E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

বাস্তবতা অস্বীকারের রাজনীতি

২০২৬ জুন ১৫ ১৮:৩৩:৫৮
বাস্তবতা অস্বীকারের রাজনীতি

আবদুল হামিদ মাহবুব


বড় লেখা লিখলে পাঠকের ধৈর্যচুতি ঘটে। সাবেক পুলিশ প্রধান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার খুব কাছের মানুষ, বেনজীর আহমদ দুবাই আটক হয়েছে। ইন্টারপোলের রেড নোটিশের বলেই তার এই আটক হওয়া। জাতীয় সংসদে বিবৃতি দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু এরপরও এই আটককে গুজব হিসেবে প্রচার করছে ফ্যাসিস্টের দোসররা। এতে তাদের কি লাভ হচ্ছে জানিনা! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের ফিড বেনজিনের ছবি এবং তাদের নানা কল্পকাহিনীতে এখন ভরপুর। এসব দেখেই আমাকে এই নিচের এই ছোট্ট লেখাটি লিখতে হচ্ছে।

রাজনীতিতে পরাজয় যেমন বাস্তব, তেমনি বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়াও একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কিন্তু আমাদের অঞ্চলের রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, ক্ষমতা হারানোর পরও অনেক দল ও তাদের সমর্থকরা বাস্তবতা মেনে নিতে পারেন না। তারা নিজেদের জন্য এক ধরনের বিকল্প বাস্তবতা তৈরি করেন। সেখানে সত্যের চেয়ে আশা বড়, আর বাস্তবতার চেয়ে কল্পনা বেশি শক্তিশালী।

সাম্প্রতিক সময়ে বেনজীর আহমেদকে ঘিরে নানা ধরনের বয়ান ও গুঞ্জন ছড়ানো হয়েছে। কেউ বলছেন, তিনি মুক্ত। কেউ বলছেন, তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা হবে না। আবার কেউ এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করছেন, যেন সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাস্তবতা কি সত্যিই তাই বলছে?

রাজনীতির ইতিহাস বলে, যখন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ক্ষমতা হারায়, তখন তাদের অনুসারীদের একটি অংশ দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবতাকে অস্বীকার করে। তারা এমন খবর বিশ্বাস করতে চায়, যা তাদের মানসিক স্বস্তি দেয়। সত্য যত কঠিনই হোক, তারা আশ্রয় নেয় এমন সব গল্পে, যা তাদের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের ছবি আঁকে।

এই মানসিকতার একটি বড় উদাহরণ হলো ক্ষমতাচ্যুত নেতৃত্বকে ঘিরে তৈরি হওয়া নানা কল্পকাহিনি। অনেক সময় এমন ধারণা ছড়ানো হয় যে সবকিছু সাময়িক, খুব শিগগিরই পুরোনো পরিস্থিতি ফিরে আসবে। কিন্তু রাজনীতিতে সময়ের চাকা খুব কম ক্ষেত্রেই উল্টো দিকে ঘোরে। বাস্তবতা সাধারণত সামনে এগোয়, পেছনে নয়।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সংকটের সময় তথ্যের চেয়ে আবেগ বেশি কাজ করে। সমর্থকরা তখন যুক্তির চেয়ে বিশ্বাসকে প্রাধান্য দেন। ফলে কোনো গুজব বা অর্ধসত্য তথ্যও দ্রুত গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করে। সেখানে সত্য যাচাইয়ের চেয়ে নিজের পছন্দের বক্তব্যকে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

এমন পরিস্থিতিতে যখন কেউ প্রকাশ্যে প্রচলিত বয়ানের বিপরীতে কথা বলেন বা কোনো শক্তিশালী পক্ষকে চ্যালেঞ্জ করেন, তখন সেটি অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। কারণ সত্য কখনো কখনো রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তখন ব্যক্তির বক্তব্যের চেয়ে তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াই বেশি আলোচিত হয়।

রাজনীতিতে একটি পুরোনো শিক্ষা আছে। ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়। যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী একসময় অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে হয়, সময়ের পরিবর্তনে তার অবস্থানও বদলে যেতে পারে। তাই কোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা। বাস্তবতা অস্বীকার করে সাময়িক মানসিক সান্ত্বনা পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়তে পারে না।

বেনজীর প্রসঙ্গ হোক বা অন্য কোনো আলোচিত ব্যক্তি; মূল প্রশ্ন ব্যক্তি নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আমরা কি সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে শিখছি, নাকি এখনো নিজেদের পছন্দমতো বাস্তবতা তৈরি করে তার মধ্যেই স্বস্তি খুঁজছি?

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে মতভেদ থাকবে, বিতর্ক থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা অস্বীকারের ওপর কোনো সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি দাঁড়াতে পারে না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত আবেগের নয়, ঘটনার বিচার করে। আর সেই বিচারে টিকে থাকে তারাই, যারা সময়মতো বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে।

তাই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বেনজির বা অন্য কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্য গ্রহণের রাজনৈতিক সাহস অর্জন করেছি? নাকি এখনো কল্পনার ভরসায় হারানো সময়কে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছি?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।

পাঠকের মতামত:

১৫ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test