E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

শিক্ষায় কারিকুলাম বারবার পরিবর্তন গুরুত্বকে দূরে ঠেলে দেয়

২০২৬ জুলাই ০৩ ১৮:২৩:১১
শিক্ষায় কারিকুলাম বারবার পরিবর্তন গুরুত্বকে দূরে ঠেলে দেয়

নীলকন্ঠ আইচ মজুমদার


স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কতবার কতরকম পরিবর্তন হয়েছে তার জন্য গবেষণা প্রয়োজন। এর হিসাব মেলানো অনেক কঠিন। সময়ের সাথে সাথে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তন হবে এটা স্বাভাবিক তবে সেই পরিবর্তনটা যদি তড়িঘড়ি করে হয় তাহলেতো শংকা থেকেই যা। এই শংকাটাই আজ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। শিক্ষায় যতবার পরিবর্তন সাধিত হয়েছে যে সরকারের আমলে পরবর্তী সরকার এসে তা আর ভালো চোখে দেখেনি। 

স্বাধীনতার পর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেশ কয়েকটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে এবং কমিশন তাদের রিপোর্ট ও পেশ করেছেন কিন্তু কাজের কাজ কি হয়েছে তা বলা কঠিন বিষয়। খুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন (১৯৭৪) মজিদ খান শিক্ষা কমিশন (১৯৮৩) ড. শামসুল হক শিক্ষা কমিশন (১৯৯৭) মনিরুজ্জামান মিয়া শিক্ষা কমিশন (২০০৩) ও বর্তমান জাতীয় শিক্ষা নীতি (২০১০) যা দিয়ে বর্তমান প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা। সবসময় সরকার নিজস্ব লোক দিয়ে এইসব লোক দেখানো শিক্ষা কমিশন করে শিক্ষা ও জাতির সাথে প্রতারণা করে আসছে। বাস্তবিক অর্থে এইসব শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট কখনও বাস্তবায়নের চেষ্টা করেনি সরকার। ব্রিটিশ আমলের মুখস্ততা নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা এখন আমাদের মগজের ভিতর দলবদ্ধভাবে বাস করছে। পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে এটা হয়তো আমাদের কর্তা ব্যক্তিরা এখনও বুঝে উঠতে পারে নাই। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন আমাদের দেশের এইচএসসি পাস বিশ^বাজারে সপ্তম শ্রেণি হয় এবং পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়ের যখন মানদন্ড তৈরি করা হয় তাতে যখন আমাদের কোন অবস্থান থাকে না তখন এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কোন জায়গায় আছে তা নিয়ে আর নতুন করে কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না।

দেশ জুড়ে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় বানানোর ফ্যাক্টরি করার চিন্তা চলছে। শিক্ষা সম্প্রসারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। তবে আমাদের দেখতে হবে, যে বিশ্ববিদ্যালয় আমরা তৈরি করছে তা জাতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এটা আমাদের অনুধাবন করার সময় হয়েছে। বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন করার দুঃসাহস আমার নেই তবে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই শিক্ষা দিনের পর দিন শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে। বর্তমান আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পাঠ্যক্রম যেভাবে রয়েছে তা থেকে জীবনমুখি শিক্ষিত মানুষ তৈরি করা খুব কঠিন। সবচেয়ে বড় কথা হলো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা কারিকুলাম এখনও তৈরি করতে পারছি না আমরা। এর কারণ কি হতে পারে? সবচেয়ে বড় কথা হলো আমরা শিক্ষাকে এখনও ব্যয়ের খাত হিসেবেই দেখে আসছি। এখনও আমরা ভাবছি না যে এটি বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। প্রতি বছর বাজেট এলেই খুব বড় গলায় শুনা যায় এবছর বাজেটে সবচেয়ে বেশি বরাদ্ধ শিক্ষায়। এই শুরু হলো এক শ্রেণির মানুষের চিৎকার চেচামেচি। বিন্তু এই বাজেটের ধরণ কি কোন জায়গায় কিভাবে ব্যয় হচ্ছে তা জানার প্রয়োজনীয়তা বোধ করি না। সবচেয়ে বড় কথা হলো আমরা জিডিপির কত ভাগ শিক্ষায় ব্যয় করছি বা অন্যান্য দেশ কতটুকু ব্যয় করছে তা নিয়ে চিন্তা করছি না।

শিক্ষায় বাজেটের কথা আলোচনা হলে মনে হয় কেবল এ জায়গায় যারা চাকুরি করছেন ফল কেবল তারাই ভোগ করছেন কিন্তু আমরা এটা ভাবি না রাষ্ট্রের শিক্ষার ব্যয়টা সার্বজনীন। তাই এর চিন্তায় সার্বজনীন ছাপ থাকতে হবে। এবার বাজেটের প্রস্তাবনায় শিক্ষা খাতে রাখা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। এ বাজেটে শিক্ষা খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে বাজেটে একাধিক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজির সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে তৃতীয় ভাষা অন্তুর্ভূক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে ইচ্ছুকদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সব কথাই ভালো একথা এটা মানতে হবে। সমস্যাটা হচ্ছে এদেশে ভালো ভালো কথা হলেও তার প্রয়োগ অত্যন্ত জটিল। এই যে সমগ্র দেশে চাহিদা না থাকার পরও এত স্কুল কলেজ সৃষ্টি করা হয়েছে এসব নিয়ে কোন মাথাব্যাথা নেই। রাস্ট্রের প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বিনিষ্ট হচ্ছে এসব জায়গায়। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর চেয়ে শিক্ষক কর্মচারীর সংখ্যা বেশি।

কাগজে পত্রে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেখানো হয়। জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের মাধ্যমে সারাদেশে যে পরিমাণ প্রতিষ্ঠানে অনার্স মাস্টার্স অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী এসব প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা জীবনের মূল্যবান সময় পার করে বের হয়ে যাচ্ছে এবং তার গিয়ে মাঠ পর্যায়ে কি কাজ করছে তা নিয়ে আমরা ভাবছি কি না বা তাদের কোন প্রকার কর্মক্ষেত্র এদেশে তৈরি আছে কি না? অনেক প্রশ্ন আছে কিন্তু উত্তর নেই। কারন উত্তর কেউ জানার চেষ্টা করে না। সারাদেশে উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স পড়ানো হচ্ছে। তারা শিক্ষা সমাপ্ত করে কোন কাজে লাগবে তা নিয়ে কোন গবেষণা নেই। বড়ই জটিল হচ্ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এই সব বিষয় নিয়ে। শুধু এটাই নয় এসব প্রতিষ্ঠান থেকে অনার্স মাস্টার্স করার পর তাদের শিক্ষার মান নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। কারিগরি শাখার প্রতি বারবার গুরুত্বের কথা বলা হলেও বাস্তবে এর অগ্রগতি খুব কম। একেবারে গ্রামীণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানানোর চেষ্টায় মগ্ন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে যাদের মেধা কম তাদের নাম সর্বস্ব তথাকথিত কারিগরি শিক্ষার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় গুলোতে কারিগরি শিক্ষার যেসব কোর্স রাখা হয়েছে তাও ঠিক মতো পাঠ হচ্ছে না। কারিগরি শিক্ষাতে আসার দরকার মেধাবী শিক্ষার্থীদের। কিন্তু বিশ্বাস করতে হবে যে আমাদের কারিগরি শিক্ষাটাকে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষায় রুপান্তর করা হচ্ছে এবং ব্যবসা সংক্রান্ত কোর্সটাকে শেষের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কারিগরি ও ব্যবসা বাণিজ্যে সম্প্রসারণ হলেও এদের জন্য যে পড়াশুনা প্রয়োজন ছিল তা আমরা করতে পারছি না। কারিগরি শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানে যে ধরণের ক্ষেত্র তৈরি করা কথা ছিল তা আমরা তৈরি করছি না। যার ফলে এখন সামাজিকভাবে এ জায়গায় আমাদের কারিগরি শিক্ষা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না। কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ না করা গেলে এদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি দূর্বল হয়ে যাবে। মাঠ পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা কারিগরির বিভিন্ন শাখায় অধ্যায়ণ করার পর উচ্চ মাধ্যমিকে এসে আবার সাধারণ শিক্ষায় চলে আসছে বেশির ভাগ। ঠিক উচ্চ মাধ্যমিকে কারিগরি বিভাগে থাকলেও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার পর আবার চলে যাচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স শাখায়। দেশের কর্তা ব্যক্তিরা এখন বুঝতে পারছে না যে, এইসব অনার্স দিয়ে কি হবে? ৎজীবন জীবিকা নির্বাহের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা জন্য সবচেয়ে বেশি প্রযোজন দক্ষতা অর্জনম

লক শিক্ষা। রাষ্ট্রের যে শিক্ষা ব্যয় হচ্ছে তা সঠিক জায়গায় ব্যয় না হলে শিক্ষাখাতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে খুব নিকটেই। এ জাতিকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে হলে এ শিক্ষার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজার খুঁজতে হবে। ভারসাম্যহীণ জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রুপান্তর করেত হলে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি করতে কবে। কারিগরিও আমাদের দেশে যেভাবে চলছে তাতে এ কারিগরি শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। কারিগরি শিক্ষায় মেধাবীদের জায়গা তৈরি করতে হবে। আর জায়গা তৈরি করার জন্য এ খাতে প্রচুর দক্ষ জনবল প্রয়োজন। প্রয়োজনে দেশের বাইরে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্ব মানের করতে হবে। নতুবা আমরা যতই পরিকল্পনা করি না কেন সব ভেস্তে যাবে। ঘনঘন শিক্ষা ব্যবস্থার কারিকুলাম পরিবর্তন করে কোন লাভ হবে না বরং শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষতি হবে।

লেখক : শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

০৩ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test