প্রসঙ্গ ব্যাংক: 'আমার টাকা থাকবে তো'!
আবদুল হামিদ মাহবুব
গত কয়েকদিন ধরে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে দেশে যে আলোচনা, বিতর্ক এবং উদ্বেগ চলছে, তা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুব ভাবাচ্ছে। কারণ বিষয়টি শুধু একটি ব্যাংকের নয়, কোটি কোটি মানুষের সঞ্চয়, ভবিষ্যৎ এবং মানসিক শান্তির সঙ্গে জড়িত।
দুই দিন আগে আমার শ্বশুর আমাকে ফোন করে জানতে চাইলেন, 'ইসলামী ব্যাংকে রাখা আমাদের টাকাগুলো কি নিরাপদ আছে?' প্রশ্নটি শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ হয়ে ছিলাম। কারণ আমি জানি, তিনি এবং আমার শাশুড়ি সারা জীবনের সঞ্চয় এই ব্যাংকেই রেখেছেন। দুজনেই সরকারি চাকরি করেছেন। শ্বশুর ছিলেন একটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, আর শাশুড়ি ছিলেন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক।অবসরের পর পাওয়া পেনশন ও সঞ্চিত অর্থ সুদমুক্তভাবে রাখার জন্য তারা ইসলামী ব্যাংককেই বেছে নিয়েছিলেন।
বর্তমানে তারা অস্ট্রেলিয়ায় ছেলেমেয়েদের কাছে অবস্থান করছেন। টেলিভিশনের সংবাদ দেখে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এমনকি দেশে ফিরে এসে টাকা তুলে নেওয়ার কথাও ভাবছেন। আমি তখন বলেছিলাম, 'আপনারা এলেই কি টাকা পেয়ে যাবেন? যদি কোনো সমস্যা হয়, সেটা সবার জন্যই হবে।'
পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, শুধু আমার শ্বশুর-শাশুড়ি নন, আমার আরও কয়েকজন আত্মীয়ও একই দুশ্চিন্তায় আছেন। একজন সাধারণ দিনমজুরও আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, একটি ইসলামী ব্যাংকে রাখা তার সামান্য সঞ্চয় নিরাপদ আছে কি না। অর্থাৎ আতঙ্ক শুধু বড় আমানতকারীদের নয়, ছোট আমানতকারীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।
আসলে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে এই সংকটের শুরু আজকের নয়। বহু বছর ধরেই এই ব্যাংক দেশের অন্যতম শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল। দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে এটি মানুষের আস্থা অর্জন করেছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের পর থেকে ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালনা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়।
অভিযোগ রয়েছে যে এস আলম গ্রুপ বিভিন্ন উপায়ে ইসলামী ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে ব্যাংকটির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয় এবং সেই ঋণের বড় অংশ নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। গণমাধ্যম এবং তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজার হাজার কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে বের হয়ে গেছে। এমনকি অনেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির নিজস্ব অর্থ ব্যবহার করেই নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং নতুন স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ করে। তখন বলা হয়েছিল, ব্যাংকটিকে এস আলম গ্রুপের প্রভাবমুক্ত করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদসহ কয়েকজন অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও পেশাজীবী।
এরপর ব্যাংকটির বিভিন্ন ঋণ ও আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিচালনা পর্ষদ বেশ কিছু অডিটও শুরু করে। ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও তদন্ত হয় এবং কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
কিন্তু এখানেই সমস্যার শেষ হয়নি। গত প্রায় দুই বছরে ইসলামী ব্যাংকে একাধিকবার নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে। একজন চেয়ারম্যানের পর আরেকজন চেয়ারম্যান এসেছেন, আবার পদত্যাগও করেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে আবারও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকের কিছু গ্রাহক সংগঠন প্রতিবাদও করেছে।
এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন একটি অভিযোগ শোনা যাচ্ছে, ইসলামী ব্যাংক নাকি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ বা গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে চলে গিয়েছিল, আর বর্তমান সরকার সেটি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। এই দাবির পক্ষে-বিপক্ষে নানা বক্তব্য রয়েছে। কিন্তু সাধারণ আমানতকারীর কাছে এসব রাজনৈতিক তর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই, 'আমার টাকা কি নিরাপদ?'
আমি মনে করি, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারের। কারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হচ্ছে আস্থা। মানুষ যখন ব্যাংকে টাকা রাখে, তখন তারা শুধু মুনাফা বা সেবার জন্য রাখে না; তারা নিরাপত্তার জন্য রাখে। সেই নিরাপত্তাবোধ নষ্ট হয়ে গেলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা দরকার। কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন হওয়া মানেই আমানতকারীর টাকা হারিয়ে যাওয়া নয়। ব্যাংকের মালিকানা, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন ব্যাংক সংকটে পড়লেও সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছে। তবে এটাও সত্য যে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চললে সেই ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে যায়।
আমার উদ্বেগ অন্য জায়গায়। সংসদে, টেলিভিশনে এবং রাজনৈতিক মঞ্চে যখন প্রতিদিন একটি ব্যাংক নিয়ে সংঘাতপূর্ণ ভাষায় কথা বলা হয়, তখন সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়। অনেকেই বিষয়গুলো গভীরভাবে বোঝেন না। তারা শুধু শুনেন; দখল, লুটপাট, পরিবর্তন, নতুন বোর্ড, নতুন চেয়ারম্যান। তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, 'আমার টাকা কি থাকবে?'
আমার মনে হয়, এই পরিস্থিতিতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকেরও নিয়মিতভাবে জনগণকে অবহিত করা উচিত যে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা কী, সংস্কার কার্যক্রম কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এবং আমানতকারীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ আছে কি না।
কারণ অর্থনীতিতে গুজব অনেক সময় বাস্তব সমস্যার চেয়েও বেশি ক্ষতি করে। মানুষ যদি আতঙ্কে একযোগে টাকা তুলে নিতে শুরু করে, তাহলে সুস্থ ব্যাংকও চাপে পড়ে যেতে পারে। তাই দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এখন সবচেয়ে জরুরি।
আমার শ্বশুর-শাশুড়ির মতো বয়স্ক মানুষদের কথা ভাবি। জীবনের সব পরিশ্রমের সঞ্চয় তারা একটি ব্যাংকে রেখেছেন। এই বয়সে তাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া নিশ্চিন্তে থাকা। অথচ আজ তারা হাজার মাইল দূরে বসে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। এই উদ্বেগ শুধু তাদের নয়, লাখো আমানতকারীর।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষের রাজনৈতিক মত ভিন্ন হতে পারে, সরকার বদলাতে পারে, বোর্ড পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু মানুষের ব্যাংকের টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। একটি সভ্য রাষ্ট্রে ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা কখনোই ভালো লক্ষণ নয়।
আমার বিশ্বাস, ইসলামী ব্যাংকের অতীতের অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। যারা দায়ী, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। একই সঙ্গে বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়াও স্বচ্ছ হতে হবে। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকতে হবে আমানতকারীদের স্বার্থ। কারণ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা নয়; মানুষের বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা ফিরিয়ে আনতে অনেক বছর লেগে যায়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।
পাঠকের মতামত:
- কাপ্তাইয়ে এলএফজি সদস্যদের মাঝে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উপকরণ হস্তান্তর
- ফরিদপুরে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ অমান্য করে গোপন সিঁড়ি দিয়ে অনৈতিক কাজ চালাচ্ছে ঈগল হোটেল
- নাটোরে জার্মান প্রবাসীর গ্রামের বাড়িতে জার্মানি সাজ ভাইরাল
- ইউসিবির মূলধন দ্বিগুণ, ৪৩তম এজিএম সম্পন্ন
- ছুটির দিনে শিশু শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে দপ্তরীকে তিন দফায় নির্যাতন
- নিভে যাচ্ছে ক্যান্সারে আক্রান্ত মেধাবী অন্তরের স্বপ্ন
- টুঙ্গিপাড়ায় প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকার চায়না দুয়ারি জাল উদ্ধার
- কাপাসিয়ায় চাঁদা না পেয়ে হামলা, আহত ৪
- ইউনেস্কো স্বীকৃতি পেল বাংলাদেশের ভাসমান বিদ্যালয়
- গোয়ালন্দে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু
- ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সাথে রাণীশংকৈল প্রেসক্লাবের মতবিনিময়
- নিম্নমানের ইট দিয়ে চলছে রাস্তা সংস্কার, ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা
- দিনাজপুরে বৃষ্টি উপেক্ষা ব্রাজিল সমর্থকদের বর্ণিল শোভাযাত্রা
- ফুলপুর হাসপাতালের ২ সেকমোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ
- শিক্ষার অন্ধকারে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র: কার হাতে গড়বে আগামী বাংলাদেশ?
- প্রসঙ্গ ব্যাংক: 'আমার টাকা থাকবে তো'!
- মধুমতি এক্সপ্রেসে ৫০ বোতল এসকাফ সিরাপ উদ্ধার, আটক ১
- ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসা উচিত?
- ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠায় চাই ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস
- চাঁদাবাজির অভিযোগে আড়াইহাজার থানার এস আই ক্লোজড
- নারায়ণগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্রদল ও যুবদল নেতার মৃত্যুতে জেলা বিএনপির শোক প্রকাশ
- নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে আমাদের করণীয় ও দায়িত্ব
- মৃত্যু নিবন্ধন ও মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভার্বাল অটোপসি পাইলট প্রকল্পের উদ্বোধন
- ফতুল্লায় পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক গ্রেফতার
- নারায়ণগঞ্জে অপরাধীদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেন এসপি
- সাভারে সাংবাদিককে হুমকি ও মারধরের প্রতিবাদে মানববন্ধন
- সাগর নন্দিনী-২ জাহাজে ফের বিস্ফোরণ, ৯ পুলিশসহ দগ্ধ ১১
- ঝালকাঠিতে বিচার বিভাগীয় কর্মচারী এসোসিয়েশনের কর্মবিরতি পালন
- স্টার সিনেপ্লেক্সে ‘হুমায়ুন আহমেদ সপ্তাহ’
- আগামী রমজানের আগে নির্বাচন চায় জামায়াত
- গোয়ালন্দে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু
- সিলেট বিমানবন্দরে ফ্রি ওয়াইফাই-টেলিফোন সেবা চালু
- মেগা ডিসকাউন্টে রিয়েলমি স্মার্টফোন পাওয়া যাবে দারাজ ১২ : ১২ ক্যাম্পেইনে
- শুক্রবার থেকে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ধর্মঘট
- ১৯ ডিসেম্বর কাশিয়ানী মুক্ত দিবস
- মহালয়া কেন পালন করা হয়?
- ‘রিজিকের মালিক আল্লাহ, আমি শুধু চেষ্টা করেছি’
- ইউপি সদস্য দয়াল বোনার্জীর অপসারণের দাবিতে খাইছড়া চা বাগানে শ্রমিকদের কর্মবিরতি
- বট, পাকুড় আর কৃষ্ণচূড়ার ডালে বেঁচে থাকবে একাত্তরের গল্প
- ঢালাও দরপতনে বাজার মূলধন কমলো ১৮০০০ কোটি টাকা
- ফুলপুর হাসপাতালের ২ সেকমোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ
- শিক্ষার অন্ধকারে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র: কার হাতে গড়বে আগামী বাংলাদেশ?
- দুর্ঘটনার কবলে জামায়াত নেতাকর্মীদের বহনকারী বাস, নিহত ৩
- চাঁদপুরে ইয়েস কার্ড পেল ৪০ সাঁতারু
- ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে নড়াইলে পরিবহন ধর্মঘট
-1.gif)







