E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

ভারসাম্যের বাইরে: শেষ পর্ব

ট্রানজিট নোড থেকে নিয়ম-প্রভাবক: বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত শক্তি

২০২৬ আগস্ট ২০ ১৮:২৮:১১
ট্রানজিট নোড থেকে নিয়ম-প্রভাবক: বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত শক্তি

মো. ইমদাদুল হক সোহাগ


২০২৫ সালের আগস্টে পাঁচ পর্বের প্রথম ধারাবাহিকটি যখন শুরু হয়েছিল, তখন বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল একটি পরিচিত প্রশ্ন: বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতামূলক স্বার্থের মধ্যে দিয়ে কীভাবে ঢাকা তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রাখবে?

দ্বিতীয় পাঁচ পর্বের এই ধারাবাহিকের সমাপ্তিতে এসে সেই প্রশ্নটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন আর কেবল বহিরাগত শক্তিগুলোর মধ্যে কতটা দক্ষতার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়, তার ওপর নির্ভর করবে না। ক্রমেই তা নির্ভর করবে এমন জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর, যার কারণে অন্য রাষ্ট্র ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা করা অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মূল্যবান হয়ে ওঠে।

এই পরিবর্তনের দুটি দিক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো বা বিএসডব্লিউ-এর বিকাশ। একটি ভৌত অবকাঠামো, অন্যটি ডিজিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো। দুটিকে সমন্বিতভাবে দেখা গেলে একটি নতুন ধরনের জাতীয় শক্তির সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়: অবকাঠামোর মাধ্যমে দর-কষাকষির সক্ষমতা।

ভারসাম্য থেকে দর-কষাকষিতে

বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিয়মভিত্তিক আঞ্চলিক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে এতে স্থিতিস্থাপক সরবরাহব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নীতিগত অবস্থানকে বাস্তব ক্ষমতায় রূপান্তর করার প্রশ্নটি আরও কঠিন। শুধু কোনো পক্ষ বেছে না নেওয়া কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা দেয় না। একটি দেশের স্বায়ত্তশাসন তখনই অধিক টেকসই হয়, যখন তার এমন সম্পদ ও সক্ষমতা থাকে, যা অন্য রাষ্ট্র এবং বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছে কার্যকর, নির্ভরযোগ্য এবং ক্রমেই উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে ওঠে।

মাতারবাড়ী সেই ধরনের একটি সম্পদে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে মাতারবাড়ী নির্মাণাধীন। এর লক্ষ্য বাংলাদেশের সামুদ্রিক যোগাযোগের দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অর্থাৎ গভীরতা ও বড় জাহাজ পরিচালনার সক্ষমতার ঘাটতি, কমিয়ে আনা। এর ফলে ভবিষ্যতে বড় আকারের কনটেইনারবাহী জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশের বন্দরে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে এবং তৃতীয় দেশের বন্দরনির্ভর ট্রান্সশিপমেন্টের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে।

তবে এখানেই বাস্তবতার সীমারেখা গুরুত্বপূর্ণ। মাতারবাড়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে কলম্বো, সিঙ্গাপুর কিংবা ভারতের প্রতিষ্ঠিত বন্দরগুলোকে প্রতিস্থাপন করবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যবস্থা শুধু গভীরতার ওপর নির্ভর করে না; পণ্য পরিবহনের পরিমাণ, নৌপথ, শুল্ক, বন্দর দক্ষতা, পশ্চাৎভূমির সংযোগ, সময়নিষ্ঠতা এবং দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মাতারবাড়ীর কৌশলগত মূল্য তাই অন্যত্র। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি অতিরিক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য বাণিজ্যিক বিকল্প তৈরি করতে পারে। আর কোনো বিকল্প যখন বাস্তব বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে, তখন সেটিই দর-কষাকষির পরিসর তৈরি করে।

তবে এর জন্য শুধু বন্দর নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রতিযোগিতামূলক শুল্ক, দ্রুত ও পূর্বানুমেয় শুল্ক ব্যবস্থাপনা, নির্ভরযোগ্য বন্দর পরিচালনা, দক্ষ লজিস্টিকস এবং শক্তিশালী পশ্চাৎভূমি-সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থাৎ, বন্দরকে অবকাঠামো থেকে বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় এবং বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করতে হবে।

ডিজিটাল মাত্রা

এই রূপান্তরের দ্বিতীয় অংশটি তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান, কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ। এর কেন্দ্র রয়েছে শুল্ক ও বাণিজ্য প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরে।

বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো বা বিএসডব্লিউ-এর উদ্দেশ্য হলো আমদানি-রপ্তানি ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিভিন্ন সনদ, লাইসেন্স ও অনুমোদনের প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা। সরকারি নথি অনুযায়ী, বিএসডব্লিউ ইতিমধ্যে চালু হয়েছে এবং বিভিন্ন সনদ, লাইসেন্স ও অনুমতিদাতা সংস্থার সঙ্গে এর একীভূতকরণ এগিয়ে চলছে।

এটি কেবল প্রশাসনিক সুবিধার বিষয় নয়। একটি বন্দর ভৌত পণ্য পরিবহন করে। একটি একক-জানালা ব্যবস্থা সেই পণ্য চলাচলের অনুমোদন, তথ্যপ্রবাহ ও নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিচালনা করে। এই দুটি সক্ষমতা যখন সমন্বিতভাবে কাজ করে, তখন বাংলাদেশ শুধু একটি বন্দর নয়, একটি ভৌত-ডিজিটাল বাণিজ্যদ্বার গড়ে তুলতে পারে।

আধুনিক আঞ্চলিক সংযোগ এখন আর কেবল জাহাজ, সড়ক ও বন্দরের ওপর নির্ভর করে না। কোন গতিতে, কতটা স্বচ্ছভাবে এবং কতটা পূর্বানুমেয়ভাবে বাণিজ্য পরিচালিত হবে, সেটিও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার অংশ।

সুতরাং ভবিষ্যতের বন্দর প্রতিযোগিতা কেবল গভীরতা ও ক্রেনের সংখ্যার প্রতিযোগিতা নয়; এটি হবে তথ্য, প্রক্রিয়া, সময় এবং নির্ভরযোগ্যতার প্রতিযোগিতাও।

বিমসটেকের বাস্তবতা ও বাংলাদেশের সুযোগ

২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল বিমসটেক সামুদ্রিক পরিবহন সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০২৬ সালের মে মাসে এটি কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরীয় সামুদ্রিক সংযোগের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে: চুক্তিটি প্রথম পর্যায়ে ভুটান, ভারত, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের মধ্যে কার্যকর হয়েছে; বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা তখনও এর কার্যকর অংশীজন ছিল না।

এই বাস্তবতাকে বাংলাদেশের জন্য শুধু পিছিয়ে পড়ার সংকেত হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। বরং এখানেই একটি কৌশলগত প্রশ্ন তৈরি হয়: ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সামুদ্রিক একীভূতকরণে বাংলাদেশ কী ধরনের অবস্থান তৈরি করতে পারে?

বাংলাদেশের উচিত সংযোগকে শুধু প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন হিসেবে না দেখে পারস্পরিক সুবিধার প্রশ্ন হিসেবে দেখা।

প্রতিবেশী অর্থনীতিগুলো যদি বাংলাদেশের বন্দর, সড়ক, রেল, লজিস্টিকস ও ডিজিটাল বাণিজ্য অবকাঠামো থেকে ক্রমবর্ধমান সুবিধা গ্রহণ করে, তাহলে সেই সংযোগের বিনিময়ে বাংলাদেশেরও প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত হওয়া উচিত।

এর মধ্যে থাকতে পারে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইলেকট্রনিক নথিপত্র, দ্রুত শুল্ক-তথ্য বিনিময়, পারস্পরিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থা, স্বচ্ছ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং পূর্বানুমেয় ট্রানজিট প্রক্রিয়া।

এখানে বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত অন্য রাষ্ট্রের ওপর কোনো নির্দিষ্ট মডেল চাপিয়ে দেওয়া নয়। বরং বিভিন্ন জাতীয় ব্যবস্থার মধ্যে পারস্পরিক সামঞ্জস্য তৈরি করা।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আঞ্চলিক একীভূতকরণ সফল হয় তখনই, যখন সংযোগ শুধু ভৌগোলিক নয়, প্রাতিষ্ঠানিকও হয়ে ওঠে।

অবকাঠামো থেকে নিয়ম-প্রভাব

কৌশলগত যুক্তিটি সরল। উন্নত অবকাঠামো বাণিজ্যিক আকর্ষণ বাড়ায়। বাণিজ্যিক আকর্ষণ বাড়লে ব্যবহারের চাহিদা বাড়ে। চাহিদা বাড়লে দর-কষাকষির পরিসর বিস্তৃত হয়। আর সেই দর-কষাকষির ক্ষমতা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারলে আঞ্চলিক সংযোগ পরিচালনাকারী মানদণ্ড ও প্রক্রিয়া নির্ধারণে বাংলাদেশের প্রভাবও বাড়তে পারে।

এখানেই অবকাঠামো ও ভূ-রাজনীতির সংযোগ। মাতারবাড়ী দেয় ভৌত সক্ষমতা। বিএসডব্লিউ দেয় ডিজিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। কূটনীতি এই দুই সক্ষমতাকে আঞ্চলিক অংশীদারিত্বের সঙ্গে যুক্ত করার রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে পারে।

তাই বাংলাদেশের অবকাঠামোকে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এগুলোকে কৌশলগত দর-কষাকষির সম্পদ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। তবে উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার ভারসাম্যও জরুরি।

ঢাকা একতরফাভাবে বিমসটেকের নিয়ম নির্ধারণ করতে পারবে না। কোনো আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থাকেও প্রতিষ্ঠিত রুট পরিত্যাগে বাধ্য করতে পারবে না। একটি নতুন বন্দর নির্মাণ করলেই ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি হবে, এমন ধারণাও অতিরঞ্জিত।

বাংলাদেশ যা করতে পারে, তা হলো তার অবকাঠামোকে এতটাই দক্ষ, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য করে তোলা যে আঞ্চলিক সংযোগের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে আলোচনা হলে বাংলাদেশকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এটাই একটি ট্রানজিট নোড এবং একটি নিয়ম-প্রভাবক মধ্যম শক্তির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাই চূড়ান্ত পরীক্ষা

এই কৌশলের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়তো দেশের বাইরে নয়, দেশের ভেতরে। প্রাতিষ্ঠানিক খণ্ডীকরণ বাংলাদেশের অন্যতম বড় দুর্বলতা। পররাষ্ট্রনীতি, বন্দর ব্যবস্থাপনা, শুল্ক প্রশাসন, বাণিজ্যনীতি এবং ডিজিটাল বাণিজ্য অবকাঠামো যদি বিচ্ছিন্ন নীতিগত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়, তাহলে কোনো একক অবকাঠামোই তার পূর্ণ কৌশলগত মূল্য দিতে পারবে না।

তাই একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় কাঠামো বিবেচনা করা যেতে পারে, যার কাজ হবে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বন্দর, শুল্ক, ট্রানজিট, ডিজিটাল বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগ বিষয়ে বাংলাদেশের একটি সমন্বিত অবস্থান তৈরি করা।

এর কাজ প্রতীকী হওয়া উচিত নয়। বরং নির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে অগ্রগতি পরিমাপ করা দরকার: বন্দর-প্রক্রিয়াকরণের সময়, শুল্ক-ছাড়ের সময়, ডিজিটাল নথিপত্রের ব্যবহার, ট্রানজিটের পূর্বানুমেয়তা, লজিস্টিক ব্যয় এবং আন্তঃদেশীয় তথ্য বিনিময়ের সক্ষমতা।

কারণ অবকাঠামোগত শক্তি শেষ পর্যন্ত পরিমাপ করা হয় কংক্রিটের পরিমাণ দিয়ে নয়, ব্যবহারকারীর সময়, ব্যয় ও অনিশ্চয়তা কতটা কমানো গেল তা দিয়ে।

দুর্বলতা থেকে সক্ষমতার পথে

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ভূগোলকে মূলত দুর্বলতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে: জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা একটি বদ্বীপ এবং বৃহত্তর শক্তিগুলোর মাঝখানে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। কিন্তু ভূগোল ভাগ্য নির্ধারণ করে না। কৌশলগত অবকাঠামো ভূগোলের অর্থ বদলে দিতে পারে।

মাতারবাড়ী বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগরের একটি সম্ভাব্য ভৌত প্রবেশদ্বারে পরিণত করতে পারে। বিএসডব্লিউ দেশের ডিজিটাল বাণিজ্য কাঠামোকে আরও কার্যকর করতে পারে। আর বিমসটেকের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক সহযোগিতা এমন একটি আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট তৈরি করছে, যেখানে ভবিষ্যৎ সংযোগের নিয়ম ও প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশ আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।

তবে এই কৌশলের লক্ষ্য বঙ্গোপসাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা নয়। লক্ষ্য আরও বাস্তবসম্মত এবং সম্ভবত আরও গুরুত্বপূর্ণ: বাংলাদেশ যেন আঞ্চলিক সংযোগের একজন ব্যবহারকারী বা নিষ্ক্রিয় ট্রানজিট ভূখণ্ড হয়ে না থেকে সেই সংযোগের শর্ত নির্ধারণে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

সেই পরিবর্তনের জন্য অবকাঠামোকে শুধু নির্মাণ করলেই হবে না; তাকে কার্যকর করতে হবে। বন্দরকে হতে হবে প্রতিযোগিতামূলক, শুল্কব্যবস্থাকে হতে হবে পূর্বানুমেয়, ডিজিটাল ব্যবস্থাকে হতে হবে আন্তঃসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভৌগোলিক অবস্থান একটি সম্ভাবনা মাত্র; নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানই সেই সম্ভাবনাকে ক্ষমতায় রূপান্তর করে। এখানেই বাংলাদেশের মধ্যম-শক্তির কূটনীতির পরবর্তী পর্যায়ের প্রশ্নটি সামনে আসে।

এটি আর শুধু বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন নয়। এটি নিজের সক্ষমতাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন, যেখানে অন্যদের সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য যেমন লাভজনক, তেমনি বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ছাড়া আঞ্চলিক সংযোগের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করাও কঠিন।

অর্থাৎ উত্তরণটি হবে— দুর্বলতা ব্যবস্থাপনা থেকে সক্ষমতা প্রয়োগে, ভারসাম্য রক্ষা থেকে দর-কষাকষিতে, এবং অবকাঠামো নির্মাণ থেকে নিয়ম-প্রভাব সৃষ্টিতে।

বাংলাদেশের জন্য বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত ভবিষ্যৎ তাই আধিপত্যের গল্প হওয়ার প্রয়োজন নেই।

এটি হতে পারে বিশ্বাসযোগ্যতার গল্প। যে রাষ্ট্র তার বন্দরকে কার্যকর করে, তার বাণিজ্যকে সহজ করে, তার প্রতিষ্ঠানকে পূর্বানুমেয় করে এবং তার অবকাঠামোকে আঞ্চলিক সংযোগের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, সে রাষ্ট্রের প্রভাব তার ভৌগোলিক আকারের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে।

সেখানেই একটি ট্রানজিট নোড ধীরে ধীরে একটি নিয়ম-প্রভাবক মধ্যম শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

আর বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগটি সম্ভবত এখানেই: ভূগোলের সুবিধা ভোগ করা নয়, সেই ভূগোলকে প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক সক্ষমতার মাধ্যমে কৌশলগত প্রভাবে রূপান্তর করা।

লেখক :ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও উদ্যোক্তা।

পাঠকের মতামত:

২০ আগস্ট ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test