E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

মাদক নির্মূলে প্রয়োজন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও খেলাধুলা বৃদ্ধি

২০২৬ এপ্রিল ১১ ১৮:২৭:৪৭
মাদক নির্মূলে প্রয়োজন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও খেলাধুলা বৃদ্ধি

নীলকন্ঠ আইচ মজুমদার


মাদক শব্দটি বিস্তৃত হচ্ছে শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। দিনদিন এর ভয়াবহতা এমনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এর সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে প্রতিনিয়িত। এ থেকে মুক্তির জন্য বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও তা কার্যকরি হচ্ছে না বরং এর ব্যাপকতা বাড়ছে দিনদিন। ভয়াবহতা সম্পর্কে সবাই জানি কিন্তু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। সবই হচ্ছে আবার কিছুই হচ্ছে না। বিশেষ করে যুব সমাজ নিমজ্জিত হচ্ছে অন্ধকারের দিকে। ভেঙ্গে যাচ্ছে দেশের চালিকা শক্তি যুব সমাজের মেরুদন্ড। যার প্রেক্ষিতে সমাজ ব্যবস্থায় চরম বিশৃংখলা। কুফলের দিক জেনেও এক অদৃশ্য শক্তি বশ করছে এ সমাজকে।

প্রতিনিয়তই সুস্থ্য জীবন থেকে সরে যাচ্ছে বহু তরুণ, কিশোর-কিশোরীসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। দেশে কি পরিমাণ মাদকাসক্ত মানুষ রয়েছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। অভিযোগ রয়েছে যে সব কারাগারে মাদকাসক্তদের সাজা দিয়ে রাখা হয় সেখানেও মাদকের বিস্তার চরমে। মাদকের সর্বশেষ যে নামটি সবার মুখে মুখে সেটা হলো ইয়াবা। এটা এত পরিচিত হয়েছে যে অন্যান্য পণ্যের মতোই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিকট পরিচিতি পাচ্ছে। মাদকের প্রভাব বাড়ার কারণে সমাজ এবং পরিবার দিন দিন হয়ে পড়ছে উদ্বিগ্ন। সুস্থ এবং সুশৃংখল সমাজ নির্মাণ করতে হলে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে যুব সমাজকে। এখন দেখা যাক মাদকটা আসলে কি ? যে সব প্রাকৃতিক বা রাসায়নিক দ্রব্য সেবন বা গ্রহণ করার ফলে মানুষের অনুভূতি অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে এবং মানসিকতার পরিবর্তন ঘটে তাকেই মূলত আমরা মাদক বলি। হঠাৎ করে মানুষ এ নেশায় আসক্ত হয় না। ধীরে ধীরে মানুষ এসব মাদকের জালে আবদ্ধ হচ্ছে।

মাদক এমন একটি নেশা যাতে একবার প্রবেশ করলে পরিত্যাগ করা খুবই কঠিন। মাদক কিভাবে মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে চলে তা সে নিজে জানে না, এমন কি সে নিজে বুঝতে পারে না এবং অপরকে বুঝতে দেয় না। এটা থেকে বের হতে হলে রাতারাতি কোন পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভব নয়। মাদক ব্যবহার হঠাৎ করে বন্ধ করলে শরীরের উপর উক্ত মাদক প্রত্যাহার জনিত মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মাদক গ্রহণের সাথে সাথে মানুষ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। পরে শুরু হয় পারিবারিক বিচ্ছেদ। প্রাথমিক অবস্থায় বন্ধু বান্ধবের মাধ্যমে সাধারণত এ যাত্রা শুরু হয়ে থাকে। যার প্রাথমিক সূত্রপাত হতে পারে সিগারেটের মাধ্যমে। এক সময় এসব মাদক কেবলমাত্র যুবকরাই গ্রহণ করতে দেখা যেত। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় যুবতীরাও সমান তালে এগিয়ে চলছে। কিছু দিন পূর্বেও শহরে এসবের ব্যবসা থাকলে বর্তমানে গ্রামেগঞ্জে এর বিস্তৃতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হওয়ার কারনে মাদক অতি সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে গ্রামে। পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় চর্চ্চার অভাবের কারণে মাদকের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে অবহিত হতে পারছি না।

এছাড়াও কমেছে মানুষের পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক দায়িত্বহীনতা। সবচেয়ে বড় কথা হলো মানুষ এখন এতই ডিভাইস নির্ভর হচ্ছে যে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড এবং মাঠের খেলাধুলা থেকে একেবারেই সরে যাচ্ছে। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের জায়গা থাকলেও ডিভাইসের মাধ্যমে সে স্থান পুরণ করা চেষ্টা চালাচ্ছে। যার ফলে মানুষে মানুষে যে যোগাযোগটা স্থাপিত হতো তা আজ নির্বাসনে গেছে। অন্যদিকে মাঠ থাকলেও খেলার লোক নেই। মাঠের চারিপাশে বসছে মোবাইল আড্ডা। যে আড্ডার মাধ্যমে বিভিন্ন নষ্ট সাইটে ঢুকে পড়ছে একেবারেই সাধারণ মানুষরাও। অন্যদিকে যারা ঘরে রয়েছে তারাও মোবাইলে আসক্ত হচ্ছে কঠিনভাবে যে কারনে বাইরে তাকানোর সুযোগ পাচ্ছে না। আমরা যদি মাদকের প্রকার গুলি একটু দেখি তাহলে এর ব্যবহার সম্পর্কে একটু অবহিত হতে পারব।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে এ পর্যন্ত ২৪ ধরনের মাদক দেশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফাইড স্পিরিট, ডিনেচার্ড স্পিরিট, তাড়ি, প্যাথেডিন, বুপ্রেনরফিন, ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মান্টেড ওয়াশ, বুপ্রেনরফিন ( বনোজেসিক ইঞ্জেকশন), মরফিন, আইচ পিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টুলইন, পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন। এর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে ইয়াবা। দেশের যত্রতত্র মিলছে এ মরন নেশা। এই মাদকের সাথে সমাজ ব্যবস্থায় যে পঁচন ধরছে তা থেকে প্রভাব পড়ছে সমাজের সকল জায়গায়। তিলে তিলে নষ্ট হচ্ছে ব্যক্তি পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্র। আবার অনেক সময় মাদকাসক্তদের নিয়ে পারিবারিক বা সামাজিকভাবে লুকোচুরি কারণে একদিকে যেমন আসক্তদের চিকিৎসা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে, তেমনি মাদকাসক্তি ঠেকাতেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও মিলছে না সুফল। বিভিন্ন বাহিনীর অভিযানে প্রায় সময়ই ধরা পড়ছে ছোট বড় অনেক চালান। সাথে ধরা পড়ছে মাদকসেবি ও ছোট ছোট চালানকারীরা। বড় কারবারিরা রয়ে যাচ্ছে চোখের অন্তরালে আইনের বাইরে। কয়েক দিন পরেই আইনের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে আসছে জেল থেকে এসব অপরাধীরা। আবারও পুরানো কর্মে লিপ্ত হচ্ছে। তবে মাদক নিয়ে পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সচেতনতা তৈরিতে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। যেটুকু সচেতনতার কথা বলা হচ্ছে তাও বাস্তবে নেই। মূল কথা হচ্ছে সচেতনতা তৈরির যে প্লাটফর্ম প্রয়োজন সেখানে আমরা যেতে পারছি না। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় এতটা চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে যে যেখানে নির্বাসিত হচ্ছে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকে পরিত্রাণের শিক্ষা।

সর্বশেষ কথা হলো এ অবস্থা থেকে ফিরে সুন্দর একটি রাষ্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন মাদক দ্রব্যের অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধের মাধ্যমে সহজলভ্যতা রোধ করা, মাদকের শারীরিক কুফল সম্পর্কে ধারণা দেওয়া, মাদক ব্যবসায়ের সাথে জড়িতদের আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে গ্রেফতার ও দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা, বেকারদের কর্মসংস্থান, প্রতিটি ধর্মের মূল্যবোধ সম্পর্কে অবহিত ও এর বিধি নিষেধ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি এর কুফল সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হারানো সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় শক্তিশালী করা এবং যুব সমাজকে মাঠে মনোযোগী করা। মাঠে মনোযোগী হলে বর্তমান প্রজন্ম নিজেকে ব্যস্ত রাখতে সক্ষম হবে খেলাধুলায় এবং মোবাইল আসক্তি থেকে অনেকটাই দূরে যেতে সক্ষম হবে।

লেখক : শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

১১ এপ্রিল ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test