E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

প্রধানমন্ত্রী, আলিফের পাশে যান 

২০২৬ জুলাই ৩০ ১৯:০৩:২৭
প্রধানমন্ত্রী, আলিফের পাশে যান 

আবদুল হামিদ মাহবুব


ইতিহাসের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। সে কখনো মুছে যায় না। সময়ের ধুলোর নিচে চাপা পড়ে থাকে, কিন্তু সুযোগ পেলেই আবার সামনে এসে দাঁড়ায়। তখন মানুষ পুরোনো ঘটনার সঙ্গে নতুন ঘটনার মিল খুঁজে। বিচার করে। প্রশ্ন তোলে। উত্তরও খোঁজে।

এক সময় দেশের মানুষ দেখেছিল বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বাসার সামনে বালুভর্তি ট্রাক এনে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়েছিল। চারপাশ ঘিরে রাখা হয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে। তিনি বের হতে চেয়েছিলেন। কর্মসূচিতে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। সেদিন তিনি ক্ষোভে পুলিশের একজন সদস্যের সঙ্গে তর্ক করেছিলেন। কঠিন ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। সেই দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছিল গোটা দেশ। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, একজন রাজনৈতিক নেতাকে এভাবে আটকে রাখা কি গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে? আবার অনেকেই নীরব ছিলেন। ইতিহাস সেই নীরবতাও লিখে রেখেছে।

সময় বদলেছে। সরকার বদলেছে। রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলেছে। কিন্তু ব্যারিকেড যেন বদলায়নি। হবিগঞ্জের পথে এনসিপির নেতাকর্মীদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে রাস্তার ওপর ট্রাক দাঁড় করিয়ে ব্যারিকেড তৈরির ঘটনা নতুন করে সেই পুরোনো স্মৃতিকেই ফিরিয়ে আনল। পুলিশের বাধা ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে উত্তেজনা ছিল। বাকবিতণ্ডা ছিল। কিন্তু এবার দৃশ্যটি ভিন্ন ছিল। তারা ফিরে যায়নি। রাত নেমেছে। ক্লান্তি এসেছে। তবুও তারা এগিয়েছে। শেষ পর্যন্ত হবিগঞ্জে পৌঁছেছে। সেখানে গিয়ে আগের দিনের হামলার ঘটনায় থানায় বসেই মামলা করেছে। এই দুটি ঘটনার তুলনা আমি করব না। সেই বিচার দেশের মানুষের ওপরই ছেড়ে দিলাম। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে নিরপেক্ষ বিচারক হলো জনগণ।

কিন্তু রাজনীতির এই সংঘর্ষের ভেতর সবচেয়ে বড় হারটি হয়েছে একজন সাধারণ মানুষের। তার নাম আলিফ। সে কোনো মন্ত্রী নয়। কোনো প্রভাবশালী নেতা নয়। সে একজন তরুণ। একজন স্বপ্নবাজ ছেলে। যে হয়তো প্রতিদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে শুধু পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে কাজে বের হতো। আজ সেই ছেলেটির একটি চোখ আর পৃথিবী দেখতে পাবে না। কী ভয়ংকর এই বাস্তবতা!

একটি চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি অঙ্গ হারানো নয়। একটি স্বপ্ন নিভে যাওয়া। একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাওয়া। জানা গেছে, আলিফই ছিল তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। ঘরে আছেন প্রতিবন্ধি বাবা বৃদ্ধ মা। বোনদের বিয়ে হয়েগেছে। বড় এক ভাই আছে, তারও বুদ্ধিশুদ্ধি নেই। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সে নাকি বারবার একটি কথাই বলছিল; “আমার পরিবারের কী হবে?”

আলিফের এই প্রশ্নের উত্তর কার কাছে আছে? রাষ্ট্র কি দিতে পারবে? রাজনীতি কি দিতে পারবে?ক্ষমতা কি দিতে পারবে? টাকা কি একটি চোখ ফিরিয়ে দিতে পারবে? কখনোই ফিরিয়ে দিতে পারবে না।

শোনা গেছে, এনসিপির নেতারা তাকে আশ্বস্ত করেছেন, তারা তার পাশে থাকবেন। এই মানবিক প্রতিশ্রুতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় দায় রাষ্ট্রের। কারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। যে বা যারা এই নৃশংস ঘটনার জন্য দায়ী, তারা যে দলেরই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনতেই হবে। বিচারহীনতা কখনো শান্তি আনে না। বিচারহীনতা শুধু নতুন সহিংসতার জন্ম দেয়।

আমি মনে করি, এই মুহূর্তে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানবিক উদ্যোগ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর উচিত আলিফের পাশে দাঁড়ানো। হাসপাতালের বিছানায় গিয়ে তার মাথায় হাত রেখে বলা; “তুমি একা নও। রাষ্ট্র তোমার পাশে আছে।” এই একটি দৃশ্য হাজারো বক্তৃতার চেয়েও শক্তিশালী বার্তা দিতে পারে। একই সঙ্গে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা জরুরি। কারণ মানুষের চোখে সরকারের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ন্যায়বিচার।

অনেকে হয়তো বলবেন, প্রতিটি ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর কথা বলা কি জরুরি? আমার উত্তর; সব সময় নয়। কিন্তু যখন মানুষের মনে প্রশ্ন জমে, যখন স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি কিংবা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়, তখন দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের একটি মানবিক অবস্থান জাতিকে আশ্বস্ত করে। নেতৃত্বের প্রকৃত শক্তি এখানেই।

আমরা আর বিভক্ত বাংলাদেশ চাই না। আমরা চাই না প্রতিটি রাজনৈতিক মতভেদের শেষ হোক লাঠি, ইট, রক্ত আর হাসপাতালে। আমরা চাই এমন একটি দেশ, যেখানে ব্যারিকেড দিয়ে মানুষের পথ রোধ করা হবে না; যুক্তি দিয়ে মতের মোকাবিলা করা হবে। যেখানে বিরোধী মতকে শত্রু নয়, গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখা হবে। যেখানে ক্ষমতার অহংকার নয়, মানুষের জীবন হবে সবচেয়ে মূল্যবান।

বাংলাদেশের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে, তারা অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে না। ১৯৭১ সালে করেছে। ১৯৯০ সালে করেছে। সাম্প্রতিক ২০২৪ সালেও করেছে। তাই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়াই সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা। কেউ যদি আবার ক্ষমতার মোহে মানুষের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করে, মানুষ একদিন তারও জবাব দেবে।

একটি অন্ধ হয়ে যাওয়া চোখ আজ আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে রেখেছে। সেই আয়নায় আমরা কী দেখব; প্রতিশোধ, নাকি মানবতা? ব্যারিকেড, নাকি গণতন্ত্র? নীরবতা, নাকি ন্যায়বিচার? সিদ্ধান্ত আমাদেরই। কারণ দেশ কোনো একক দলের নয়। দেশ আমাদের সবার। আর এই দেশকে এগিয়ে নিতে হলে ব্যারিকেড নয়, দরকার বিশ্বাসের সেতু; প্রতিহিংসা নয়, দরকার মানবতার হাত।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।

পাঠকের মতামত:

৩০ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test