E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

প্রসঙ্গ: সেলিব্রেটিরা বঞ্চিত হওয়া

২০২৬ এপ্রিল ২৫ ১৮:১৫:০৯
প্রসঙ্গ: সেলিব্রেটিরা বঞ্চিত হওয়া

আবদুল হামিদ মাহবুব


সংরক্ষিত নারী আসন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। বিশেষ করে বড় দলগুলো যখন এই আসনে প্রার্থী বাছাই করে, তখন সেখানে রাজনৈতিক কর্মী, পেশাজীবী, সমাজকর্মী এবং কখনও কখনও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখদেরও আগ্রহ দেখা যায়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন নিয়ে এমন একটি চিত্রই দেখা গেছে, যেখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিচিত—বিশেষ করে মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কিছু “সেলিব্রেটি” ধরণের ব্যক্তিত্ব মনোনয়ন প্রত্যাশা করেছিলেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্তে তাদের অনেকেই মনোনয়ন পাননি।

এই প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রথমেই বোঝা দরকার, সংরক্ষিত নারী আসন কীভাবে কাজ করে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত আসনের পাশাপাশি নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সংরক্ষিত আসন রাখা হয়েছে, যা দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে বণ্টন করা হয়। ফলে এই আসনগুলোতে সরাসরি জনগণের ভোট হয় না; বরং দলীয় মনোনয়নই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে। তাই এখানে প্রার্থী নির্বাচন পুরোপুরি দলীয় কৌশল, অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য, ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর নির্ভর করে।

বিএনপির ক্ষেত্রে এইবার সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন নিয়ে দলটির ভেতরে একটি বড় ধরনের প্রত্যাশা ও প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে—আইন, সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে যুক্ত—অনেকেই মনোনয়নের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মন্তব্যে উঠে আসে। এর মধ্যে কিছু পরিচিত মুখ, যাদের মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক পরিসরে পরিচিতি রয়েছে, তাদেরকেও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনা করা হয়েছিল। তবে দলীয় সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় নেত্রীরাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছেন।

এই পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—সেলিব্রেটি বা পরিচিত মুখদের মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য কী ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে?

প্রথমত, ইতিবাচক দিক বিবেচনায় বলা যায়, বিএনপি তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভিত্তি ও সাংগঠনিক কাঠামোকে গুরুত্ব দিয়েছে। দলের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা সাধারণত প্রত্যাশা করেন যে, আন্দোলন-সংগ্রামে যারা দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন, তারাই যেন দলীয় সুবিধা পান। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সেলিব্রেটি বা নতুন আগ্রহী মুখদের চেয়ে অভিজ্ঞ নেত্রীদের মনোনয়ন দেওয়া দলীয় শৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হতে পারে। এতে দলের ভেতরে ক্ষোভ বা বঞ্চনার অনুভূতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকে দেখা যায়, সংরক্ষিত আসনের এমপিদের মূল ভূমিকা আইন প্রণয়নের পাশাপাশি দলীয় অবস্থানকে সংসদে তুলে ধরা। এখানে শুধুমাত্র জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়, রাজনৈতিক দক্ষতা, পার্লামেন্টারি অভিজ্ঞতা এবং দলীয় নীতির প্রতি আনুগত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে অনেক সময় দলগুলো পরিচিত মুখের পরিবর্তে “বিশ্বস্ত রাজনৈতিক কর্মী”দের অগ্রাধিকার দেয়।

তবে অন্যদিকে এই সিদ্ধান্তের কিছু সম্ভাব্য নেতিবাচক দিকও রয়েছে। সেলিব্রেটি বা পরিচিত মুখদের রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা অনেক সময় দলীয় ইমেজ সম্প্রসারণে সাহায্য করে। মিডিয়া কাভারেজ, জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং নতুন ভোটার শ্রেণির সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে তারা ভূমিকা রাখতে পারেন। বিএনপি যদি এই ধরনের কিছু পরিচিত মুখকে মনোনয়ন দিত, তবে তা দলটির জন্য একটি “ব্র্যান্ড ভ্যালু” তৈরির সুযোগ হতে পারত, বিশেষ করে তরুণ সমাজ ও নগরভিত্তিক ভোটারদের মধ্যে।

মনোনয়ন না পাওয়ার ফলে যেসব সেলিব্রেটি বা পরিচিত মুখ আগ্রহী ছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে একটি রাজনৈতিক হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একইসাথে এটি ভবিষ্যতে তাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মাত্রা কমাতেও পারে। তবে অন্যদিকে, এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতার একটি অংশও হতে পারে—যেখানে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা নয়, বরং দলীয় কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সম্পর্কই সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে।

বিএনপির জন্য সামগ্রিক লাভ-ক্ষতির হিসাব করলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র দেখা যায়। লাভের দিক হলো, দলটি তাদের সাংগঠনিক ভিত্তিকে শক্তিশালী রেখেছে এবং অভ্যন্তরীণ কর্মীদের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। এটি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আন্দোলনে তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। এছাড়া দলীয় সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় “বাইরের চাপ বা তারকানির্ভর রাজনীতি”র সমালোচনা থেকেও কিছুটা দূরে থাকা গেছে।

অন্যদিকে ক্ষতির দিক হলো, মিডিয়া ও জনমনে একটি ভিন্নধর্মী আগ্রহ তৈরি করার সুযোগ হারানো। বিশেষ করে এমন সময়ে যখন রাজনৈতিক দলগুলো জনসংযোগ ও ইমেজ বিল্ডিংকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন পরিচিত মুখদের অন্তর্ভুক্ত না করা কিছুটা “ক্লোজড সার্কেল পলিটিক্স” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। এটি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন প্রক্রিয়া একটি প্রথাগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন, যেখানে জনপ্রিয়তার চেয়ে সংগঠন, অভিজ্ঞতা এবং দলীয় আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।সেলিব্রেটি বা পরিচিত মুখদের বঞ্চিত হওয়া যেমন ব্যক্তিগত ও সামাজিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি এটি দলীয় রাজনীতির বাস্তবতাকেও তুলে ধরেছে।

শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য কতটা লাভজনক বা ক্ষতিকর হবে, তা নির্ভর করবে তারা ভবিষ্যতে এই মনোনীত নারীদের কতটা কার্যকরভাবে সংসদ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে পারে তার ওপর। রাজনীতিতে শুধু মনোনয়ন নয়, তার পরবর্তী পারফরম্যান্সই আসল মূল্যায়নের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।

পাঠকের মতামত:

২৫ এপ্রিল ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test