E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

রাজনীতির চেয়ে মানবিকতা বড় হোক

২০২৬ মে ১৭ ১৭:২৭:১৯
রাজনীতির চেয়ে মানবিকতা বড় হোক

আবদুল হামিদ মাহবুব


পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের কবিতার একটি চরণ ছিল 'সবার সুখে হাসব আমি কাঁদব সবার দুখে'। সমাজের প্রতি, সমাজের মানুষের প্রতি কবি এই কবিতা লিখেছিলেন। আর এখন সমাজ, এই সমাজের মানুষ! আমরা কি করছি? প্রশ্ন-উত্থাপন করে এই লেখার সূচনা। কারণ একজনের মৃত্যুতে আমরা কি দেখলাম! যদিও আমি এখন বিদেশে অবস্থান করছি, কিন্তু মনটা তো পড়ে আছে দেশেই। তাই দেশের মানুষের, দেশী মানুষের পৈচাশিকতার প্রকাশ দেখে আমি স্তব্ধ ও ক্ষুব্ধ। ল্যাপটপের কী-বোর্ডে হাত চলছে না। তবুও এই লেখাটি লিখছি। ভিতরে যে এক হা হতাশ আমাকে তাড়া করছে। লেখাটা শেষ করলে সেই হা হুতাশ হয়তো দমতে পারে। 

কারিনা কায়সারের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়। এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন, তরুণ সমাজ এবং মানবিক চেতনার জন্যও এক গভীর বেদনার নাম। মাত্র ৩০ বছর বয়সে একজন তরুণী চলে গেলেন। যার সামনে ছিল আরও অনেক পথ। অনেক স্বপ্ন। অনেক সম্ভাবনা। অথচ তার মৃত্যুর খবর প্রকাশ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক অংশে যে নিষ্ঠুর উল্লাস দেখা গেল, তা আমাদের সমাজের এক ভয়ংকর চেহারাও সামনে নিয়ে এসেছে।

কারিনা কায়সার ছিলেন সাবেক ফুটবলার কায়সার হামিদের মেয়ে। তার দাদি রানী হামিদ বাংলাদেশের দাবা ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নাম। পরিবার থেকে তিনি পেয়েছিলেন পরিচয়। কিন্তু তিনি নিজের পরিচয় তৈরি করেছিলেন নিজের মতো করে। কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে। অভিনয়ের মাধ্যমে। সামাজিক বক্তব্যের মাধ্যমে। সাহসী অবস্থানের মাধ্যমে।

লিভার সংক্রান্ত জটিলতায় ভারতের চেন্নাইয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। কারিনার মৃত্যুতে অসংখ্য মানুষ শোক প্রকাশ করেছেন। কেউ লিখেছেন স্মৃতি। কেউ লিখেছেন তার সাহসের কথা। কেউ লিখেছেন তার হাসির কথা। কিন্তু একই সঙ্গে কিছু মানুষ এমন আচরণ করেছেন, যা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মৃত্যু নিয়ে বিদ্রুপ করা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এটি যেন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। কেউ মারা গেলে আগে দেখা হয় তিনি কোন মতের মানুষ ছিলেন। তারপর ঠিক করা হয় তাকে নিয়ে শোক করা হবে, নাকি ব্যঙ্গ করা হবে। এই প্রবণতা ভয়ংকর। কারণ এটি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা বন্ধ করে দেয়।

কারিনা কায়সারের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ “আলহামদুলিল্লাহ” লিখে উল্লাস করেছে। কেউ অসুস্থতা নিয়ে কটাক্ষ করেছে। কেউ রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাকে আক্রমণ করেছে। অথচ একজন মৃত মানুষকে সম্মান জানানো তো ন্যূনতম মানবিকতা। এখানে প্রশ্ন রাজনীতির নয়। প্রশ্ন মানুষ হওয়ার।

কারিনা কায়সার জুলাই আন্দোলনের সময় সক্রিয় ছিলেন; এমন কথাও বিভিন্ন জায়গায় উঠে এসেছে। অনেকেই তাঁকে সাহসী কণ্ঠ বলে উল্লেখ করেছেন। একটি নাগরিক সংগঠন তাদের শোকবার্তায় তাকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাহসী কণ্ঠ হিসেবে স্মরণ করেছে। তার মৃত্যুতে উপস্থাপক ও লেখক রুম্মান রশীদ খান একটি আবেগঘন পোস্ট দেন। তিনি কারিনার একটি সাদাকালো ছবি প্রকাশ করেন। জানান, জীবিত অবস্থাতেই কারিনা তাকে বলেছিলেন, মারা গেলে যেন এই ছবিটিই প্রকাশ করা হয়। এই একটি তথ্যই যেন অনেক কিছু বলে দেয়। মৃত্যুকে হয়তো তিনি অনুভব করেছিলেন। হয়তো জীবনের ভঙ্গুরতাও বুঝেছিলেন। তাই মৃত্যুর পর মানুষ তাকে কীভাবে স্মরণ করবে, সেটিও ভেবে রেখেছিলেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টিও তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে। তাদের বক্তব্যে বলা হয়, পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে কারিনা নিজেকে আলাদা করে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এসব শোকবার্তা শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়। এগুলো একজন মানুষের প্রতি সম্মান। তার জীবনের প্রতি স্বীকৃতি। কিন্তু অন্যদিকে যে বিদ্বেষ দেখা গেল, সেটিও আমাদের সময়ের বাস্তবতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন অনেকের কাছে ঘৃণা প্রকাশের সহজ জায়গা হয়ে গেছে। মানুষ নিজের নাম-পরিচয় নিয়েই অন্যের মৃত্যুতে হাসাহাসি করছে। এ এক ভয়ংকর অসুস্থতা।

রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে। মতাদর্শের লড়াই থাকতে পারে। কিন্তু মৃত্যু নিয়ে উল্লাস কখনোই সভ্যতার অংশ হতে পারে না। আমরা ভুলে যাচ্ছি, যার মৃত্যু নিয়ে হাসছি, তিনি কারও সন্তান। কারও বোন। কারও বন্ধু। কারও প্রিয় মানুষ। আজ কারিনা কায়সার। কাল অন্য কেউ। এই সংস্কৃতি একদিন সবাইকে গ্রাস করবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু বছর ধরে প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে না দেখার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিরোধী মতকে শত্রু বানানো হয়েছে। তারপর সেই শত্রুকে ঘৃণা করতে করতে একসময় মানুষ তার মৃত্যু নিয়েও হাসতে শিখেছে। এটিই সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা। কারিনা কায়সারের মৃত্যু আমাদের সেই আয়নাটাই দেখিয়েছে।

তবে আশার জায়গাও আছে। কারণ ঘৃণার চেয়ে শোক প্রকাশকারীর সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। অসংখ্য তরুণ লিখেছেন, মৃত্যু নিয়ে বিদ্রুপ করা লজ্জাজনক। কেউ লিখেছেন, রাজনীতি থাকতে পারে, কিন্তু মৃত্যু নিয়ে উল্লাস অমানবিক। কেউ লিখেছেন, একজন মানুষ চলে গেছেন, অন্তত নীরব থাকুন। এই মানবিক কণ্ঠগুলোই বাংলাদেশের আসল শক্তি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক ক্ষমতা স্থায়ী নয়। মতাদর্শও বদলায়। কিন্তু মানবিকতা হারিয়ে গেলে সমাজ ধ্বংস হয়ে যায়। কারিনা কায়সারের মৃত্যু হয়তো একটি প্রজন্মকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। আমরা কী ধরনের সমাজ চাই? এমন সমাজ, যেখানে একজন তরুণীর মৃত্যুতে মানুষ হাসবে? নাকি এমন সমাজ, যেখানে মতভেদ থাকলেও মৃত্যুতে সবাই নীরব সম্মান জানাবে? একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার রাজনৈতিক স্লোগানে নয়। তার পরিচয় মানুষের প্রতি আচরণে। আজ যারা মৃত্যু নিয়ে বিদ্রুপ করছেন, তারা হয়তো বুঝতে পারছেন না, এভাবে তারা নিজেদেরই ছোট করছেন। একজন মৃত মানুষকে অপমান করে কেউ বড় হয় না।

কারিনা কায়সার আর ফিরবেন না। তার পরিবার এই শোক বহন করবে সারাজীবন। একজন বাবা তার মেয়েকে হারিয়েছেন। একটি পরিবার তাদের প্রিয় মানুষকে হারিয়েছে। এই বেদনার সামনে রাজনীতি খুব ছোট হয়ে যায়। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, ঘৃণার এই সংস্কৃতি থামানো।

আমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে, মতের বিরোধিতা করা যায়, কিন্তু মানুষের মৃত্যু নিয়ে হাসাহাসি করা যায় না। রাজনৈতিক লড়াই থাকতে পারে, কিন্তু মানবিকতা হারানো যাবে না। কারিনা কায়সারের জীবন হয়তো খুব দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু তিনি আলোচনায় ছিলেন। মানুষ তাকে মনে রাখবে। তার কাজের জন্য। তার অবস্থানের জন্য। তার সাহসের জন্য।

আর যারা মৃত্যু নিয়ে উল্লাস করেছে, ইতিহাস তাদের খুব বেশি সম্মান দিয়ে মনে রাখে না।কারিনা কায়সারের প্রতি শ্রদ্ধা। তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা। আর বাংলাদেশের মানুষের প্রতি একটি আহ্বান; ঘৃণার চেয়ে মানুষ বড় হোক। রাজনীতির চেয়ে মানবিকতা বড় হোক। আমি আমার আহবান তো রাখলাম। আমাদের বোধ কি জাগ্রত হবে? মানুষ ও মানবতার জয় গান গাওয়ার সমাজ কি আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারব?

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।

পাঠকের মতামত:

১৭ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test