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ফল আজ দৃশ্যমান। জবাবদিহিতা এবং বাস্তবভিত্তিক নীতি ছাড়া এই পতন ঠেকানো সম্ভব নয়। অন্যথায় “ভ্যাকসিন হিরো” থেকে “হাম ট্র্যাজেডি”—এই পতনের দায় এই দেশের নিরীহ শিশুদের রক্তেই লেখা থাকবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

পাঠকের মতামত:

৩১ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test