E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টির গল্প

২০২৬ এপ্রিল ১৮ ১৭:৩০:৩৮
দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টির গল্প

মহিদুল ইসলাম মাহী


মানুষ হিসেবে আমরা স্বভাবগতভাবেই বড্ড ‘জাজমেন্টাল’। অন্য দেশের কথা জানি না, তবে আমাদের দেশে কাউকে না চিনেই তার সম্পর্কে চট করে একটা ধারণা পোষণ করা বা কাউকে বিচার করে ফেলাটা যেন এক অলিখিত নিয়ম। বিশেষ করে আমরা যা চোখে দেখি, সেটাকেই ধ্রুব সত্য বলে ধরে নিই।

আমি চশমা পরি। কিন্তু চশমাপরা মানুষের ভেতরের গল্পটা যে কী, তা কেবল একজন ভুক্তভোগীই জানেন। রাস্তায় বের হলে আমাকে দেখে একেকজন একেক রকম ধারণা করেন। কেউ ভাবেন—ছেলেটা নিশ্চয়ই খুব মেধাবী, দিনরাত বইয়ে মুখ গুঁজে থাকে বলে চোখে চশমা উঠেছে। আবার কেউ হয়তো করুণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবেন—ছেলেটা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, তাই অল্প বয়সেই চোখের এই দশা! অনেকে আবার চশমাপরা লুকে ‘কিউটনেস’ খোঁজেন। অথচ এই কাঁচের আড়ালের বিজ্ঞানটা যে কতটা কষ্টের, তা কেউ দেখে না।

যাদের চশমার পাওয়ার ‘মাইনাস’, তারা কাছের জিনিস ঠিকঠাক দেখলেও দূরের পৃথিবীটা তাদের কাছে এক কুয়াশাচ্ছন্ন রহস্য। আবার যাদের ‘প্লাস’, তারা দূরের সব স্পষ্ট দেখলেও কাছের অক্ষরগুলো তাদের কাছে ঝাপসা হয়ে আসে। এই মাইনাস-প্লাসের হিসেবে যে জীবন কতটা সীমাবদ্ধ, তা কেবল আমরাই বুঝি। এ জীবনে কত চশমা যে হারিয়েছে, অসাবধানতায় ভেঙে টুকরো হয়েছে কিংবা কোনো জলাশয়ে অজানাতে ডুবে গেছে—তার হিসেব মেলা ভার। সেই মুহূর্তে আমাদের যে কতটা অসহায় লাগে, তা কেবল একজন চশমা ব্যবহারকারীই অনুভব করতে পারেন।

তবে জীবনের এই চশমা হারানো বা ঝাপসা দৃষ্টি আমাকে এক গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আমরা বাইরের পৃথিবীটা স্পষ্ট দেখার জন্য দামী চশমা খুঁজি, কিন্তু ভেতরের জগতটা দেখার জন্য কোনো ব্যাকুলতা দেখাই না। স্রষ্টাকে নিয়ে আমাদের ধারণাটাও অনেকটা এই জাজমেন্টাল মানুষের মতোই ভাসা-ভাসা।

অনেকেই বলে স্রষ্টা আছেন, আর সেই বিশ্বাসেই তারা একধরণের প্রশান্তি খুঁজে পায়। কিন্তু কেবল অস্তিত্ব মেনে নেওয়া আর তাঁকে অনুভব করা—এক কথা নয়। কেউ কেউ হয়তো আমাকে বলে, "তুমি কখনো আল্লাহকে খোঁজ করোনি তাই তাঁর দেখা পাওনি। আল্লাহ আছে এতেই তুমি তুষ্ট।" কিন্তু আমার উপলব্ধি বলে—যিনি স্রষ্টাকে হন্যে হয়ে খুঁজেছেন, তিনিই তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন।

তুমি হয়তো তাঁর অস্তিত্বের খবরেই তুষ্ট ছিলে, তাই কখনো তাঁকে পাওয়ার ব্যাকুলতা তোমার হৃদয়ে জাগেনি। অথচ আমি? আমি তাঁকে খুঁজেছি আমার প্রতিটা দীর্ঘশ্বাসে, আমার প্রতিটি একাকীত্বে, আমার চোখের এই ঝাপসা দৃষ্টির আড়ালে থাকা পরম সত্যের মধ্যে। চশমা যেমন আমার বাইরের জগতকে স্পষ্ট করে, তেমনি সেই তীব্র অনুসন্ধান আমার অন্তরের সব পর্দা সরিয়ে তাঁর নূরকে চিনিয়ে দিয়েছে।

মানুষ চশমা পরে বাইরের জগত স্পষ্ট দেখতে, কিন্তু ভেতরের জগত দেখতে কোনো পাওয়ারযুক্ত কাঁচের প্রয়োজন হয় না; সেখানে প্রয়োজন হয় কেবল গভীর সন্ধান আর তীব্র ব্যাকুলতা। চশমা হারিয়ে গেলে আমরা যেমন অসহায় হয়ে পড়ি, স্রষ্টার সান্নিধ্য ছাড়া আত্মাটাও ঠিক তেমন দিশেহারা থাকে। যারা শুধু বিশ্বাস করে বসে থাকে, তারা হয়তো শান্তি পায়; কিন্তু যারা তাঁকে খুঁজে ফেরে, তারাই কেবল তাঁর পরম সান্নিধ্যের স্বাদ পায়।

লেখক: গীতিকার, সুরকার, গায়ক, লেখক ও কবি।

পাঠকের মতামত:

১৮ এপ্রিল ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test