E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

চিকিৎসা সেবার বাণিজ্যিকীকরণ ও বিপন্ন মানবতার আর্তনাদ

২০২৬ এপ্রিল ০২ ১৯:২১:০৫
চিকিৎসা সেবার বাণিজ্যিকীকরণ ও বিপন্ন মানবতার আর্তনাদ

ওয়াজেদুর রহমান কনক


চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুমহান ব্রত যখন পুঁজিবাদের করাল গ্রাসে পতিত হয়, তখন ‘মমতা ক্লিনিক’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল নামের বিদ্রূপাত্মক সার্থকতা বহন করে। নীলফামারীর ডোমারে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিরাজমান গভীর কাঠামোগত সংকট, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আইনি নিরাপত্তাহীনতা এবং চিকিৎসা নৈতিকতার (Bioethics) চরম অবক্ষয়কে নির্দেশ করে। একাডেমিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল একটি সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং এটি দরিদ্র মানুষের ‘জীবন ও শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ’ বা বায়োপলিটিক্স-এর এক বীভৎস রূপ।

বিংশ শতাব্দীতে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো ‘বায়োপাওয়ার’ ধারণায় দেখিয়েছিলেন কীভাবে মানুষের শরীর রাষ্ট্রের বা ক্ষমতার ব্যবচ্ছেদ ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে পরিণত হয়। ডোমারের এই ক্লিনিকে আমরা তার এক চরম বিকৃতি লক্ষ্য করি। একজন সদ্যজাত শিশুকে যখন তার বাবা-মায়ের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে পণ্য হিসেবে বিক্রির জন্য ক্রেতা ডেকে আনা হয়, তখন সেই শিশুটি আর একটি মানব সত্তা থাকে না, বরং সেটি একটি ‘দ্রব্য’ বা ‘কমিডিটি’তে রূপান্তরিত হয়। একে সমাজতাত্ত্বিক ভাষায় বলা হয় ‘পণ্যমুখী অবমানবিকরণ’ (Commodity Fetishism in Healthcare), যেখানে মানুষের জীবন অপেক্ষা আর্থিক মুনাফা অধিক গুরুত্ব পায়।

মেডিক্যাল এথিকস বা চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রের অন্যতম চারটি মূল স্তম্ভ হলো— রোগীর স্বায়ত্তশাসন (Autonomy), উপকারিতা (Beneficence), অপকার না করা (Non-maleficence) এবং ন্যায়বিচার (Justice)। মমতা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ এখানে প্রতিটি স্তম্ভকেই ধূলিসাৎ করেছে। রোগীকে আটকে রাখা এবং ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং এটি আন্তর্জাতিক দণ্ডবিধির দৃষ্টিতে এক প্রকার জিম্মি দশা বা ‘Unlawful Confinement’। একজন চিকিৎসকের উপস্থিতিতে বা প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় নবজাতক বিক্রির নিলাম ডাকা কেবল পেশাগত অসদাচরণ নয়, বরং এটি সরাসরি মানব পাচারের (Human Trafficking) অপরাধমূলক চেষ্টার পর্যায়ভুক্ত।

বাংলাদেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য আইন এবং ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিস (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স’ অনুযায়ী, কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক বকেয়া বিলের দায়ে রোগীকে আটকে রাখার অধিকার রাখে না। উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও প্রান্তিক এলাকায় এই ধরণের ঘটনা ঘটা প্রশাসনের নজরদারির শিথিলতা এবং তৃণমূল পর্যায়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটায়। উপজেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক ১.৫০ লক্ষ টাকা জরিমানা এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পদক্ষেপটি প্রশংসনীয় হলেও, এই ধরণের ‘প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের’ জন্য কেবল আর্থিক জরিমানা যথেষ্ট নয়। এটি লাইসেন্স বাতিল এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু করার মতো অপরাধ।

পরিশেষে বলা যায়, এই ঘটনাটি আমাদের স্বাস্থ্য খাতের একটি পদ্ধতিগত ব্যর্থতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা ও সেবার অভাবে দরিদ্র মানুষকে যখন বেসরকারি ক্লিনিকের দ্বারস্থ হতে হয়, তখন তারা এক ধরণের ‘স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স’ বা কাঠামোগত সহিংসতার শিকার হয়। চিকিৎসা সেবার এই বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করতে হলে কেবল আইনের প্রয়োগ নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সর্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বিকল্প নেই। অন্যথায়, ‘মমতা’র নামে এমন পৈশাচিকতা সমাজকে এক অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত করবে।

চিকিৎসা সেবার নৈতিকতা ও মানবিকতার চরম অবক্ষয়ের এক দালিলিক আখ্যান হিসেবে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার ‘মমতা ক্লিনিক’-এর ঘটনাটি জনস্মৃতিতে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে যখন সুশাসনের দাবি উচ্চারিত হচ্ছে, ঠিক তখনই ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এই সংবাদটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এক কুৎসিত বাণিজ্যিক রূপকে উন্মোচিত করে। ঘটনাটি কেবল একটি প্রশাসনিক অভিযানের বিবরণ নয়, বরং এটি প্রান্তিক মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এক পৈশাচিক মানসিকতার প্রতিফলন।

ঘটনার সূত্রপাত হয় দক্ষিণ গোমনাতি এলাকার এক দরিদ্র কৃষক দম্পতি, রাকিবুল হাসান ও হাবিবা সুলতানার মাতৃত্বের আনন্দকে কেন্দ্র করে। গত শুক্রবার মমতা ক্লিনিকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি নতুন প্রাণের জন্ম হলেও, সেই আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয় যখন ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ২২ হাজার টাকার একটি বিলের বোঝা তাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। বিল পরিশোধে বিলম্ব হওয়ার অপরাধে যে অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। প্রসূতিকে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া এবং নবজাতকসহ স্বজনদের একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না।

সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, হাসপাতালের নাম ‘মমতা’ হলেও সেখানে মমতার লেশমাত্র ছিল না। বকেয়া টাকা আদায়ের বিকল্প হিসেবে নবজাতককে বিক্রির প্রস্তাব ও ক্রেতা হাজির করার যে অভিযোগ উঠেছে, তা আধুনিক দাসপ্রথার এক আধুনিক সংস্করণ। এক লক্ষ টাকায় একটি শিশুর জীবন সওদা করার এই প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে, কিছু কিছু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের কাছে মানবজীবন কেবলই সংখ্যার খেলা।

অবশেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শায়লা সাঈদ তন্বী এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযান এই অন্ধকার পর্দার আড়ালের সত্যকে জনসমক্ষে নিয়ে আসে। প্রশাসনের তদন্তে নবজাতক বিক্রির চাপের প্রাথমিক সত্যতা এবং ক্লিনিকের চরম অব্যবস্থাপনা ধরা পড়লে ভ্রাম্যমাণ আদালত দেড় লক্ষ টাকা জরিমানা ধার্য করে। তবে এই জরিমানা কেবল একটি তাৎক্ষণিক প্রতিকার মাত্র; যে গভীর ক্ষত এই দরিদ্র দম্পতির মনে তৈরি হয়েছে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের যে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরাময়যোগ্য নয়। এই ঘটনার প্রেক্ষাপট আমাদের বাধ্য করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের দর্শন ও প্রয়োগের মধ্যকার বিশাল ব্যবধানকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

০২ এপ্রিল ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test