E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

জেলা প্রশাসকের নিহত স্কুলছাত্রীর বাড়ি পরিদর্শন

চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: অস্তিত্ব রক্ষার শর্ত, কোনো ছাড় নয়

২০২৬ জুলাই ২৩ ১৯:২৩:১১
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: অস্তিত্ব রক্ষার শর্ত, কোনো ছাড় নয়

মীর আব্দুল আলীম


জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ একটি চরম ও নির্মম সত্য উচ্চারণ করেছেন। বিএনপি সরকারকে সুখে শান্তিতে পাঁচ বছর মেয়াদ পার করতে হলে চাঁদাবাজিকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে; এমনকি এতে দলের কোনো ডাকসাইটে নেতা যুক্ত থাকলেও তাকে ছুড়ে ফেলতে হবে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দুর্নীতির পুরোনো দিন আর নেই, 'বালিশকাণ্ডে'র মতো ঘটনা ঘটিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ এখন আর সম্ভব নয়। স্পিকারের এই বক্তব্য কেবল দলীয় কোনো সতর্কবার্তা নয়, বরং দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় সরকার টিকিয়ে রাখার এবং জনজীবনে স্বস্তি ফেরানোর প্রধান শর্ত।

চাঁদাবাজি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক বিষফোড়া, যা সমাজ ও অর্থনীতিকে ভেতর থেকে দুমড়েমুড়ে দেয়। সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির স্বার্থে চাঁদাবাজি বন্ধে কেন কঠোর পদক্ষেপ অপরিহার্য।

রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই অতীতে সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়েছে অনেক সরকার। দলের প্রভাবশালী বা 'ডাকসাইটে' নেতারা যদি চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন এবং দল তাদের প্রশ্রয় দেয়, তবে সরকারের নৈতিক ভিত্তি নড়ে ওঠে। স্পিকারের কথার সুর ধরে বলা যায়, দলের ভেতরের আগাছা উপড়ে না ফেললে শেষ পর্যন্ত পুরো দলকেই তার মাশুল গুনতে হবে। আজকের বাজারে দ্রব্যমূল্যের চড়া দামের পেছনে পণ্য উৎপাদনের খরচের চেয়েও বড় ভূমিকা রাখছে পরিবহন ও হাটবাজারের চাঁদাবাজি। কারওয়ান বাজার কিংবা মহাসড়কের চাঁদাবাজি আলুর দাম দ্বিগুণ করে দেয়। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারলে মুহূর্তেই নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসবে।

চাঁদাবাজির কারণে দেশে অনেক ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। নতুন উদ্যোক্তারা নিরউৎসাহিত হন। ব্যবসা চালু রাখতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের যে অতিরিক্ত অপ্রকাশিত খরচ বা 'স্পিড মানি' দিতে হয়, তা শেষ পর্যন্ত ব্যবসার স্থায়িত্ব হুমকির মুখে ফেলে এবং কর্মসংস্থান সংকুচিত করে। বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারী এমন দেশে টাকা ঢালবেন না যেখানে স্থানীয় বা রাজনৈতিক ক্যাডারদের প্রতি পদে চাঁদা দিতে হয়। একটি দেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের মূল শর্তই হলো অপরাধ ও চাঁদাবাজিমুক্ত প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা জরুরী। চাঁদাবাজির সঙ্গে সরাসরি অস্ত্রধারী ক্যাডার, গ্যাং কালচার ও মাফিয়া রাজ জড়িত। চাঁদাবাজি বন্ধের ওপর জোর দিলে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটবে, যা সাধারণ নাগরিকদের মনে নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করবে।

যে কোন মূল্যে প্রশাসনিক দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি রোধ করতেই হবে। প্রশাসনিক কেনাকাটায় অনিয়ম বা অস্বাভাবিক খরচ যাকে রূপক অর্থে 'বালিশকাণ্ড' বলা হয় তা বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। স্পিকারের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
পরিবহনে শৃঙ্খলা ও সড়ক নিরাপত্তা সময়ের দাবি।

দেশের প্রতিটি বাস ও ট্রাক টার্মিনাল, এমনকি মহাসড়কেও নিয়মিত চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। এই চাঁদাবাজির রমরমা ব্যবসার কারণেই পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হয় না। পরিবহন চাঁদাবাজির লাগাম টানলে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরবে। ফুটপাত থেকে শুরু করে ছোট দোকানদার সবাইকেই প্রতিদিনের উপার্জনের একটি অংশ মাস্তানদের হাতে তুলে দিতে হয়। এদের চাঁদাবাজির হাত থেকে রক্ষা করা গেলে প্রান্তিক অর্থনীতি সচল ও সমৃদ্ধ হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা

আইনের চোখে সবাই সমান এই নীতি বাস্তবায়ন করতে হলে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার করতে হবে। অপরাধী 'নিজের লোক' হলেও তাকে ছাড় না দেওয়ার মাধ্যমেই মূলত দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তরুণ সমাজকে অপরাধের পথ থেকে ফেরাতে হবে। চাঁদাবাজি ও ফ্রি-মানির সহজ সুযোগ তরুণ ও যুবসমাজকে অপরাধপ্রবণ করে তোলে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে এই চাঁদাবাজি বন্ধ হলে যুবসমাজ প্রোডাক্টিভ বা উৎপাদনশীল কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে বাধ্য হবে।

এদেশে বাড়ি নির্মাণ বা রিয়েল এস্টেট খাতে রড, সিমেন্ট সরবরাহ থেকে শুরু করে জমিতে হাত দেওয়ার আগেই চাঁদাবাজদের টাকা গুনতে হয়। এর ফলে আবাসন খাতে খরচ হু হু করে বাড়ে। এই খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ হলে মধ্যবিত্তের মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়া সহজ হবে। সেবা খাত ও সরকারি দপ্তরে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। লাইসেন্স গ্রহণ, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ কিংবা অন্যান্য সরকারি সেবা নিতে গেলে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে যে চাঁদাবাজি ও ঘুষের লেনদেন হয়, তা সাধারণ নাগরিকদের চরম ভোগান্তিতে ফেলে। স্পিকারের নীতি অনুসরণ করে এসব সেবা দুর্নীতিমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করতে হবে। চাঁদাবাজরা একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট তৈরি করে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয় এবং নতুনদের প্রতিযোগিতায় আসতে বাধা দেয়। চাঁদাবাজি বন্ধ হলে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং সাধারণ ভোক্তারা সঠিক দামে মানসম্মত সেবা ও পণ্য পাবেন। তৃণমূল পর্যায়ে ইউপি সদস্য, কাউন্সিলর বা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় তৈরি হওয়া চাঁদার হাট বন্ধ করতে না পারলে সরকারের কেন্দ্র থেকে নেওয়া কোনো ভালো পদক্ষেপই বাস্তবায়িত হবে না। তৃণমূলে কঠোর বার্তা দিলে পুরো দেশেই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।

রপ্তানি খাত ও পোশাক শিল্পে স্থায়িত্ব করতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্পসহ প্রধান প্রধান রপ্তানি খাতে কাঁচামাল পরিবহন বা ঝুট ব্যবসা কেন্দ্র করে স্থানীয় ক্যাডারদের দৌরাত্ম্য দেখা যায়। রপ্তানি খাতকে চাঁদাবাজিমুক্ত করতে না পারলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। বিভিন্ন ঘাট, টার্মিনাল ও সরকারি হাটের ইজারার নামে মূল সরকারি ফি-র চেয়ে অতিরিক্ত চাঁদা তোলার মহোৎসব চলে। ইজারাদারি প্রক্রিয়ায় সংস্কার এবং ডিজিটাল ফি আদায়ের মাধ্যমে চাঁদাবাজির পথ রুদ্ধ করা জরুরি।
পুলিশ প্রশাসনকে রাজনীতিকরণমুক্ত করাতে হবে। চাঁদাবাজি দমনে পুলিশের বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক চাপে পুলিশ অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ে বা চাঁদাবাজির ভাগ পায়। দলমত নির্বিশেষে অপরাধীর বিরুদ্ধে পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে চাঁদাবাজি দ্রুত কমে যাবে। দীর্ঘদিনের ক্ষমতার অপব্যবহার ও চাঁদাবাজির কারণে আমজনতার মনে রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি চরম ক্ষোভ তৈরি হয়। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতির প্রতি হারানো আস্থা ফেরাতে পারে। প্রযুক্তির যুগে এখন ক্যাশ টাকা ছাড়াও মোবাইল ব্যাংকিং বা নানা ডিজিটাল মাধ্যমে চাঁদাবাজি ছড়াচ্ছে। প্রযুক্তিভিত্তিক অনুসন্ধান চালিয়ে আধুনিক চাঁদাবাজদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

এদিকে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ঋণ নেওয়া এবং তা ফেরত না দিয়ে চাঁদাবাজির স্টাইলে ব্যাংকিং খাতকে শোষণের দিন শেষ করতে হবে। প্রশাসনিক কেনাকাটা বা আর্থিক ক্ষেত্রে যে কোনো অনিয়ম প্রতিরোধ করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য।এদিকে সরকারি উন্নয়ন কাজের টেন্ডার হাঁকানো থেকে শুরু করে কাজ পাওয়ার পর নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দাবি করা বাংলাদেশের এক দীর্ঘদিনের ব্যাধি। টেন্ডারবাজি বন্ধ হলে অবকাঠামোগত কাজের মান উন্নত হবে এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে। চাঁদাবাজ ও ক্যাডাররা যখন সমাজের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তখন সৎ ও মেধাবীরা কোনঠাসা হয়ে পড়ে। চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে পারলে সৎ, মেধাভিত্তিক ও কর্মমুখী সংস্কৃতির পুনর্বাসন সম্ভব হবে।
সরকার পতনের প্রধান অনুঘটক হয়ে দাঁড়ায় মানুষের জমতে থাকা ক্ষোভ। স্পিকারের বক্তব্যের সারমর্ম হলো যদি বিএনপি সরকার পাঁচ বছরের পূর্ণ মেয়াদ নিরাপদে ও সাফল্যের সঙ্গে পার করতে চায়, তবে চাঁদাবাজির এই অদৃশ্য বিষাক্ত হাতটি এখনই কেটে ফেলতে হবে।

চাঁদাবাজির প্রভাব কেবল একটি রাজনৈতিক দল বা সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, এর মাশুল গুণতে হয় পুরো দেশের সাধারণ জনগণকে। স্পিকারের বক্তব্য কেবল কথার কথায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এটিকে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ক্ষমতার মসনদ নিরাপদ রাখতে এবং দেশে সুশাসন উপহার দিতে হলে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি বাস্তবায়ন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। দল কিংবা ক্ষমতার ঢাল ব্যবহার করে কেউ যেন পার না পায় সরকারকে সেই কঠোর বার্তাটি এখনই দিতে হবে।

লেখক :সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

পাঠকের মতামত:

২৩ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test