E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

রক্তের ইতিহাসকে সম্মান, প্রতিহিংসার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান

২০২৬ আগস্ট ০৪ ১৮:০৪:১৯
রক্তের ইতিহাসকে সম্মান, প্রতিহিংসার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান

মীর আব্দুল আলীম


ইতিহাস কখনো ক্ষমতাবানদের ইচ্ছায় লেখা যায় না; ইতিহাস লিখে ছাত্র জনতা, কৃষক, সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম, সাহস এবং রক্ত। একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ইতিহাস, আর সেই ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ হলো সেই মানুষগুলো, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ যেমন জাতির স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে, তেমনি সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলনও দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা, সময় আলাদা এবং উদ্দেশ্যের দিক থেকেও পার্থক্য রয়েছে; কিন্তু একটি বিষয়ে তারা এক ও অভিন্ন উভয় ক্ষেত্রেই মানুষ জীবন দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে, স্বপ্ন দিয়েছে।

তাই মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা যেমন ইতিহাসের প্রতি অবিচার, তেমনি জুলাই আন্দোলনে প্রাণ হারানো মানুষের আত্মত্যাগকেও উপেক্ষা করা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে আরেকটি সত্যও আমাদের মনে রাখতে হবে, যে কোনো আন্দোলনের পর বিচার হবে আইনের ভিত্তিতে, প্রতিশোধের ভিত্তিতে নয়। অপরাধী শাস্তি পাবে, কিন্তু নিরপরাধ মানুষ যেন কোনোভাবেই বিচারহীনতার বা মিথ্যা মামলার শিকার না হন। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

ইতিহাসে যে রক্ত ঝরে, যে আত্মত্যাগ জাতির বিবেককে নাড়া দেয়, তাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কারণে মুছে ফেলা যায় না। তবে এটিও সমানভাবে সত্য যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রের জন্ম, স্বাধীনতার ভিত্তি এবং জাতীয় পরিচয়ের মূল উৎস হলো মহান মুক্তিযুদ্ধ। জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের সমসাময়িক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ সেই মহান সংগ্রাম, যার মধ্য দিয়েই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করেছে। তাই এই দুটি ঘটনাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং ভিন্ন সময়ের ভিন্ন বাস্তবতার ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে মূল্যায়ন করাই একটি দায়িত্বশীল জাতির পরিচয়।

বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটি কোনো কূটনৈতিক চুক্তি, রাজনৈতিক সমঝোতা কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সিদ্ধান্তে সৃষ্টি হয়নি; এটি জন্ম নিয়েছে এক মহান ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের আত্মত্যাগ, অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার অসীম সাহস, মা-বোনের ত্যাগ, নির্যাতিত মানুষের অশ্রু এবং সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থনের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই স্বাধীনতা। সেই কারণে মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচেতনা, জাতীয় পরিচয়, সাংবিধানিক অস্তিত্ব এবং জাতীয় আত্মমর্যাদার অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি। এই সত্যকে অস্বীকার করা মানে কেবল ইতিহাসকে অস্বীকার করা নয়, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।

মতাদর্শের পার্থক্য থাকতে পারে, রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে, গবেষণায় নতুন তথ্য ও নতুন বিশ্লেষণ যুক্ত হতে পারে এসবই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক সত্য, এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অসামান্য অবদানকে অস্বীকার বা খাটো করার কোনো সুযোগ নেই। ইতিহাসকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য বিকৃত করা, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগকে অবমূল্যায়ন করা কিংবা নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার যে কোনো প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে। যে জাতি তার জন্মের ইতিহাসকে অস্বীকার করে, সে জাতি ভবিষ্যতের পথও হারিয়ে ফেলে। তাই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ, মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযোগ্য মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস তুলে ধরা রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রতিটি নাগরিকের যৌথ দায়িত্ব।

জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে। এই আন্দোলনে অসংখ্য ছাত্র, তরুণ, সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক জীবন হারিয়েছেন, অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন, আবার অনেকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বহু পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়ে আজও শোক বহন করছে, অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বা দীর্ঘমেয়াদি কষ্টের জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এসব আত্মত্যাগ, বেদনা ও ত্যাগের ইতিহাস জাতির সামষ্টিক স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে। ইতিহাসের বিচারেও এই ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়িত হবে। যে রক্ত জাতির বিবেককে নাড়া দেয়, যে আত্মত্যাগ মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে, তাকে কখনো অবহেলা বা অস্বীকার করা যায় না। ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের মতো জুলাই আন্দোলনও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা, বিশ্লেষণ এবং আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

কোনো রাজনৈতিক মতভেদ, আদর্শগত পার্থক্য কিংবা ক্ষমতার পরিবর্তন ইতিহাসের এই বাস্তবতাকে মুছে দিতে পারে না। যারা দেশের একটি সংকটময় সময়ে জীবন দিয়েছেন কিংবা চরম ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের আত্মত্যাগকে অসম্মান করার নৈতিক অধিকার কারও নেই। একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি তখনই পরিপক্বতার পরিচয় দেয়, যখন সে ইতিহাসের প্রতিটি আত্মত্যাগকে যথাযথ সম্মান জানায় এবং কোনো ত্যাগকে অন্য ত্যাগের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করায় না। মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি, আর জুলাই আন্দোলন সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় দুটির প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য ও সময় আলাদা হলেও উভয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, রক্ত, বেদনা এবং আত্মত্যাগ। তাই এই দুটি অধ্যায়কে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বিভাজনের রাজনীতি করার পরিবর্তে, উভয় ইতিহাস থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করে গণতন্ত্র, জবাবদিহি, মানবাধিকার, সহনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং আইনের শাসনকে আরও সুদৃঢ় করাই হওয়া উচিত আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার। কারণ ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা বিভেদ সৃষ্টি করা নয়; বরং জাতিকে আরও সচেতন, আরও মানবিক এবং আরও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরী।

রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিচারব্যবস্থা। যদি প্রকৃত অপরাধী শাস্তি না পায়, তাহলে অপরাধের সংস্কৃতি জন্ম নেয়। আবার যদি নিরপরাধ মানুষ মিথ্যা অভিযোগে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে বাধ্য হন, তাহলে মানুষের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট হয়। জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে বহু মামলা হয়েছে। এসব মামলার প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া উচিত। যেখানে শক্ত প্রমাণ রয়েছে, সেখানে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ হওয়া উচিত। কিন্তু যেখানে প্রমাণ দুর্বল, যেখানে নিরপরাধ মানুষ রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়, সেখানে ন্যায়বিচারের স্বার্থেই সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনসম্মত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি নিরপরাধ মানুষের প্রতি অন্যায় মানে রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে যাওয়া।

ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আবেগ অনেক সময় বিচারকে প্রভাবিত করে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি আবেগের পরিবর্তে আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত না হয়, তাহলে প্রতিহিংসার চক্র কখনো শেষ হয় না। আজ একজন অন্যায়ের শিকার হলে, আগামীকাল অন্য কেউ একই পরিণতির মুখোমুখি হতে পারেন। একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় হলো সেখানে আইন ব্যক্তি, দল কিংবা মতাদর্শ দেখে কাজ করে না। বিচার হয় প্রমাণের ভিত্তিতে, আদালতের মাধ্যমে এবং ন্যায়ের নীতিতে। তাই কোনো আন্দোলনের সাফল্য প্রতিপক্ষকে হয়রানির মধ্যে নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্যে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক সমান আইনি সুরক্ষা পান।

যে সমাজ দীর্ঘদিন রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে যায়, সেখানে বিভাজন দূর করতে শুধু বিচারই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সত্যকে স্বীকার করা, মানবিকতা প্রদর্শন করা এবং জাতীয় পুনর্মিলনের পরিবেশ তৈরি করা। রাষ্ট্রের উচিত এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে নয়, গণতান্ত্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখা হবে। জাতীয় ঐক্য কখনো ইতিহাস মুছে দিয়ে গড়ে ওঠে না। বরং ইতিহাসকে সত্যের আলোয় গ্রহণ করে, সব আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে এবং বিচারব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ রেখে জাতিকে সামনে এগিয়ে নিতে হয়। এটাই দীর্ঘমেয়াদে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ভিত্তি।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের ইতিহাসে যে রক্ত ঝরেছে মহান মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে কিংবা জুলাই আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহে সেই রক্তের প্রতি সম্মান জানানো আমাদের নৈতিক ও জাতীয় দায়িত্ব। ইতিহাসকে অস্বীকার করে কোনো জাতি টিকে থাকতে পারে না। একইভাবে বিচারকে প্রতিহিংসার হাতিয়ার বানিয়েও একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণ সম্ভব নয়।

আজ প্রয়োজন এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যথাযোগ্য মর্যাদা পাবে, জুলাই আন্দোলনের আত্মত্যাগও সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হবে; যেখানে প্রকৃত অপরাধী আইনের কঠোর বিচারের মুখোমুখি হবে, আবার নিরপরাধ মানুষ দ্রুত ন্যায়বিচার ও মুক্তি পাবেন। এটাই হবে শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা, এটাই হবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান, এটাই হবে জুলাই আন্দোলনের আত্মত্যাগের সার্থকতা।

রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ইতিহাসকে সম্মান জানিয়ে, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে এবং ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতি হিসেবে গ্রহণ করেই বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী, আরও মানবিক এবং আরও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। ইতিহাস আমাদের বিভক্ত করার জন্য নয়; ইতিহাস আমাদের শেখায় দেশের স্বার্থে সত্যের পাশে দাঁড়াতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং ন্যায়বিচারের পতাকা সমুন্নত রাখতে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

পাঠকের মতামত:

০৪ আগস্ট ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test