E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

শর্মিলা ঠাকুর না আয়েশা সুলতানা? 

২০২৬ আগস্ট ২৭ ১৭:০৭:১২
শর্মিলা ঠাকুর না আয়েশা সুলতানা? 

শিতাংশু গুহ


শর্মিলা ঠাকুর বলেছেন, যারা এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, তাদের জন্যে ‘বন্দে মাতরম’ উচ্চারণ করা কঠিন। একদা শর্মিলা ঠাকুর একজন চমৎকার অভিনেত্রী ছিলেন, এ সময়ে তাঁর কথাবার্তা একজন ধর্মান্ধের মত। তাঁর মন্তব্য শুনে স্বামী বিবেকান্দের একটি অমর উক্তি মনে এলো, স্বামীজী বলেছিলেন, ‘একজন হিন্দু ধর্মান্তরিত হলে শুধুমাত্র একজন হিন্দু কমে তা নয়, হিন্দুর একজন শত্রু বাড়ে’। বিশ্বাস করুন বা না করুন, শর্মিলা ঠাকুর এখন ‘এন্টি-ভারত’ ও ‘এন্টি-হিন্দু’, তিনি প্রেসিডেন্ট আবুল কালাম আজাদ হতে পারতেন, তা হননি, বরং তিনি নুতন করে স্বামীজীর বক্তব্যকে প্রমান করেছেন। বাংলায় এমত আর একটি দৃষ্টান্ত ‘কবির সুমন’, ক্ষমতার হাত বদলের পর তাঁকে ডিম্ ছোড়ার সংবাদ চোখে পড়েনি।  

শর্মিলা ঠাকুরের বক্তব্যের সুন্দর জবাব দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি প্রেসিডেন্ট শমীক ভট্টাচার্য্য। তিনি অভিনেত্রীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তৈমুর অসংখ্য মন্দির ধ্বংস করেছিলো, প্রচুর মানুষকে হত্যা এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করেছিলো, শর্মিলা ঠাকুরের নাতির নামও তৈমুর, সুতরাং ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে কম কথা বলাই ভালো। নায়িকা কঙ্গনা রানাউত বলেছেন, আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি একজন শিল্পী ধর্মের চশমা পড়ে কবিতা বা গানকে দেখছেন। তিনি শর্মিলা ঠাকুরকে ধর্মীয় গন্ডির বাইরে আসার আহবান জানিয়েছেন। মৃনাল মজুমদার বাঘমামা লিখেছেন, বন্দে মাতরম বিরোধীদের জন্যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিলো, ভারতে ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে হবে। শর্মিলা ঠাকুরের বক্তব্যের অনেকগুলো ব্যাখ্যা আছে, জবাবও আছে।

শর্মিলা ঠাকুর বলেছেন যারা এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন- হিন্দুরা তো এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, তাদের তো কোন সমস্যা হচ্ছেনা, তিনি কাদের কথা বলছেন? ‘ঈশ্বর একমেব অদ্বিতীয়ম’-বেদের এই প্রথম শ্লোক অন্তত: ৫হাজার বছর পুরানো, দেবতা বহু হলেও হিন্দুরা এক ঈশ্বরের আরাধনা করে, এ তত্ব হয়তো শর্মিলা ঠাকুরের জানা নেই? সেই কবে বিখ্যাত ক্রিকেটার পতৌদির নবাব মনসুর আলী খান এবং শর্মিলা ঠাকুর প্ৰেম-কাহিনী ভারতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো, শর্মিলাকে ধর্মান্তরিত হয়ে ‘আয়েশা সুলতানা’ হতে হয়েছিলো, চলচ্চিত্র জগৎ ছেড়ে নবাবের হারেমে ঢুকতে হয়েছিলো! স্বামীর মৃত্য’র দীর্ঘদিন পর তিনি আজকাল বাইরে বের হচ্ছেন, কিন্তু শর্মিলা ঠাকুর নামে কেন তিনি পরিচিত হবেন, তিনি আয়েশা নামে কেন পরিচিত হতে চাচ্ছেন না-তিনি তো আর শর্মিলা নন?

বাংলাদেশ-ভারতে এমত অনেক ধর্মান্তরিত আছেন যাঁরা হিন্দু নামটি ধরে রেখে দেন্ ‘গাছেরও খাবেন, তলারও কুঁড়ানোর’ জন্যে? ‘লাভ-জ্বিহাদ’ শব্দটি তখন অপরিচিত ছিলো, তাই পতৌদির নবাব-শর্মিলা ঠাকুরের বিয়েটা ‘লাভ-জ্বিহাদ’ বলা হয়নি, সেটি কি আসলে লাভ-জ্বিহাদ নয়? ‘লাভ-জ্বিহাদ’ এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, ভালোবেসে বা বিয়ে করে ধর্মান্তকরণ। ‘জ্বিহাদ’ শব্দটি আরবীয় বা ইসলামী, তাই এটি মূলত: ভালবেসে ইসলামীকরণ। এরমধ্যে কতটুকু ভালোবাসা আর কতটুকু ‘জ্বিহাদ’ বলা মুশকিল? একটি ছেলে, একটি মেয়ে সম্পর্ক হতেই পারে, কিন্তু ধর্মান্তর কেন? ধরা যাক, দুই ধর্মের দুই পাত্রপাত্রীর মধ্যে একটি সম্পর্ক গড়ে উঠলো। বিয়ের পালা। ধর্ম তখন সামনে এসে দাঁড়ায়। সমস্যা বাঁধে পাত্র-পাত্রীর একটি পক্ষ মুসলিম হলে; সেখানে অন্যপক্ষকে মুসলমান হতে হয়। কেন?

এটি জবরদস্তি। এখানে ধর্মকে ভালবেসে কেউ ধর্মান্তরিত হচ্ছেন না। আকর্ষণটা ধর্মের নয়, অন্যত্র। চাহিদা ধর্মের নয়, দেহের। প্রশ্ন উঠতে পারে, ছেলে-মেয়ে কাউকে ধর্ম ত্যাগ করতে হবে কেন? আর যদি করতে হয়, তাহলে একজনকে কেন? দু’জনকে নয় কেন? প্রায়শ: দেখা যায়, মেয়েটি ধর্ম ত্যাগ করছে। এতে মেয়েটির ভালবাসার প্রমান হলেও (!) ছেলেটি’র ভালবাসার প্রমান হয়না। ভালবাসার জন্যে ধর্মান্তর-কে কি ‘ভালবাসা’ বলা যায়? দু’জনের ভালবাসার মধ্যে যদি ধর্ম বড় হয়ে দাঁড়ায় তাহলে সেটা আর যাই হোক, ভালবাসা নয়! দু’জন যদি সত্যি একে অপরকে ভালোবাসেন তবে উভয়ে ধর্মত্যাগ করে তৃতীয় ধর্ম গ্রহণ করলে হয়তো কিছুটা যৌক্তিক হতে পারে। নইলে তো ওই ‘ভালোবাসা’ আর ‘গৃহস্থের মুরগী পোষা’-র মধ্যে খুব একটা তফাৎ থাকেনা।

ভারত একসময় আন্তধর্মীয় বিয়ে উৎসাহিত করেছিলো, হয়তো আশা ছিলো এরফলে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যেকার সম্পর্ক ভালো হতে পারে। তা হয়নি। মুসলমানরা এই সুযোগ নিয়ে দল ভারী করেছে। হিন্দুরা ঠকেছে। বাংলাদেশে বিয়ের নামে ধর্মান্তকরণ, বিশেষত: গ্রামে-গঞ্জে এবং নাবালিকা অপহরণ, অত:পর ধর্মান্তকরণ ও বিয়ে অনেকটা মহামারীর মত। প্রসাশন উদাসীন। শহরে প্যাটার্ন ভিন্ন। বিনোদন ক্ষেত্রে একশ’ ভাগ। অ-মুসলমান কেউ বিনোদন ক্ষেত্রে যেই একটু ওপরে উঠছেন, তিনিই ধরাশায়ী হচ্ছেন? কুমার বিশ্বজিৎ থেকে শুরু করে অপু বিশ্বাস পর্যন্ত, সর্বত্র একই চিত্র। অপু বিশ্বাস ইসলাম ধর্মকে ভালবেসে ধর্মান্তরিত হননি, হয়েছেন শাকিবকে পাওয়ার জন্যে। ঢাকার ম্যুভি ইন্ডাষ্ট্রিতে হিন্দু মেয়ের সাথে মুসলিম ছেলের প্রেম এখনো বেশ উপাদেয়?

পূর্ণিমা সেনগুপ্ত বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু নায়িকা, ধর্মান্তরিত হন, সেই শুরু। লোভ, মোহ আছে, থাকবে, কিন্তু ধর্মান্তর? হিন্দু নায়িকা মিনা পাল ওরফে কবরী। চটগ্রামের চিত্ত চৌধুরীর স্ত্রী মীনা পাল হলেন কবরী। তারপর কবরী সরোয়ার। দ্বিতীয় স্বামী পরিত্যাগ করে হয়ে গেলেন সারাহ বেগম কবরী। অনজু ঘোষ বিয়ে করলেন এক মুসলিম পরিচালককে, মুসলমান হলেন। ছাড়াছাড়ি হলো, আবার হিন্দুধর্মে ফিরে এলেন। মোল্লারা হুঙ্কার ছাড়লেন, 'একবার মুসলমান হলে আর ইসলাম ত্যাগ করা যায়না’? অরুণা বিশ্বাস বা মঞ্জুশ্রী একই পথে গেলেন। জহির রায়হান ধর্মান্তরিত করলেন হেনা ভট্টাচার্যকে। হেনা হলেন সুমিতা রায়হান। সুমিতা সিনেমার নাম, হেনা হলেন নিলুফার বেগম। বাংলাদেশে ধর্মান্তর ওয়ান ওয়ে। কলকাতায় মৈত্রিয়ী দেবীর বাড়ীতে ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিলো জয়শ্রী-আলমগীর -এর। বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে এমন একটি ঘটনা কি কেউ দেখাতে পারবেন বা আছে?

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী।

পাঠকের মতামত:

২৭ আগস্ট ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test