E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

সাম্য ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম

২০২৬ মে ২৪ ১৯:১৬:০৭
সাম্য ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল


বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাঁরা কেবল সাহিত্যিক নন, বরং যুগ-যুগান্তরের চেতনা ও মানবিক দর্শনের প্রতীক। কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি বিদ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, সাম্যের কবি এবং সর্বোপরি মানবতার কবি। তাঁর কাব্য, গান, প্রবন্ধ ও সাংবাদিকতায় ফুটে উঠেছে শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গঠনের প্রত্যয়। বাংলা সাহিত্যে তিনি যে সাম্যবাদী ও মানবতাবাদী চেতনার সূচনা করেছিলেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

নজরুলের সাহিত্যজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা। তিনি ধর্ম, বর্ণ, জাতি কিংবা শ্রেণিভেদে মানুষকে বিভক্ত করেননি। তাঁর কাছে মানুষই ছিল সর্বোচ্চ সত্য। তাই তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, ‘গাহি সাম্যের গান-যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান, যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান’ -বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় ও অবিস্মরণীয় নাম কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি মানবতার কবি,সাম্যের কবি, বিদ্রোহী কবি, তথাপি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তিনি ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, দার্শনিক, সাংবাদিকতার পাশাপাশি প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত।

১৮৯৯ সালের ২৪ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। শৈশবে দারিদ্র্য, সংগ্রাম ও কষ্টের মধ্য দিয়ে তাঁর বেড়ে ওঠা। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাঁকে সাধারণ মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ করে তোলে। অল্প বয়সেই তিনি মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন, লেটো দলে গান লিখেছেন, রুটির দোকানে কাজ করেছেন এবং পরবর্তীতে সৈনিক জীবনও কাটিয়েছেন। জীবনের এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে গভীর মানবিকতা ও প্রতিবাদী শক্তি।

নজরুল যখন সাহিত্যাঙ্গনে আবির্ভূত হন, তখন ভারতবর্ষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খলে বন্দি। সমাজে ছিল সাম্প্রদায়িক বিভেদ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক নিপীড়ন। এই অমানবিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ কেবল রাজনৈতিক বিদ্রোহের কবিতা নয়, এটি অন্যায়, অসাম্য ও মানববিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে এক চিরন্তন উচ্চারণ। বিদ্রোহ প্রকাশ করতে গিয়ে কবি তার কবিতায় লেখেছেন- “আমি চির বিদ্রোহ বীর, বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা, চির উন্নত শির।”

নজরুলের সাম্যবাদী চেতনা সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থে। সেখানে তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, হিন্দু-মুসলমান, সাদা-কালো কিংবা নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো বিভেদ থাকবে না। তাঁর ভাষায়, ‘নাইকো এখানে কালা ও ধলার আলাদা গোরস্থান’। এই চেতনা ছিল মানবিক সাম্যের চূড়ান্ত প্রকাশ। ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রশ্নে নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার অন্যতম অগ্রদূত। তিনি যেমন ইসলামি গান ও হামদ-নাত রচনা করেছেন, তেমনি শ্যামাসংগীত, ভজন ও কীর্তনও লেখেছেন। তাঁর সাহিত্য প্রমাণ করে, ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করার জন্য নয়, বরং মানুষের আত্মিক উন্নতির জন্য। তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে জাতীয় মুক্তির অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখেছিলেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও সাহসী।

নজরুলের মানবতাবাদ কেবল তাত্ত্বিক ছিল না, ছিল বাস্তবমুখী। তিনি শ্রমজীবী, মেহনতি ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর ‘কুলি-মজুর’, ‘দারিদ্র্য’, ‘মানুষ’ প্রভৃতি কবিতায় শোষিত মানুষের বেদনা ও সংগ্রামের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি দেখেছেন সমাজের বৈষম্য কীভাবে মানুষের মর্যাদা কেড়ে নেয়। তাই তিনি গেয়েছেন মানুষের জয়গান। তাঁর বিখ্যাত উচ্চারণ, “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই” মানবতাবাদের এক অনন্য ঘোষণা।

নারীর অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নেও নজরুল ছিলেন অত্যন্ত প্রগতিশীল। যখন সমাজ নারীদের ঘরবন্দি করে রেখেছিল, তখন তিনি লিখেছিলেন “নারী” কবিতা। সেখানে তিনি নারীকে কেবল প্রেমিকা বা গৃহিণী হিসেবে নয়, বরং শক্তি, প্রেরণা ও সভ্যতার নির্মাতা হিসেবে দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পৃথিবীর সকল বড় অর্জনের পেছনে নারী-পুরুষের যৌথ অবদান রয়েছে। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সময়ের তুলনায় অত্যন্ত আধুনিক ও সাহসী।

নজরুলের সাহিত্যজীবনে সাংবাদিকতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর লেখনী ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ। এজন্য তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। কারাগারে থেকেও তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন ছিলেন। তাঁর “রাজবন্দীর জবানবন্দী” বাংলা সাহিত্যে প্রতিবাদী সাহিত্যের এক অনন্য দলিল।

শুধু রাজনীতি বা সমাজ নয়, নজরুল মানুষের আত্মিক মুক্তির কথাও বলেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষকে সত্যিকার অর্থে মুক্ত হতে হলে হৃদয়ের সংকীর্ণতা দূর করতে হবে। ধর্ম, জাত, বর্ণ ও অহংকারের বিভেদ ভুলে মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসতে হবে। তাঁর সাহিত্য আমাদের সেই মানবিক শিক্ষাই দেয়।

নজরুলের সংগীতেও সাম্য ও মানবতার বাণী গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি প্রায় চার হাজারেরও বেশি গান রচনা করেন। তাঁর গান কখনো বিদ্রোহের, কখনো প্রেমের, কখনো ভক্তির, আবার কখনো মানবমুক্তির আহ্বান। নজরুলসংগীত আজও মানুষের হৃদয়ে মানবিক চেতনার সুর জাগিয়ে তোলে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার চেতনাতেও নজরুলের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। তাঁর কবিতা ও গান মুক্তিকামী মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে তাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কারণ তাঁর সাহিত্য বাঙালির স্বাধীনতা, সাম্য ও মানবতার আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে।

বর্তমান বিশ্বে যখন ধর্মীয় উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য ও মানবিক সংকট বাড়ছে, তখন নজরুলের সাহিত্য নতুন করে আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর সাম্যের বাণী আজও মানুষকে বিভেদ ভুলে এক হওয়ার শিক্ষা দেয়। তিনি শিখিয়েছেন, মানুষের চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই।

আজকের সমাজে আমরা প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও মানবিকতার সংকটে ভুগছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক বিভাজন ও ধর্মীয় বিদ্বেষ মানুষের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় নজরুলের মানবতাবাদী দর্শন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। তাঁর সাহিত্য কেবল অতীতের সম্পদ নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পথনির্দেশকও বটে।

নজরুলের জীবনও ছিল তাঁর আদর্শের প্রতিচ্ছবি। তিনি ব্যক্তিজীবনে কখনো সাম্প্রদায়িকতা বা সংকীর্ণতাকে প্রশ্রয় দেননি। হিন্দু পরিবারে বিবাহ, বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর মানবিক চরিত্রের উজ্জ্বল প্রমাণ। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই বিশ্বমানবতার কবি।

বাংলা সাহিত্যে অনেক কবি এসেছেন, কিন্তু নজরুলের মতো করে সাম্য, দ্রোহ ও মানবতাকে একসূত্রে গাঁথতে খুব কম কবিই পেরেছেন। তাঁর সাহিত্য একদিকে যেমন শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, অন্যদিকে তেমনি প্রেম ও মানবতার আহ্বান। তাই তিনি কেবল একটি সময়ের কবি নন, তিনি সকল যুগের মানুষের কবি।

নজরুল আমাদের শিখিয়েছেন, সাহিত্য কেবল সৌন্দর্যচর্চা নয়, এটি মানুষের মুক্তিরও হাতিয়ার। তাঁর কলম অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিল তলোয়ারের মতো ধারালো, আবার মানবতার পক্ষে ছিল ফুলের মতো কোমল। এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্যই তাঁকে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে।

আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর জন্মজয়ন্তী কিংবা স্মরণ দিবস এলেই আমরা তাঁকে স্মরণ করি। কিন্তু প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে তাঁর আদর্শকে ধারণ করা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, নারী-পুরুষের সমতা এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই তাঁর স্বপ্নের সমাজ গড়ে উঠতে পারে।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম যার গান ও কবিতা যুগে যুগে বাঙালির জীবন সংগ্রাম ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করেছে। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক অবিনাশী শক্তি। তিনি কেবল বিদ্রোহের কবি নন, তিনি সাম্য, মানবতা ও ভালোবাসার কবি। তাঁর সাহিত্য আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়, মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় এবং বিভেদের দেয়াল ভাঙতে শেখায়। যতদিন বাংলা ভাষা ও বাঙালির অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন নজরুলের সাম্য ও মানবতার বাণী মানুষের হৃদয়ে চিরজাগ্রত থাকবে।

লেখক : শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক।

পাঠকের মতামত:

২৪ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test