E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

থাইরয়েড সমস্যা নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য সচেতনতা অপরিহার্য

২০২৬ মে ২৪ ১৬:৫৭:০৬
থাইরয়েড সমস্যা নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য সচেতনতা অপরিহার্য

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ


২৫ মে বিশ্ব থাইরয়েড দিবস। ২০০৯ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে থাইরয়েড রোগ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে। বর্তমানে থাইরয়েড সমস্যা বিশ্বজুড়ে একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশেও দিন দিন বাড়ছে এই রোগীর সংখ্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছেন, অথচ আক্রান্তদের অর্ধেকেরও বেশি জানেন না যে তারা এ রোগে আক্রান্ত।

থাইরয়েড হলো গলার সামনে অবস্থিত প্রজাপতি আকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি। এটি থেকে নিঃসৃত হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া, বৃদ্ধি, শক্তি উৎপাদন, হৃদস্পন্দন, তাপমাত্রা, মানসিক বিকাশ ও প্রজনন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই থাইরয়েড হরমোনের সামান্য ভারসাম্যহীনতাও শরীরে নানাবিধ জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

বর্তমান বিশ্ব ও বাংলাদেশের পরিসংখ্যান

* বিশ্বে প্রায় ১৬০ কোটির বেশি মানুষ আয়োডিন ঘাটতির ঝুঁকিতে রয়েছে।

* বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ কোটির বেশি মানুষ থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়।

* নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি আক্রান্ত হন।

* বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি মানুষ কোনো না কোনো থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছেন।

* দেশে মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩০ শতাংশ থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত।

* প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের প্রায় ২% হাইপারথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত।

* পুরুষদের মধ্যে এ হার প্রায় ০.২%। হাইপোথাইরয়েডিজমে নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ৪% থেকে ৯% মানুষ আক্রান্ত।

* নবজাতক প্রতি ১০ হাজারে ২ থেকে ৮ জন জন্মগত থাইরয়েড হরমোন ঘাটতিতে ভুগতে পারে।

* গলগণ্ড বা ঘ্যাগ রোগ এখনও বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য হারে বিদ্যমান।

* থাইরয়েড ক্যান্সারের রোগীর সংখ্যাও বিশ্বব্যাপী বাড়ছে।

নারী, পুরুষ ও শিশুদের মধ্যে আলাদা ঝুঁকি

নারীদের ক্ষেত্রে

* প্রতি ৮ জন নারীর মধ্যে ১ জন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন।

* গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মদান ও মেনোপজের সময় ঝুঁকি বাড়ে।

* মাসিক অনিয়ম, বন্ধ্যাত্ব, ওজন বৃদ্ধি, বিষণ্নতা ও চুল পড়া বেশি দেখা যায়।

* গর্ভাবস্থায় অনিয়ন্ত্রিত থাইরয়েড শিশুর মেধা ও শারীরিক বিকাশ ব্যাহত করতে পারে।

পুরুষদের ক্ষেত্রে

* তুলনামূলক কম হলেও পুরুষদের মধ্যে রোগ শনাক্ত দেরিতে হয়।

* অতিরিক্ত দুর্বলতা, যৌন সমস্যা, ওজন ওঠানামা ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

* অনেক সময় উপসর্গ উপেক্ষা করায় জটিলতা বৃদ্ধি পায়।

শিশুদের ক্ষেত্রে

* জন্মগত থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি শিশুর মানসিক বিকাশ স্থায়ীভাবে ব্যাহত করতে পারে।

* শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি কমে যায়।

* পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়।

* কথা বলা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বিলম্বিত হতে পারে।

* দ্রুত শনাক্ত না হলে স্থায়ী প্রতিবন্ধকতার ঝুঁকি থাকে।

থাইরয়েড রোগের প্রধান প্রকারভেদ

১. হাইপোথাইরয়েডিজম
থাইরয়েড হরমোন কম উৎপন্ন হলে এ সমস্যা হয়।

২. হাইপারথাইরয়েডিজম
হরমোন অতিরিক্ত উৎপন্ন হলে এ রোগ দেখা দেয়।

৩. গলগণ্ড বা ঘ্যাগ
সাধারণত আয়োডিনের অভাবে থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যায়।

৪. থাইরয়েড নডিউল ও ক্যান্সার
থাইরয়েডে গুটি বা টিউমার তৈরি হতে পারে, যা কখনও ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।

থাইরয়েড রোগের কারণ

* খাদ্যে আয়োডিনের অভাব

* অটোইমিউন রোগ

* বংশগত কারণ

* অতিরিক্ত মানসিক চাপ

* অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস

* থাইরয়েড অপারেশন

* রেডিওথেরাপি

* কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

* জন্মগত থাইরয়েড গ্রন্থির ত্রুটি

* হরমোনজনিত সমস্যা

* অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ

হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণ

* অতিরিক্ত দুর্বলতা

* ওজন বৃদ্ধি

* ঠান্ডা বেশি লাগা

* কোষ্ঠকাঠিন্য

* চুল পড়া

* মুখ ও শরীর ফুলে যাওয়া

বিষণ্নতা

* স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
* অনিয়মিত মাসিক
* ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া

হাইপারথাইরয়েডিজমের লক্ষণ

* বুক ধড়ফড় করা
* দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
* অতিরিক্ত ঘাম
* গরম সহ্য না হওয়া
* হাত কাঁপা
* উদ্বেগ ও অনিদ্রা
* চোখ বড় হয়ে যাওয়া
* অতিরিক্ত ক্ষুধা
* মাসিকের সমস্যা

থাইরয়েড রোগের জটিলতা

* হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ
* বন্ধ্যাত্ব
* গর্ভপাতের ঝুঁকি
* শিশুর মেধা বিকাশ ব্যাহত হওয়া
* মানসিক অবসাদ
* স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
* অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস
* হাড় ক্ষয়
* থাইরয়েড ক্যান্সার
* কোমা পর্যন্ত হতে পারে গুরুতর ক্ষেত্রে

রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা

* T3 পরীক্ষা * T4 পরীক্ষা
* TSH পরীক্ষা
* থাইরয়েডের আলট্রাসনোগ্রাম
* অ্যান্টিবডি টেস্ট
* FNAC বা বায়োপসি
* থাইরয়েড স্ক্যান

ঘরোয়া পরামর্শ ও প্রতিরোধ

খাদ্যাভ্যাস

* আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করতে হবে।
* সামুদ্রিক মাছ, ডিম, দুধ, দই ও ফলমূল খেতে হবে।
* অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড ও কোমল পানীয় পরিহার করতে হবে।
* অতিরিক্ত চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার কমাতে হবে।

জীবনযাপন

* নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।
* পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে।
* মানসিক চাপ কমাতে হবে।
* ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করতে হবে।

ভিটামিন ও পুষ্টি

* ভিটামিন ডি ও বি-১২ সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে।
* প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট সূর্যের আলোতে থাকতে হবে।
* সেলেনিয়াম ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার উপকারী।

যেসব খাবার সতর্কতার সঙ্গে খেতে হবে

* বাঁধাকপি * ব্রকলি * ফুলকপি
* সরিষা * মিষ্টি আলু।এসব খাবার কাঁচা না খেয়ে রান্না করে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া ভালো।

হোমিও সমাধান

হোমিওপ্যাথিতে রোগীর সার্বিক লক্ষণ বিবেচনায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। থাইরয়েডিনাম, আয়োডিন, নেট্রাম মিউর, লাইকোপোডিয়াম, সাইলেসিয়া, থুজা, মেডোরিনামসহ বিভিন্ন ওষুধ রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী ব্যবহৃত হতে পারে। তবে অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।

করণীয়

* নারীদের নিয়মিত থাইরয়েড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
* গর্ভধারণের আগে থাইরয়েড পরীক্ষা করা উচিত।
* নবজাতকের থাইরয়েড স্ক্রিনিং চালু করা জরুরি।
* স্কুলগামী শিশুদের আয়োডিন ঘাটতি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
* স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, থাইরয়েড রোগ এখন নীরব মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। তবে সময়মতো রোগ নির্ণয়, সঠিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও সচেতনতার মাধ্যমে অধিকাংশ থাইরয়েড রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বিশ্ব থাইরয়েড দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—নিজে সচেতন হই, অন্যকেও সচেতন করি।

লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।

পাঠকের মতামত:

২৪ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test