E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

নীলফামারীতে ২ হাজার ২৯২ কোটির মেগা হাসপাতাল প্রকল্প

২০২৬ মে ০৯ ১৭:২৭:০৩
নীলফামারীতে ২ হাজার ২৯২ কোটির মেগা হাসপাতাল প্রকল্প

ওয়াজেদুর রহমান কনক


তিস্তা ও ধরলা বিধৌত উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে নীলফামারীর দারোয়ানীর বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে এক অনন্য স্থাপত্য—‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল’। এটি কেবল একটি ভবন নয়, বরং উত্তরবঙ্গের আটটি জেলার কয়েক কোটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্য নিরাপত্তার এক অভয় অরণ্য। ২ হাজার ২৯২ কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পটি যখন বাস্তবায়িত হবে, তখন তা এশিয়ার এই অঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্রের, যেখানে ক্যানসার থেকে শুরু করে ওপেন হার্ট সার্জারির মতো উন্নত সেবা পাওয়া সম্ভব। সেই স্বপ্নের সফল রূপায়ন হিসেবে শনিবার (৯ মে) থেকে দারোয়ানী টেক্সটাইল এলাকায় প্রকল্পের প্রাথমিক কারিগরি সমীক্ষা শুরু করেছে চীনের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল।

প্রতিনিধি দলের নেতা ডং লি-এর নেতৃত্বে ৬ সদস্যের এই কারিগরি দল যখন ২৫ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে মাটির গুণাগুণ ও অবকাঠামোর লে-আউট চূড়ান্ত করছিলেন, তখন থেকেই শুরু হয়েছে উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য বিপ্লবের আনুষ্ঠানিক পথচলা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে চীন সরকার যে ২ হাজার ২১৯ কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে, তা দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন উচ্চতা নির্দেশ করে। এই প্রকল্পকে ঘিরে নীলফামারী জেলা এখন এক বিশাল স্বাস্থ্যনগরীতে রূপান্তরিত হওয়ার অপেক্ষায়। এর মাধ্যমে নীলফামারী জেলা কেবল নীল চাষের ইতিহাস নয়, বরং সর্বাধুনিক চিকিৎসাসেবার কেন্দ্র হিসেবে সারা দেশে পরিচিতি লাভ করবে।

হাসপাতালটির নকশায় আধুনিকতার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যশৈলীকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ১০ তলা বিশিষ্ট মূল হাসপাতাল ভবনটি হবে শতভাগ ডিজিটালাইজড, যেখানে রোগীর তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপত্র পর্যন্ত সব হবে অনলাইন নির্ভর। ১০০০ শয্যার বিশাল এই স্থাপনায় ৫০০টি বেড থাকবে বিশেষায়িত ইউনিটের জন্য, যা ঢাকার বড় বড় হাসপাতালের ওপর থেকে রোগীর চাপ কমাতে বিশাল ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে কিডনি ডায়ালাইসিস, হার্টে রিং পরানো বা নিউরো সার্জারির মতো জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসার জন্য এখানকার মানুষকে আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাজধানীমুখী হতে হবে না।

প্রতিনিধি দলের এই সফরের সময় উপস্থিত থাকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্পটি কেবল নীলফামারী নয়, বরং রংপুর বিভাগের আটটি জেলার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের জন্যও চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হবে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামানের ভাষায়, আইসিইউ, সিসিইউ ও এইচডিইউ সমৃদ্ধ এই আধুনিক হাসপাতালটি হবে উত্তরবঙ্গের ‘লাইফলাইন’। আজ যে সমীক্ষার কাজ শুরু হলো, তা এই অঞ্চলের মানুষের জন্য কেবল আধুনিক ভবন নয়, বরং উন্নত ও সুলভ চিকিৎসার এক নতুন আশার আলো বয়ে নিয়ে আসবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বিশাল প্রকল্পের হাত ধরে উত্তরবঙ্গের মানুষের গড় আয়ু ও জীবনযাত্রার মান এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।

প্রতিনিধি দলের নেতা ডং লি-এর নেতৃত্বে ৬ সদস্যের এই কারিগরি দল প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ২৫ একর জমির মাটি ও অন্যান্য কারিগরি দিক খতিয়ে দেখেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়নাধীন এই বিশাল কর্মযজ্ঞে চীন সরকার ২ হাজার ২১৯ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে প্রদান করছে, যা দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের এক অনন্য নজির। পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব ফাতেমা তুজ জোহরা জানান, এখানে একটি অত্যাধুনিক ১০ তলা হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হবে। একইসঙ্গে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ডরমেটরি, আবাসিক ভবন এবং ডিরেক্টরস বাংলোসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়ক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।

এই হাসপাতালের বিশেষত্ব হলো এর সুপরিকল্পিত শয্যা বিন্যাস। ১০০০ শয্যার মধ্যে ৫০০টি থাকবে সাধারণ রোগীদের জন্য এবং বাকি ৫০০টি বরাদ্দ থাকবে সম্পূর্ণ বিশেষায়িত সেবার জন্য। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান জানান, এখানে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, অনকোলজি ও নিউরোলজির মতো জটিল বিভাগের চিকিৎসা প্রদান করা হবে। এছাড়া আধুনিক জরুরি বিভাগ, আইসিইউ (ICU), সিসিইউ (CCU) ও এইচডিইউ (HDU) সুবিধার পাশাপাশি উন্নত ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও অপারেশন থিয়েটারের মাধ্যমে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

প্রতিনিধি দলের এই গুরুত্বপূর্ণ সফরকালে নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাইদুল ইসলাম এবং সিভিল সার্জন ডা. আব্দুর রাজ্জাকসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, এই হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে আর সামান্য উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী ঢাকার ওপর নির্ভর করতে হবে না। ফলে সময় ও অর্থের সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়ন ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে এটি এক মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হলে এই অঞ্চলের কোটি মানুষের জন্য হাসপাতালটি হবে এক নির্ভরতার প্রতীক।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

০৯ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test