E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য

২০২৬ জুন ২৩ ১৮:০৩:০৮
মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য

ড. মাহরুফ চৌধুরী


দেশের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার জন্য যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের কোন বিকল্প নেই। আধুনিক অর্থনীতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদকে অধিক মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীই একটি দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। এ কারণেই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো শিক্ষাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। ইউনেস্কোসহ বেশ কিছু উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শিক্ষায় বিনিয়োগ দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মানুষের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কেবল নিজেদের জীবনমান উন্নত করে না; তারা জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। অর্থনীতিবিদদের প্রদত্ত ‘মানবসম্পদ তত্ত্ব’ (হিউম্যান ক্যাপিটাল থিওরি) অনুসারে শিক্ষা মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও কর্মক্ষমতাকে উন্নত করে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের অর্থনৈতিক লাভে পরিণত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি অতিরিক্ত বছর একজন ব্যক্তির আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। শিক্ষিত মানুষ সাধারণত উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করে, নতুন প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করতে পারে এবং পরিবর্তিত শ্রমবাজারের সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হয়। ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জাতীয় উৎপাদন, কর রাজস্ব, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির (টেকনোলজি-বেইস্ড নলেজ ইকোনোমি) দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, অটোমেশন, বিগ ডেটা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ অর্থনীতি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বিভিন্ন প্রযুক্তি বিশ্ব শ্রমবাজারের কাঠামোকে আমূল পরিবর্তন করছে। ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ক্রমশ এমন দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, যা প্রচলিত শিক্ষার গণ্ডি অতিক্রম করে সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান, ডিজিটাল সাক্ষরতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আজীবন শেখার সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের নিশ্চয়তার পাশাপাশি গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি এবং দক্ষ শিক্ষক প্রস্তুতির উদ্যোগ। বাংলাদেশের জন্য এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী যথাযথ শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেলে দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। কিন্তু যদি তাদের আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ অর্থনীতি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী জ্ঞান ও দক্ষতায় শিক্ষিত করা না যায়, তাহলে এই সম্ভাবনাময় জনশক্তি বেকারত্ব, অর্ধবেকারত্ব এবং দক্ষতার ঘাটতির কারণে জাতীয় অর্থনীতির জন্য বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। অর্থনীতিতে যাকে ‘জনসংখ্যাগত সুবিধা’ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) বলা হয়, তা তখন ‘জনসংখ্যাগত বোঝা’ (ডেমোগ্রাফিক বার্ডেন)-য় রূপ নিতে পারে।

বার্ষিক জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি কেবল শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রশ্ন নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রশ্ন। যে রাষ্ট্র তার তরুণ জনগোষ্ঠীকে যুগোপযোগী শিক্ষা ও দক্ষতায় সজ্জিত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই আগামী দিনের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। অন্যদিকে শিক্ষায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে ব্যর্থতা একটি জাতির উন্নয়ন সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত করে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ভিত্তিও শিক্ষা। রাষ্ট্রের নাগরিকদের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, তেমনি সেই নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজন সচেতন, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিকসমাজ। শিক্ষা সেই নাগরিকসমাজ গঠনের প্রধান মাধ্যম।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব, অপরাধপ্রবণতা, মাদকাসক্তি, চরমপন্থা, শিশুবিবাহ, লিঙ্গবৈষম্য এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। কারণ শিক্ষা মানুষকে কেবল তথ্য ও দক্ষতা প্রদান করে না; এটি তার বিচারবোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে। ফলে শিক্ষিত ব্যক্তি নিজের জীবন ও পরিবারের কল্যাণে যেমন ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সমাজবিজ্ঞানীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সামাজিক সংহতি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইমের (১৮৫৮-১৯১৭) মতে, শিক্ষা সমাজের অভিন্ন মূল্যবোধ, নৈতিক আদর্শ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ নতুন প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত করে।

অন্যদিকে অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও সামাজিক বঞ্চনা প্রায়শই অপরাধ, সহিংসতা, উগ্রবাদ এবং সামাজিক অস্থিরতার উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। যে সমাজে মানসম্মত শিক্ষা বিস্তৃত হয়, সেখানে নাগরিকরা অধিকতর আইনমান্যকারী, সহনশীল এবং গণতান্ত্রিক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগকে কেবল একটি উন্নয়নমূলক উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা ও জাতীয় স্থিতিশীলতার কৌশল হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত। এ কারণেই শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল কখনোই শিক্ষা খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ইতিবাচক প্রভাব স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবার পরিকল্পনা, নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক সম্প্রীতি, উৎপাদনশীলতা, আইনশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় সেবার গুণগত মান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। একজন শিক্ষিত মা তার সন্তানের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষার বিষয়ে অধিক সচেতন হন; একজন শিক্ষিত নাগরিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন; একজন দক্ষ শিক্ষিত কর্মী অর্থনীতিতে অধিক অবদান রাখেন; আর একজন সচেতন ভোটার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেন। ফলে শিক্ষায় ব্যয়িত প্রতিটি অর্থ রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রতিফলন সৃষ্টি করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কেবল শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করাই চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং সেই বরাদ্দের কার্যকর, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হলো পরিকল্পনার ধারাবাহিকতার অভাব, প্রকল্পভিত্তিক চিন্তার আধিক্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং গুণগত মানের প্রশ্নে দীর্ঘস্থায়ী উদাসীনতা। ফলে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও যদি তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হয়, কিংবা মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে রাষ্ট্রীয় অর্থের নয়ছয়ে শুভঙ্করের ফাঁকিটাই প্রধান হয়ে ওঠে, তবে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করা সম্ভব হবে না। এজন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, নৈতিক ও নাগরিক শিক্ষা শক্তিশালীকরণ এবং প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সমতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বিকাশের পরিবর্তে পরীক্ষাকেন্দ্রিক সনদ অর্জনের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়লেও দক্ষ ও উদ্ভাবনী মানবসম্পদের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে তা কেবল চাকরিপ্রার্থী তৈরি না করে; বরং সমস্যা সমাধানে সক্ষম, প্রযুক্তি-সচেতন, উদ্ভাবনী, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করে। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে কতজন মানুষ চাকরি খুঁজছে তার ওপর নয়; বরং কতজন মানুষ নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে, নেতৃত্ব দিতে এবং সমাজের কল্যাণে ইতিবাচক অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে তার ওপর। অতএব শিক্ষায় অধিক বরাদ্দ এবং সেই বরাদ্দের কার্যকর ব্যবস্থাপনা- এই দুটি বিষয়কে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।

শিক্ষা যদি মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রসংস্কারের ভিত্তি হয়, তবে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া বাংলাদেশের সামনে আর কোনো টেকসই বিকল্প নেই। বর্তমান বিশ্বে যেসব দেশ মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা এবং সুশাসনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে, তাদের উন্নয়নের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তারা প্রায় সবাই শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক জনশক্তির চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত, সম্পদস্বল্প কিংবা ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ অনেক দেশও শিক্ষায় ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে যেসব রাষ্ট্র শিক্ষাকে অবহেলা করেছে, সেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং জাতীয় ঐক্য দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইতিহাস তাই বারবার প্রমাণ করেছে যে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান দ্বারা। টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো শিক্ষা। কারণ শিক্ষাই মানুষকে অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে, নির্ভরশীলতা থেকে আত্মনির্ভরতার দিকে, সংকীর্ণতা থেকে মানবিকতার দিকে এবং বিভক্তি থেকে জাতীয় ঐক্যের দিকে নিয়ে যায়।

একটি রাষ্ট্র যত বেশি শিক্ষিত, দক্ষ এবং সচেতন নাগরিক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি তত বেশি শক্তিশালী হয়। সুতরাং রাষ্ট্রীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি কোনো নির্দিষ্ট খাতকে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছি, যেখানে রাষ্ট্রসংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের ব্যাপক জনআকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কেবল আইন, নীতি বা প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে এই আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী করে তুলতে হলে প্রয়োজন এমন এক নাগরিকসমাজ, যারা জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ। আর সেই নাগরিকসমাজ গড়ে তোলার প্রধান ভিত্তি হলো একটি মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা।

জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছে, তাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষাসংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষার আত্মঘাতী রাজনীতিকরণ, জাতীয় দর্শনের আলোকে শিক্ষানীতির ধারাবাহিক উৎকর্ষ ও প্রয়োগের অভাব, শিক্ষার গুণগত মানের অবনতি, গবেষণায় অনাগ্রহ এবং দক্ষতা উন্নয়নের সীমাবদ্ধতার মত বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূর করে শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ (ন্যূনতম জিডিপির ৫%) নিশ্চিত করতে হবে এবং সেই বরাদ্দের স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে কেবল বিদ্যালয়, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ নয়; এটি মানুষের সম্ভাবনায় বিনিয়োগ, জাতীয় ঐক্যে বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ।

বর্তমান বিশ্বে একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদে নয়, বরং তার মানবসম্পদে নিহিত। একটি দেশের সড়ক, সেতু বা অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার নাগরিকদের জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের ওপর। যে জাতি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়, সেই জাতিই টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সুশাসনের পথে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

রাষ্ট্রসংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন জ্ঞানসমৃদ্ধ, দক্ষ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিকসমাজ। আর সেই নাগরিকসমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি হলো একটি মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা। তাই শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং জনশক্তির চাহিদাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। শিক্ষাকে ব্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষাখাতে ন্যূনতম জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেই অর্থের স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষিত, দক্ষ, সৃজনশীল ও নৈতিক নাগরিকরাই একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে আজ আমরা শিক্ষাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি তার ওপর।

লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।

পাঠকের মতামত:

২৩ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test