প্রাইভেট বনাম সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা: আস্থার বাস্তবতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
আল আমিন
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় আজ একটি স্পষ্ট দ্বৈত বাস্তবতা দেখা যায়—একদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অন্যদিকে প্রাইভেট স্কুল ও কিন্ডারগার্টেন। এই দুই ধারার মধ্যে শুধু কাঠামোগত পার্থক্য নয়, বরং অভিভাবকদের আস্থা, শিক্ষার মান এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কেও একটি দৃশ্যমান ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
প্রাইভেট স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, সীমিত বেতন ও সীমিত সম্পদের মধ্যেও অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষার মান ধরে রাখার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অনেক প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা তুলনামূলক কম বেতনে—কখনো তিন হাজার থেকে বারো হাজার টাকার মধ্যে—কাজ করলেও তারা শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের বোঝানো এবং অনুশীলনের ওপর গুরুত্ব দেন। এই ধারাবাহিক পরিশ্রমের কারণে অনেক অভিভাবকের মধ্যে একটি আস্থা তৈরি হয়েছে যে, প্রাইভেট স্কুলগুলো অন্ততপক্ষে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রাইভেট শিক্ষাব্যবস্থায় শ্রেণিকক্ষকেন্দ্রিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকরা চেষ্টা করেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পাঠ্যবিষয় শেষ করতে এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে। ফলে অভিভাবকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, তাদের সন্তানের প্রাথমিক ভিত্তি গঠনে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে চিত্রটি অনেক জায়গায় ভিন্ন। যদিও এখানে শিক্ষকদের বেতন ও সুবিধা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি—আঠারো হাজার থেকে চল্লিশ হাজার টাকা বা তারও বেশি—তবুও শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। অনেক বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদানের ঘাটতি, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগের অভাব এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি যথাযথ যত্নের ঘাটতি দেখা যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকদের একটি অংশ শ্রেণিকক্ষের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত টিউশন বা প্রাইভেট পড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েন। ফলে অনেক শিক্ষার্থী স্কুলের শিক্ষার চেয়ে প্রাইভেট পড়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই প্রবণতা শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং শ্রেণিকক্ষের মূল উদ্দেশ্যকে দুর্বল করে দেওয়ার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এমন বাস্তবতাও দেখা যায় যে, অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রে সরকারি বিদ্যালয়ের পরিবর্তে প্রাইভেট স্কুল বা কিন্ডারগার্টেনকে অগ্রাধিকার দেন। অর্থাৎ যে ব্যবস্থার ভেতরে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন, সেই ব্যবস্থার ওপরই তিনি নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। এই বাস্তবতা সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও গভীর প্রশ্ন তৈরি করে—যে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নিজস্ব শিক্ষকরাই পূর্ণ আস্থা রাখেন না, সেখানে অভিভাবকদের আস্থা কতটা টিকে থাকবে?
এই পুরো পরিস্থিতি থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে—প্রাইভেট শিক্ষাব্যবস্থা যতটা সম্ভব শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার মান ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সরকারি ব্যবস্থার ভেতরে দায়িত্ববোধ ও অগ্রাধিকারের জায়গায় একটি ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে প্রাইভেট শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে, কারণ তারা অন্তত শ্রেণিকক্ষের ভিতরে একটি নিয়মিত শিক্ষার নিশ্চয়তা দেখতে পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে সমস্যাটি শুধুমাত্র কাঠামোর নয়, বরং দায়িত্ববোধ এবং অগ্রাধিকারের জায়গায় একটি বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে। যেখানে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত সুযোগ নিয়েও শিক্ষার মান ধরে রাখার চেষ্টা করছে, সেখানে সরকারি ব্যবস্থায় কিছু জায়গায় শ্রেণিকক্ষের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ বা বিকল্প আয়ের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা শিক্ষাব্যবস্থার আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ প্রাথমিক শিক্ষা যদি ভিত্তি হয়, তাহলে সেই ভিত্তি দুর্বল হলে পুরো শিক্ষার কাঠামোই প্রভাবিত হবে।
সব মিলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়। শিক্ষা যদি সত্যিই জাতির ভিত্তি হয়, তাহলে সেই ভিত্তির ভেতরেই এত আস্থার ঘাটতি কেন তৈরি হচ্ছে? প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান সীমিত সুযোগের মধ্যেও শ্রেণিকক্ষকে গুরুত্ব দিয়ে যখন একটি নির্দিষ্ট মান ধরে রাখার চেষ্টা করছে, তখন সরকারি ব্যবস্থার ভেতরে কোথাও কোথাও দায়িত্ব ও অগ্রাধিকারের ভারসাম্য কেন নষ্ট হচ্ছে—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি শিশুর প্রথম শিক্ষার অভিজ্ঞতাই তার ভবিষ্যৎ চিন্তা, আত্মবিশ্বাস এবং দক্ষতার ভিত্তি তৈরি করে। সেই ভিত্তি যদি শ্রেণিকক্ষের ভেতরেই দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে পরে যতই ব্যবস্থা নেওয়া হোক না কেন, ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা কঠিন হয়ে যায়।
তাই সময় এসেছে দায় এড়ানোর নয়, বরং দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে বাস্তব সমস্যাগুলোকে স্বীকার করে নেওয়ার। শিক্ষা ব্যবস্থা যদি সত্যিই আস্থার জায়গা হয়ে উঠতে চায়, তাহলে শ্রেণিকক্ষকে আবারও শিক্ষার মূল কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে—যেখানে শিক্ষকতা হবে দায়িত্ব, আর শিক্ষা হবে অগ্রাধিকার; কোনো বিকল্প বা পরিপূরক নয়।
লেখক : প্রকাশক ও সম্পাদক-সে অলওয়েজ ট্রুথ।
পাঠকের মতামত:
- ‘লিজ’ এর নামে ক্রমাগত মিথ্যাচার, নেপথ্যে নিয়ম ভেঙে একাধিক দপ্তরের জমি দখল করে দুর্বৃত্তরা
- অর্থনৈতিক শক্তিতে রেমিট্যান্স, অনন্য প্রবাসীদের অবদান
- সোনাতলা রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শনে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক
- দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন
- এবছর ৬০ হাজার মানুষকে বিনামূল্যে চোখের চিকিৎসা দেবে ব্র্যাক ব্যাংক ও ভিশনস্প্রিং
- যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, স্বামীর মৃত্যুদণ্ড
- গোপালগঞ্জে মাদক বিরোধী কর্মশালা
- প্রস্তাবিত বাজেটে সহজলভ্য হবে তামাকপণ্য, হারাবে বাড়তি রাজস্ব আয়ের সুযোগ
- টুঙ্গিপাড়ায় খেলা নিয়ে ঝামেলার জেরে দশম শ্রেণীর ছাত্রকে হাতুড়ি পেটা
- প্রাইভেট বনাম সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা: আস্থার বাস্তবতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
- জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতায় আবৃত্তিতে প্রথম আদিলা
- শিক্ষার্থীদের সথে বিজ্ঞানবিষয়ক সংলাপে জেলা প্রশাসক
- শহর, প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
- গোপালগঞ্জে বেইলি ব্রিজ ভেঙ্গে খালে, ভোগান্তি চরমে
- গোপালগঞ্জে বাস-ট্রাকের ত্রিমুখী সংঘর্ষে নিহত ১
- ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে শান্তিচুক্তির আহ্বান ট্রাম্পের
- হাইকোর্টে মোবাশ্বের আলমের রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ
- রং মিশিয়ে লাল তিলকে কালো করা দুই ব্যবসায়ীকে ৩ লক্ষ টাকা জরিমানা
- মেসির অনবদ্য হ্যাট্রিকে মুগ্ধ ব্রাজিল সমর্থক তারকারাও
- রাজবাড়ীত জামায়াত কর্মী হত্যার পর মরদেহে আগুনের ঘটনায় গ্রপ্তার ৩
- ‘রেলযাত্রা দ্রুত ও নিরাপদ করতে চালু হবে বৈদ্যুতিক ট্রেন’
- বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আগ্রহী জার্মানি
- ‘বগলদাবা বা হট্টগোল নয়, সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবো’
- ‘রাজস্ব ব্যবস্থায় তিন দফা সংস্কার, বাড়াতে হবে উন্নয়ন ব্যয়’
- ‘বাজারে চাল ও নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল’
- ফসলের আবাদ বৃদ্ধি ও কৃষকদের উন্নয়নে মতবিনিময় সভা
- চাঁদপুরে ইয়েস কার্ড পেল ৪০ সাঁতারু
- রাবেয়া ক্লিনিকে আজব শিশুর জন্ম, চাঞ্চল্যের সৃষ্টি
- জেলা প্রেসক্লাব পটুয়াখালীর পূর্ণাঙ্গ কমিটির আত্মপ্রকাশ
- দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন
- বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সুবর্ণচরে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ অফিসে স্মারকলিপি
- বিএনপি নেতাদের সুপারিসে পাল্টে গেলো বিদ্যালয় কমিটির সভাপতির নাম
- ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিএনপির ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ সম্মেলনে সশস্ত্র হামলায় কেন্দ্রীয় নেতা এখন হাসপাতালে
- গোপালগঞ্জে মাদক বিরোধী কর্মশালা
- প্রস্তাবিত বাজেটে সহজলভ্য হবে তামাকপণ্য, হারাবে বাড়তি রাজস্ব আয়ের সুযোগ
- শ্রীমঙ্গলে নিরাপদ সড়ক চাই’র উদ্যোগে শিক্ষার্থী সমাবেশ
- জাফলংয়ে পাথর বোঝাই ৫০ নৌকা জব্দ
- অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার অভিযান
- ভোলায় বিএনপি-বিজেপি সংঘর্ষে রণক্ষেত্র নতুন বাজার, আহত ২৫
- সিলেটে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট
- চাঁদপুর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার নবনির্বাচিত গভর্নিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত
- রামগরুড়ের ছানা
- পলাশবাড়ী সমাজ কল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
- কৃষকস্বার্থে বিদ্যমান সার বিতরণ নীতিমালা বহাল রাখার জোর দাবি
- শ্রীমঙ্গলে জমি দখলকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগ
-1.gif)







