রবীন্দ্রদর্শনে প্রকৃতি ভাবনা ও বর্তমান পরিবেশ সংকট
ওয়াজেদুর রহমান কনক
২৫ বৈশাখ কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং এটি বাঙালির মননে এক মহাজীবনের আলোকপাত ঘটার দিন। ১৮৬১ সালের এই দিনে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম হয়েছিল, যিনি পরবর্তীকালে বাঙালির জাতীয় জীবনের প্রধানতম দিকনির্দেশক হয়ে ওঠেন। তাঁর বহুমুখী সাহিত্যিক প্রতিভার পরতে পরতে প্রকৃতির প্রতি যে গভীর অনুরাগ ও দার্শনিক উপলব্ধি মিশে আছে, তা বর্তমান বিশ্বের জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রদর্শনে প্রকৃতি কেবল মানুষের বিচরণভূমি নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত সত্তা এবং পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র। ২৫ বৈশাখের এই শুভক্ষণে কবির জন্মজয়ন্তী উদযাপনের পাশাপাশি তাঁর পরিবেশ ভাবনা ও প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন দর্শনের গুরুত্ব অনুধাবন করা আজ সময়ের দাবি।
রবীন্দ্রদর্শনে প্রকৃতি কেবল জড় বস্তু বা মানবজীবনের পটভূমি নয়, বরং তা এক জীবন্ত সত্তা এবং পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার ও জীবনদর্শনে পরিবেশ চেতনা এমন এক সুগভীর তাত্ত্বিক স্তরে বিন্যস্ত, যা বর্তমানের বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে গবেষণার দাবি রাখে। তাঁর দৃষ্টিতে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক ছিল পরিপূরক এবং ভারসাম্যপূর্ণ। এই সম্পর্কের বিচ্যুতিই যে আধুনিক সভ্যতার সংকটকে ঘনীভূত করবে, তা তিনি শতবর্ষ আগেই তাঁর ‘রক্তকরবী’, ‘মুক্তধারা’ কিংবা ‘ফাল্গুনী’ নাটকে এবং অসংখ্য প্রবন্ধে সতর্কবাণী হিসেবে উচ্চারণ করেছিলেন। তাঁর এই পরিবেশবাদী দর্শন আজকের দিনে ‘ইকোলজিক্যাল হিউম্যানিজম’ বা পরিবেশগত মানবতাবাদের এক অনন্য আকর।
রবীন্দ্রনাথের গানে এবং কবিতায় প্রকৃতির উপস্থিতি কেবল নান্দনিক নয়, তা দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক। ‘ছিন্নপত্র’ থেকে শুরু করে ‘শান্তিনিকেতন’ ভাষণমালায় তিনি বারবার বলেছেন যে, মানুষ প্রকৃতির সন্তান এবং এই সত্য বিস্মৃত হওয়া মানে নিজের বিনাশ ডেকে আনা। তাঁর গানে ঋতুচক্রের যে বর্ণনা আমরা পাই, তা মূলত প্রকৃতির এক শাশ্বত ছন্দের প্রতিধ্বনি। কিন্তু বর্তমান জলবায়ু সংকটের কারণে সেই ঋতুচক্র আজ বিপর্যস্ত। রবীন্দ্রনাথের গানে বর্ষার যে স্নিগ্ধতা বা শরতের যে নির্মলতা বর্ণিত হয়েছে, আজকের অনিশ্চিত বৃষ্টিপাত এবং তাপপ্রবাহের ডামাডোলে তা বিলুপ্তপ্রায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাঁর ‘বলাই’ গল্পের ছোট শিশুটির যে বৃক্ষপ্রেম, তা আধুনিক বনভূমি নিধন ও নগরায়নের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতীকী প্রতিবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ যখন লোভের বশবর্তী হয়ে প্রকৃতির বুক চিরে খনিজ সম্পদ আহরণ করে বা যান্ত্রিক সভ্যতার যূপকাষ্ঠে অরণ্যকে বলি দেয়, তখন সে মূলত নিজের ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলে।
রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ চেতনা কেবল তত্ত্বকথায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল প্রয়োগমুখী।শান্তিনিকেতনে তাঁর প্রবর্তিত ‘বৃক্ষরোপণ’ উৎসব এবং ‘হলকর্ষণ’ উৎসব আধুনিক বিশ্বের প্রথম সারির পরিবেশবাদী উদ্যোগগুলোর অন্যতম। তাঁর এই ‘ইকো-সোফি’ বা পরিবেশ-প্রজ্ঞা বর্তমান বিশ্বের কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ধ্রুবতারার মতো কাজ করতে পারে। তিনি শান্তিনিকেতনের ন্যাড়া প্রান্তরে বনস্পতির ছায়া এনেছিলেন, যা বর্তমানের মরুকরণ প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক উদাহরণ। আজকের জলবায়ু বিজ্ঞানীরা যখন ‘ন্যাচার-বেসড সল্যুশন’ বা প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে সংকটের সমাধানের কথা বলছেন, রবীন্দ্রনাথ তখন অনেক আগেই ‘পল্লী প্রকৃতি’ গ্রন্থে গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্যের কথা লিখে গিয়েছেন। তাঁর কাছে অরণ্য ছিল সভ্যতার জননী, তাই অরণ্য বিনাশ মানেই ছিল মাতৃভূমির অবমাননা।
বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির এই ভয়াবহ সময়ে রবীন্দ্রদর্শন আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে ‘সহমর্মিতা’ গড়ে তুলতে হয়। তাঁর মতে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত প্রকৃতির সেবা করা, জয় করা নয়। অথচ আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্ব প্রকৃতিকে কেবল ‘উপাদান’ হিসেবে গণ্য করেছে, যার ফলে আজ বাস্তুসংস্থানিক বিপর্যয় আমাদের দোরগোড়ায়। রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’ নাটকের সেই বাঁধ নির্মাণ এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহকে রুদ্ধ করার যে পরিণতি তিনি দেখিয়েছেন, তা আজকের বড় বড় নদী প্রকল্পের পরিবেশগত কুপ্রভাবের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তিনি মনে করতেন, মানুষের অতিরিক্ত ভোগবাদিতা এবং প্রকৃতির অসীম ভাণ্ডারের ওপর অন্যায্য দাবিই এই সংকটের মূলে। তাঁর ‘সবুজ আমি’ হয়ে ওঠার আহ্বান মূলত আজ আমাদের এই তপ্ত পৃথিবীকে শীতল করার একমাত্র উপায়।
রবীন্দ্রসাহিত্যের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা এই পরিবেশ ভাবনাকে যদি আমরা বর্তমানের পরিবেশগত সমাজবিজ্ঞানের (Environmental Sociology) আলোতে বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যায় তিনি একজন অগ্রগামী পরিবেশবাদী ছিলেন। তাঁর গানে যে মাটির সুর এবং আকাশের নীলিমার কথা রয়েছে, তা আমাদের শেখায় কীভাবে আমরা মাটির মায়ার সঙ্গে যুক্ত থেকে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখতে পারি। জলবায়ু সংকট মূলত একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংকট, যা রবীন্দ্রনাথের শিক্ষায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, ধরিত্রীর প্রতি আমাদের ঋণ অপরিশোধ্য। সংক্ষেপে বলতে গেলে, রবীন্দ্রদর্শন কেবল একটি সাহিত্যিক ধারা নয়, বরং তা বর্তমানের পরিবেশ বিপর্যয় থেকে মুক্তির এক পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা। তাঁর প্রকৃতি প্রেম এবং পরিবেশ সচেতনতা যদি আমরা আমাদের যাপনে ধারণ করতে পারি, তবেই হয়তো এই বিপন্ন ধরিত্রীকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব হবে। রবীন্দ্রনাথের এই কালজয়ী দর্শনই আজ পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে আমাদের অন্যতম প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনদর্শন আমাদের শেখায় যে, মানবসভ্যতা ও প্রকৃতির অস্তিত্ব একে অপরের পরিপূরক। ২৫ বৈশাখ কেবল কবির জন্মস্মরণ নয়, বরং তাঁর পরিবেশবাদী চেতনাকে বর্তমানের জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে নতুন করে অনুধাবন করার দিন। তাঁর 'ইকোলজিক্যাল হিউম্যানিজম' বা পরিবেশগত মানবতাবাদ আজ বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়নের পথে ধ্রুবতারা হতে পারে। প্রকৃতিকে জয় করা নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে সহমর্মিতার মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করাই ছিল তাঁর মূল শিক্ষা। তাই রবীন্দ্রদর্শন ধারণ করে পরিবেশ রক্ষা ও বৃক্ষশোভিত পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকারই হোক আমাদের আধুনিক সভ্যতার সংকট থেকে মুক্তির প্রধান পথ।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।
পাঠকের মতামত:
- সাতক্ষীরায় ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু
- দক্ষিণ আফ্রিকায় বাড়িতে ঢুকে বন্দুক হামলা, নিহত ১১
- বাসের পর এবার বাড়ল লঞ্চ ভাড়া
- প্রতিশ্রুতি রাখেনি বিএনপি সরকার, মানবাধিকার সুরক্ষা খর্ব করেছে ৩ আইন
- অপ্রতিম হত্যা মামলায় আসামিদের পক্ষে লড়বেন না কোনো আইনজীবী
- ‘ন্যারেটিভ তৈরি করে ষড়যন্ত্রের ছক কষছে রিয়াল’
- ২ কোটি বাজেটের সিনেমার আয় ৩৫৯ কোটি রুপি
- মূল্যস্ফীতি নিয়ে এডিবির অশনি সংকেত
- ১০ হাজার টন মসুর ডাল কিনছে সরকার
- ‘বিভাজন নয়, জনগণের ঐক্যই প্রয়োজন’
- বাসের ভাড়া পুনঃনির্ধারণ, প্রজ্ঞাপন জারি
- জাতিসংঘে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী
- মুক্তিবাহিনী মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়
- ফাউন্ডার্স ডে উদযাপন করতে যাচ্ছে এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড
- পাংশায় কৃষক নারী ও প্রতিবন্ধীদের সহায়তা, শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বিতরণ
- বাগেরহাটে আহাদ হত্যার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চরমপন্থি ক্যাডারসহ ৩ আসামি গ্রেপ্তার
- ক্রেডিট ইউনিয়নের কোটি টাকা নিয়ে কর্মচারী উধাও
- বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ঝালকাঠিতে বাংলা কিউআর নিয়ে মতবিনিময় সভা
- চাটমোহরে ভ্যান-ট্রলির মুখোমুখি সংঘর্ষ, ভ্যান চালক নিহত
- বিআরটিএ ও ডামের উদ্যোগে ৮৯৯ গণপরিবহন চালককে প্রশিক্ষণ
- গোবিপ্রবিতে আন্তঃবিভাগ ভলিবল টুর্নামেন্ট শুরু
- ধাওয়াপাড়া-নাজিরগঞ্জ নৌরুটে ১৬ দিন পর ফেরি চলাচল স্বাভাবিক
- পঞ্চগড় মাতৃসেবা ফার্মেসির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ
- গ্রাহকের মৃত্যুতে কিস্তি মওকুফসহ আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ওয়ালটন প্লাজা
- গোবিপ্রবিতে নবনিযুক্ত উপ-উপাচার্যের যোগদান
- তালতলীতে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার মামলা
- ভৈরব বাজার মেঘনার পাড়ে নদী ভাঙন
- বরগুনা প্রেসক্লাবে তালাবদ্ধ করে সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ
- বাঘের খাঁচায় মুক্তিযোদ্ধা!
- ফাল্গুন
- ‘বিভাজন নয়, জনগণের ঐক্যই প্রয়োজন’
- স্মরণ সভায় সম্মাননা পেলেন সাংবাদিক পরিবারের সদস্যরা
- প্রতিবন্ধী হাবিব বাঁচতে চায়!
- ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’র শুরুটা আশা জাগানিয়া
- গলাচিপায় অধিকাংশ আশ্রয়ণকেন্দ্রে এখন গরু-ছাগলের বসবাস
- ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কলাপাড়ায় ছাত্র জনতার লাঠি মিছিল
- ১০ হাজার টন মসুর ডাল কিনছে সরকার
- কলাপাড়ায় বৈষম্যবিরোধী অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে ছাত্র-শিক্ষক শান্তি সমাবেশ
- কলাপাড়ায় অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার, স্বামী আটক
- আফগানদের বিদায় করে ফাইনালে ইংল্যান্ড
- জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: ড. জাহেদুল হাসান
- সিরাজগঞ্জে সংঘবদ্ধ চোর চক্রের ৪ সদস্য আটক
- আমার বটবৃক্ষ
- ভিপি নুর পেলেন ট্রাক, হাসান মামুনের ঘোড়া
- মোড়লের ক্ষমতা আর নেই, বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
-1.gif)








