টেলিযোগাযোগ আনবে সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন নতুন বিশ্ব
ওয়াজেদুর রহমান কনক
১৭ মে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস। ১৮৬৫ সালের এই দিনে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (ITU) প্রতিষ্ঠার স্মরণে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। ২০২৬ সালের হাইপার-ডিজিটালাইজড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এই দিনটির তাৎপর্য গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক মাত্রা লাভ করেছে। বর্তমান বিশ্বে টেলিযোগাযোগ কেবল তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়, বরং তা বৈশ্বিক অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি এবং নাগরিক অধিকারের প্রধান চালিকাশক্তি। এই বিশেষ দিবসটি ডিজিটাল বৈষম্য (Digital Divide) দূর করে উপাত্তের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ ও সমতাভিত্তিক বিশ্ব সমাজ বিনির্মাণের দার্শনিক ও বাণিজ্যিক অঙ্গীকারকে জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করে।
বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস (১৭ মে) সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদযাপনের গণ্ডি অতিক্রম করে মানব সভ্যতার যান্ত্রিক, সামাজিক এবং ভূ-রাজনৈতিক বিবর্তনের এক জটিল ডিসকোর্সে পরিণত হয়েছে। ১৮৬৫ সালে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (ITU) প্রতিষ্ঠার স্মৃতিবাহী এই দিনটি ২০২৬ সালের হাইপার-ডিজিটালাইজড বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নতুন এক জ্ঞানতাত্ত্বিক তাৎপর্য দাবি করে। আজকের দিনে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো কেবল তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়, বরং এটি সমসাময়িক পুঁজিবাদ, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিক অস্তিত্বের প্রধান চালিকাশক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ৫জি ও পরবর্তী প্রজন্মের নেটওয়ার্ক এবং ইন্টারনেট অব থিংস (IoT)-এর বর্তমান উল্লম্ফন বিশ্বকে এমন এক 'ডিজিটাল প্যানোপটিকন' ও অভিন্ন ইকোসিস্টেমে রূপান্তর করেছে, যেখানে সংযোগের অধিকার এবং তথ্যের নিয়ন্ত্রণই বৈশ্বিক ক্ষমতার নতুন সমীকরণ নির্ধারণ করছে।
সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এই দিবসের সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উপযোগিতা নিহিত রয়েছে 'ডিজিটাল ডিভাইড' বা ডিজিটাল বৈষম্যের রূপান্তরশীল চরিত্র বিশ্লেষণের মধ্যে। বিগত দশকগুলোতে এই বৈষম্য ছিল কেবল 'সংযোগ থাকা বা না থাকা'র (connectivity vs. non-connectivity) সমীকরণ। কিন্তু বর্তমান সময়ে এটি 'গুণগত সংযোগ, ডেটা লিটারেসি এবং প্রযুক্তিগত আধিপত্যের' এক বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে। গ্লোবাল নর্থ বা উন্নত বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত স্বয়ংক্রিয় অর্থনীতি এবং লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের পূর্ণ সুবিধা ভোগ করছে, গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি বড় অংশ তখনো মৌলিক ব্রডব্যান্ড সংযোগ ও সাইবার নিরাপত্তার অভাবে প্রান্তিকীকরণের শিকার হচ্ছে। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং তা শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক গতিশীলতার ক্ষেত্রে এক নতুন ধরনের 'ডিজিটাল উপনিবেশবাদ' (Digital Colonialism) তৈরি করছে। ফলে, এই দিবসের মূল বার্তা এখন আর কেবল নেটওয়ার্কের বিস্তার নয়, বরং একটি সমতাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানবিক ডিজিটাল সমাজ বিনির্মাণ।
ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমসাময়িক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশ্বব্যবস্থায় 'ডেটা সভরেন্টি' বা উপাত্তের সার্বভৌমত্বের এক জটিল প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সমকালীন পুঁজিবাদ বা 'সার্ভেইল্যান্স ক্যাপিটালিজম'-এর যুগে ডেটাই হলো প্রধান বৈশ্বিক সম্পদ। বৃহৎ বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে কোটি কোটি নাগরিকের ব্যক্তিগত উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও মনস্তাত্ত্বিক কাস্টমাইজেশন করছে, তা রাষ্ট্রের নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামো এবং জনমত গঠনের প্রক্রিয়াকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত এবং ভুয়া তথ্যের (Disinformation) অবাধ প্রবাহ আজ বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে, বিশ্ব টেলিযোগাযোগ দিবসটি আন্তর্জাতিক মহলে একটি সমন্বিত সাইবার ডিপ্লোম্যাসি বা 'ডিজিটাল ইথিকস' প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেয়। এটি এমন একটি আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা রেখাপাত করে যা একদিকে তথ্যের মুক্ত প্রবাহকে নিশ্চিত করবে এবং অন্যদিকে নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকার ও রাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা রক্ষা করবে।
অর্থনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে সমসাময়িক টেলিযোগাযোগ শিল্প বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রথাগত ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। গিগ ইকোনমি, ই-কমার্স এবং ক্লাউড-ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা এখন আর বিকল্প অর্থনৈতিক মডেল নয়, বরং এটিই মূলধারা। বিশেষ করে কোভিড-উত্তর পৃথিবীতে কাজের যে বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে, তা সম্পূর্ণভাবে শক্তিশালী টেলিকম নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। তবে এই রূপান্তর শ্রমবাজারের স্থায়িত্ব এবং শ্রমিকের অধিকার নিয়ে নতুন তাত্ত্বিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অটোমেশন ও এআই-এর কারণে প্রথাগত কর্মসংস্থান যখন হুমকির মুখে, তখন এই প্রযুক্তিকে কীভাবে পুনঃদক্ষতা (Reskilling) এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হাতিয়ার বানানো যায়, তা-ই বর্তমান সময়ের বড় অন্বেষণ। টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ডিঙিয়ে সরাসরি বৈশ্বিক জ্ঞান-অর্থনীতির (Knowledge Economy) অংশ হওয়ার অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে।
একই সাথে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত সংকটের সমসাময়িক বাস্তবতায় তথ্য প্রযুক্তির ভূমিকা দ্বিমুখী তাত্ত্বিকতার জন্ম দেয়। একদিকে, স্মার্ট গ্রিড, রিমোট সেন্সিং এবং এআই-চালিত জলবায়ু মডেলিং আমাদের পরিবেশগত বিপর্যয় পূর্বাভাস ও তা মোকাবিলায় সাহায্য করছে। অন্যদিকে, বিশাল ডেটা সেন্টারগুলোর পরিচালনা এবং ফাইভ-জি অবকাঠামোর জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল বিদ্যুৎ শক্তি কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে দিচ্ছে, পাশাপাশি জন্ম দিচ্ছে টন টন 'ই-বর্জ্য' (E-waste)। ফলে, এবারের প্রেক্ষাপটে টেলিযোগাযোগের আলোচনা কেবল গতি ও দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; একে অবশ্যই 'গ্রিন আইসিটি' বা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস হলো মানব সভ্যতার ডিজিটাল রূপান্তরের একটি দার্শনিক মূল্যায়নপত্র। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তির চূড়ান্ত সার্থকতা এর যান্ত্রিক উৎকর্ষের মধ্যে নয়, বরং মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ ও মুক্তি অর্জনের মধ্যে নিহিত। সংযোগ যখন বিচ্ছিন্ন মানুষকে মেলাতে পারে, যখন এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে মূলধারায় নিয়ে আসতে পারে, তখনই কেবল এর প্রকৃত বাণিজ্যিক ও সামাজিক মুক্তি ঘটে। বর্তমানের এই রূপান্তরশীল ও অনিশ্চিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, ১৭ মে আমাদের এই অঙ্গীকারের মুখোমুখি করে যে, আমরা প্রযুক্তিকে কেবল মুনাফা বা নজরদারির হাতিয়ার হতে দেব না, বরং একে একটি প্রগতিশীল, ন্যায়সংগত এবং বৈষম্যহীন পৃথিবী গড়ার আলোকবর্তিকা হিসেবে মানবজাতির সেবায় নিয়োজিত রাখব।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
পাঠকের মতামত:
- টুঙ্গিপাড়ায় মোটরসাইকেল-কাভার্ডভ্যান মুখোমুখি সংঘর্ষে নারী নিহত
- চাটমোহরে বিএমডিএ চেয়ারম্যান কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনকে সংবর্ধনা
- গোপালগঞ্জ রিপোর্টার্স ফোরাম কমিটি পুনঃগঠন
- টেলিযোগাযোগ আনবে সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন নতুন বিশ্ব
- স্বপ্ন থেকে বাস্তবে রূপপুর
- জননেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের প্রস্থান: ‘জয় বাংলা’র স্রোতে ভীতিহীন এক জনসমুদ্র
- মব সৃষ্টি করে পদত্যাগে বাধ্য করা মাদরাসার অধ্যক্ষকে চাকুরিতে পুনর্বহালের দাবি
- ৩ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস, নদীবন্দরে সতর্কতা জারি
- কালের স্বাক্ষী লোহাগড়ার ইতনার 'নহবতখানা'
- সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহা মারা গেছেন
- ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে’
- ‘কারিনা, বাংলাদেশ তোমাকে মনে রাখবে’
- সাতক্ষীরায় মাদ্রাসা ও এতিমখানার উপাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ
- শ্যামনগরে বৈশাখী শিবের চড়ক পূজা অনুষ্ঠিত
- ‘দুটি সার্চলাইট আমাদের দিকে তাক করা’
- সন্তানের ভরণপোষণ না দিয়ে হত্যার হুমকি, অসহায় মায়ের আবেদন
- ‘রোনালদোর ক্ষুধা এখনো ট্রফি না পাওয়া তরুণের মতো’
- সোনার দাম আরও কমলো, ভরি ২৩৮১২১ টাকা
- স্বাধীনতা ঘোষণা না করতে তাইওয়ানকে সতর্ক করলেন ট্রাম্প
- পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিপন্নকারীদের নির্মূল না করা পর্যন্ত মুসলমান ভাইয়েরা ঘরে ফিরবে না
- ধামরাইয়ে রাতের অন্ধকারে ভেকুতে আগুন
- পাংশায় ড্রেন পরিস্কার অভিযান
- হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ
- রাজবাড়ীতে ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার
- বজ্রপাতে ছাত্রশক্তি সদস্যের মৃত্যু
- মেহেরপুরের গাংনীতে রাতের আঁধারে শিক্ষার্থীর বাড়িতে ইউএনও
- উচিৎ জবাব
- হ্যামকো গ্রুপের কারখানায় ডাকাতি, কোটি টাকার মালামাল লুট
- সালথায় ইয়াবাসহ আটক ২
- বীর মুক্তিযোদ্ধা সখিনা বেগম আর নেই
- নবীনগরে আ.লীগ নেতা নাছির উদ্দিনের ইট ভাটায় অভিযান, ৫ লাখ টাকা জরিমানা
- তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি
- ভিভো ভি৪০ লাইট, ডিজাইনে নতুন ফিউশন
- কুষ্টিয়া আদালতে ছাত্রলীগ নেতার 'জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু' স্লোগান
- নির্ভীক এর মোড়ক উন্মোচন করলেন ওবায়দুল কাদের
- মোজাহেদুল ইসলামের ‘এআই শিখুন, টাকা গুনুন’ বই বাজারে
- ঠাকুরগাঁওয়ে বয়লার বিষ্ফোরণে একই পরিবারের তিনজন নিহত
- মনোহরগঞ্জে ছাত্রলীগ নেতার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ
- কুমিল্লায় ট্রাকচাপায় সিএনজি অটোরিকশার ৫ যাত্রী নিহত
- সাকিবের ঝড়ের পরও ফাইনালে স্বপ্নভঙ্গ মন্ট্রিল টাইগার্সের
- সাংবাদিক হাসিবুর রহমান রিজুকে হত্যাচেষ্টার প্রতিবাদে নীলফামারীতে মানববন্ধন
- বিদ্যার মাহাত্ম্য
- শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবসে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আলোর মিছিল বগুড়ায়
- যেদিন পতাকা উঠেছিল চৌরঙ্গীর আকাশে
- মব সৃষ্টি করে পদত্যাগে বাধ্য করা মাদরাসার অধ্যক্ষকে চাকুরিতে পুনর্বহালের দাবি
-1.gif)








