E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

সাঈদ-উর রহমান: শিক্ষকের ‘আপনি’ সম্বোধনে মানুষের মর্যাদার পাঠ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৫ ১৮:৫৪:৩২
সাঈদ-উর রহমান: শিক্ষকের ‘আপনি’ সম্বোধনে মানুষের মর্যাদার পাঠ

ড. মাহরুফ চৌধুরী


কোনো শিক্ষকের কথা মনে পড়লে, সাধারণত তাঁর পড়ানো কোনো তত্ত্ব, কোনো বিশেষ বক্তৃতা কিংবা পরীক্ষার জন্য দেওয়া কোনো নোট শিক্ষার্থীর মনে পড়ে না; মনে পড়ে তাঁর আচরণ। মনে পড়ে শিক্ষার্থী হিসেবে তাকে তিনি কিভাবে দেখেছেন, কি রকম আচরণ করেছেন। মনে পড়ে কেমন ছিল তাঁর  সম্বোধন ও কথোপকথনের ভাষা, কেমন ছিল তাঁর মুখাবয়ব ও দেহভঙ্গি, কিংবা কত সহজেই তিনি আপন করে নিতে পারতেন অথবা দূরে ঠেলে দিতেন; অর্থাৎ তাঁর সহজ ও স্বাভাবিক অথচ গভীর মানবিক আচরণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ-উর রহমান (১৯৪৮-২০২৬) ছিলেন তেমনই একজন শিক্ষক। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তিনি দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন অনন্তলোকে। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর হারিয়েছে একজন বিশিষ্ট গবেষক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষককে। নানা পরিসরে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে তাঁর গবেষণা, প্রবন্ধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের কথা অবশ্যই বলা হবে। আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা, জীবনী, প্রকাশনা কিংবা পুরস্কারের তালিকা দিয়ে তাঁকে পুরোপুরি বোঝা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় কারণ কেবল তিনি কী লিখেছেন বা কী গবেষণা করেছেন তা নয়; বরং তিনি কেমন মানুষ ছিলেন এবং তাঁর সংস্পর্শে এসে শিক্ষার্থীরা কী শিখেছে? এই প্রশ্নটিই আজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর ভাবীকালের শিক্ষকদের জন্য তিনি কতটুকু দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন, সেটা বিবেচ্য। 

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষক থাকেন। কেউ জ্ঞানের গভীরতার জন্য স্মরণীয়, কেউ বক্তৃতার জন্য, কেউ ব্যক্তিত্বের আভা কিংবা বিভার জন্য, কেউ গবেষণার জন্য, কেউবা প্রশাসনিক ক্ষমতা বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে। কিন্তু খুব কম শিক্ষক আছেন, যাঁদের কথা মনে পড়লে সবার আগে কোনো ক্লাসের বিষয় নয়, বরং একটি চরিত্র ও জীবনদর্শন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সাঈদ-উর রহমান ছিলেন তেমনই একজন শিক্ষক। শিখন পরিবেশের পরিমন্ডলে শিক্ষার্থীবান্ধব হিসেবে শিক্ষার্থীদের সাথে তাঁর বন্ধন ছিল মাত্রাতিরিক্ত সখ্যের নয়, বরং সম্মান ও আস্থার এক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কে। তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থীর স্মৃতিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে সম্ভবত দুটি শব্দ, ‘আপনি’ ও ‘ভাই’। তারা দেখেছে একজন অধ্যাপক তাঁর ছাত্রকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করছেন, সাধারণ মানুষকে ‘ভাই’ বলে ডাকছেন। তাঁর এই আপাত-সাধারণ আচরণের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তাঁর শিক্ষকতার মহান ও গভীরতম দর্শন। আর তাহল মানুষকে তার জন্ম, বর্ণ, ধর্ম, পদ-পদবী, পেশা কিংবা আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে মানুষ হিসেবে দেখা এবং তার প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া। প্রাক্তন ছাত্র সরকার আমিন তাঁর সম্পর্কে স্মৃতিচারণে লিখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই স্যার তাঁকে ‘আপনি’ সম্বোধন করেছিলেন। গ্রাম থেকে প্রথমবার ঢাকা শহরে আসা সেই তরুণের কাছে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের মুখে ‘আপনি’ শোনা ছিল বিস্ময়কর। তাঁর ভাষায়, এই সম্বোধন তাঁকে একই সঙ্গে ‘বিস্মিত, সম্মানিত ও সম্মোহিত’ করেছিল। এই স্মৃতির গুরুত্ব কেবল একটি সর্বনামের মধ্যে নয়। এর মধ্যে নিহিত ছিল তাঁর পুরো শিক্ষাদর্শন। সাঈদ-উর রহমান তাঁর ছাত্রকে অধস্তন হিসেবে দেখেননি; দেখেছিলেন একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে, যার নিজস্ব মর্যাদা রয়েছে।

প্রচলিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কে ক্ষমতার মানদন্ডে একটি স্বাভাবিক দূরত্ব থাকে। শিক্ষক পড়ান, শিক্ষার্থী শেখে; শিক্ষক মূল্যায়ন করেন, শিক্ষার্থী মূল্যায়িত হয়; শিক্ষক দাতা, শিক্ষার্থী গ্রহীতা। এই কাঠামোর মধ্যে কর্তৃত্ব সহজেই ভয়ের রূপ নিতে পারে। শিক্ষক হিসেবে সাঈদ-উর রহমানের বৈশিষ্ট্য ছিল, স্বাভাবিক সম্পর্কের গন্ডি অতিক্রম না করেও তিনি শ্রদ্ধা বজায় রেখে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ককে মানবিক উৎকর্ষতার মানদন্ডে মর্যাদাপূর্ণ করে তোলা। তাঁর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব ছিল, কিন্তু বিচ্ছিন্নতা ছিল না; শ্রদ্ধা ছিল, কিন্তু ভীতি ছিল না। তিনি কাউকে অযথা কাছে টেনে নিতেন না, আবার প্রয়োজনের সময় কাউকে একা ছেড়ে দিতেন না। তাঁর উপস্থিতি ছিল নীরব, কিন্তু আস্থাশীল ও আত্মপ্রত্যয়ী। এই আস্থা ও আত্মপ্রত্যয়ই একজন শিক্ষকের বড় শক্তি। কর্তৃত্ব দিয়ে আনুগত্য পাওয়া যায়, কিন্তু আস্থা অর্জন করতে হয় আচার-আচরণ তথা চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে। সাঈদ-উর রহমান শিক্ষার্থীদের ওপর নিজের গুরুত্ব চাপিয়ে দেননি; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যেখানে শিক্ষার্থী তাঁর কাছে নিজের কথা বলতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারে। তাঁর কাছে শিক্ষকতা তাই কেবল পাঠদানের সম্পর্ক ছিল না; ছিল মানুষ হিসেবে শিক্ষার্থীকে স্বীকৃতি দেওয়ার সম্পর্ক তৈরি করাও। মানুষকে মর্যাদা দেওয়ার এই প্রবণতা শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সরকার আমিন স্মৃতিচারণায় আরো উল্লেখ করেছেন যে, একদিন রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা সাঈদ-উর রহমান একজন রিকশাচালককে বলেছিলেন, ‘ভাই, যাবেন?’ রিকশাচালক প্রথমে অবাক হয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছেন তিনি কাকে ডাকছেন। সে যেন বিশ্বাস করতেই পারছিলেন না, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিকশাওয়ালাকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করছেন।

সরকার আমিনের বর্ণিত এই ছোট্ট ঘটনা দু’টিই তাঁর জীবনদর্শনের বড় পরিচয় বহন করে। আমরা প্রায়ই সাম্য, মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলি। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে সেই মূল্যবোধের প্রকৃত পরীক্ষা হয় আমাদের দৈনন্দিন আচরণে। বিশেষ করে আমরা একজন শ্রমজীবী মানুষকে কীভাবে সম্বোধন করি, একজন শিক্ষার্থীকে কীভাবে দেখি, একজন অপেক্ষাকৃত দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করি, কিংবা ভিন্নমতের মানুষের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল থাকি। সাঈদ-উর রহমানের বিশেষত্ব ছিল, তিনি যে মূল্যবোধে বিশ্বাস করতেন, তা বক্তব্যের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান ছিল তাঁর প্রত্যহিক আচরণে। এই জায়গাতেই তিনি ‘আপনি আচরি ধর্ম পরে শেখাও’ নীতিটির যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি মানুষকে মর্যাদা দেওয়ার তত্ত্ব পড়াননি; মানুষকে মর্যাদা দিয়ে দেখিয়েছেন সেটা কিভাবে করতে হয়। শিক্ষার্থীদেরকে সাম্যের কথা বলার আগে নিজে তাদের সাথে সাম্যের আচরণ করেছেন। আদর্শের প্রচার করার চেয়ে আদর্শকে নিজের জীবনে ধারণ করেছেন। ফলে তাঁর জীবন নিজেই শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নীরব পাঠ্যপুস্তক হয়ে উঠেছিল।

স্বভাবত স্বল্পভাষী সাঈদ-উর রহমান কোনো আড্ডা কিংবা সভার কেন্দ্রবিন্দু হতে চাইতেন না। উচ্চকণ্ঠ সামাজিক কিংবা একাডেমিক বিতর্কেও তাঁকে সচরাচর দেখা যেত না। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের অনেকের স্মৃতিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল নীরব, কিন্তু দৃঢ় ও স্পষ্ট। তাঁর এ নীরবতা নিষ্ক্রিয়তা ছিল না; ছিল এক ধরনের আত্মসংযম; আর সেটা ছিল পেশাগত বিশ্বাসের সীমা-পরিসীমার ধারণাজাত। আজকের দৃশ্যমানতা, আত্মকেন্দ্রিকতা ও আত্মপ্রদর্শনের সময়ে এই বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এবং দুর্লভ। একজন সুনাগরিক ও শিক্ষক হিসেবে তিনি নিজের কাজ করেছেন, দায়িত্ব পালন করেছেন, গবেষণা করেছেন, লিখেছেন, নিজের সাধ্য অনুযায়ী মানুষকে সাহায্য করেছেন। পেশাগত নৈতিকতায় বিশ্বাসী নিবৃতচারী শিক্ষক হিসেবে তিনি নিজের গুরুত্ব প্রচার করার প্রয়োজন বোধ করেননি। শিক্ষার্থীদের কাছে এখানেই তিনি শিক্ষককের মর্যাদাকে সমুন্নত করেছেন।

বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণা ও পাঠদান করলেও তাঁর মনোজগত ছিল বহুমাত্রিক। পূর্ব বাংলার রাজনীতি, সংস্কৃতি ও কবিতা, বাংলাদেশের ইতিহাস, স্বাধীনতাযুদ্ধ, সমাজচিন্তা ও মার্কসবাদসহ বিভিন্ন বিষয় ছিল তাঁর অব্যাহত চিন্তাভাবনা ও অনুসন্ধানের অংশ। স্বাধীনতাযুদ্ধে তিনি যুদ্ধের ময়দানে যোদ্ধাদের রাজনৈতিক প্রশিক্ষক হিসেবেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। সাহিত্য তাঁর কাছে নিছক নান্দনিকতার বিষয় ছিল না; ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের জীবন বোঝারও একটি পথ ছিল। জীবনকে বড় পরিসরে দেখার এই বহুমাত্রিকতা তাঁকে একটি নির্দিষ্ট একাডেমিক পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ রাখেনি। রাজনৈতিকভাবেও তিনি ছিলেন সক্রিয় ও স্পষ্ট অবস্থানের মানুষ। মাওলানা ভাসানীর সমাজতান্ত্রিক ধারা, বৈষম্যহীন সমাজ, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবমুক্তির প্রশ্ন তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল। একই সঙ্গে তিনি দেশ ও মানুষের কল্যাণে প্রায়গিক অর্থে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তায় বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ছিল না উচ্চকণ্ঠ স্লোগান কিংবা ব্যক্তিগত আনুগত্যের প্রদর্শন। শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেও তিনি নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা বিসর্জন দেননি। কল্যাণমুখী বিশ্বাস ও বিচারবোধের এই সমন্বয়ই তাঁকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।

একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব শুধু একটি মতাদর্শের পুনরাবৃত্তি করা নয়; নিজের বিশ্বাসকে যুক্তি, তথ্য-উপাত্ত, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার আলোকে যাচাই করাও তাঁর দায়িত্ব। সাঈদ-উর রহমানের জীবন থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তা হলো, দৃঢ় অবস্থান ও সংযত প্রকাশ পরস্পরের বিরোধী নয়; বরং সেটা হতে পারে মার্জিত ও ক্রমবর্ধমান অগ্রগতির স্মারক। তিনি উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না, কিন্তু অবস্থানহীনও ছিলেন না। তিনি তাঁর জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন যে, বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি সবসময় শব্দের উচ্চতায় প্রকাশ পায় না; পায় তার প্রায়োগিক আচরণিক প্রকাশের বাস্তবতায়। তাঁর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার সম্ভবত এখানেই, বিশেষ করে চিন্তা ও আচরণের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানে। ন্যায়, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা কিংবা মানবমুক্তির কথা বলা সহজ; কঠিন হলো সেগুলো নিজের বিশ্বাসে ও আচরণে ধারণ করা। সাঈদ-উর রহমান সেই কঠিন কাজটিই করে গেছেন নিজের ব্যক্তিগত জীবনচর্যায়। তাঁর ছাত্রদের জন্য তাই তিনি শুধু একজন বিষয়জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষকই ছিলেন না; ছিলেন মূল্যবোধের এক জীবন্ত উদাহরণও।

জীবনের শেষদিকে তিনি দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। কিন্তু তাঁর অসুস্থতার কথাও খুব বেশি শোনা যায়নি। ব্যক্তিগত কষ্টকে তিনি প্রকাশ্যে আলোচনার বিষয় করতে চাননি। মৃত্যুর পরও তাঁর প্রচারবিমুখ চরিত্রের যেন একটি প্রতীকী পুনরাবৃত্তি ঘটল। শোনা যায়, বাংলা একাডেমি ও বাংলা বিভাগের পক্ষ থেকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর আগ্রহ থাকলেও পারিবারিক সিদ্ধান্তে তা সম্ভব হয়নি। তাঁর বিদায়ও তাই হলো অনেকটা নীরবে। যে মানুষটি জীবনভর নিজের উপস্থিতিকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেননি, তাঁর বিদায়ও যেন সেই চরিত্রের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু ব্যক্তিত্ববান মানুষের নীরব বিদায় আশেপাশের লোকজনের উপর তাঁর প্রভাবকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে না। বরং তাঁর মৃত্যুর পরই হয়তো আমরা আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছি, একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে কী রেখে যেতে পারেন; কিভাবে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন মানবিক চেতনায় কল্যাণমুখী রূপান্তরের পথে। তাঁর কোনো নির্দিষ্ট বক্তৃতার প্রতিটি কথা হয়তো অনেকেই মনে রাখবেন না; কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার সূত্রও হয়তো সময়ের সঙ্গে মুছে যাবে। কিন্তু মনে থাকবে তাঁর ‘আপনি’ সম্বোধনের স্মৃতি, মনে থাকবে তাঁর ‘ভাই’ ডাকের শব্দ, মনে থাকবে ঠোঁটের কোনে ফুটে ওঠা তাঁর সেই মৃদু হাসি, মনে থাকবে একজন মানুষকে ছোট না করে সম্মান করার বাস্তব শিক্ষা।

আজ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, মূল্যবোধ, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময়ে সাঈদ-উর রহমানের জীবন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায় যে, মানবিক উৎকর্ষে একজন শিক্ষক আসলে কেমন হওয়া উচিত। বড় শিক্ষক হওয়া মানে শুধু বড় গবেষক হওয়া নয়; বেশি প্রকাশনা, পুরস্কার কিংবা পদপদবীও তার একমাত্র মাপকাঠি নয়। বড় শিক্ষক সেই ব্যক্তি, যিনি শিক্ষার্থীর চিন্তার স্বাধীনতাকে সম্মান করেন, মনের জগতকে আলোড়িত করেন, প্রশ্ন করার সাহস জাগান, ভিন্নমতকে সহ্য করতে শেখান এবং নিজের আচরণ দিয়ে মানুষকে মর্যাদা দিতে শেখান। এই কারণে সাঈদ-উর রহমানকে শুধু স্মরণসভা, শোকবার্তা কিংবা স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তাঁর জীবনকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির একটি আদর্শ হিসেবে সামনে আনা দরকার। এমন বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে শিক্ষক হবেন জ্ঞানের পাশাপাশি নৈতিকতারও পথপ্রদর্শক; যেখানে শিক্ষার্থী হবে কেবল পরীক্ষার্থী নয়, মর্যাদাসম্পন্ন স্বতন্ত্র মানুষ; যেখানে রাজনৈতিক মত থাকবে, কিন্তু লেজুড়বৃত্তি থাকবে না; বিতর্ক থাকবে, কিন্তু অবমাননা থাকবে না; এবং গবেষণা থাকবে, কিন্তু আত্মপ্রদর্শনের চেয়ে সত্যের অনুসন্ধান বড় হয়ে উঠবে।

কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি সাঈদ-উর রহমানের মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চতার কাছাকাছি একশজন শিক্ষক থাকে, তবে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়টি নয়, জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক পরিসরই নি:সন্দেহে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে। কারণ একজন শিক্ষক কেবল তাঁর নিজের সময়ের শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করেন না; তাঁর নৈতিক সাহস ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেরণা শিক্ষার্থীদের মধ্য দিয়ে পরবর্তী প্রজন্ম হয়ে সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজ তাই শেষ পর্যন্ত একটি জাতির চিন্তার সংস্কৃতি নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রাখে এবং তাঁরাই হয়ে ওঠেন জাতীয় জীবনে চেতনার বাতিঘর। সাঈদ-উর রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্মারক কোনো ভবন, ফলক বা আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় স্মৃতিসৌধ হতে পারে আগামী প্রজন্মের এমন এক ঝাঁক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, যারা মানুষকে তার ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক পরিচয়ের আগে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখবে। তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে তখনই, যখন আমরা তাঁর জীবনের সহজ অথচ কঠিন পাঠটি নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারব তথা জীবনচলার পথে ভিন্নমতকে সম্মান করা, দুর্বলকে ছোট না করা, শিক্ষার্থীকে অধস্তন না ভাবা এবং নিজের বিশ্বাসকে নিজের আচরণে সত্য করে তোলা।

সাঈদ-উর রহমান স্যার তাঁর দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত সফর শেষে মিশে গেছেন সময়ের অনন্ত স্রোতে। কিন্তু তাঁর শেখানো ‘আপনি’ শব্দটি আমাদের জন্য এখনও একটি নৈতিক আহ্বান। মানুষকে ‘আপনি’ বলা মানে শুধু ভাষার ভদ্রতা নয়; তার মর্যাদাকে স্বীকার করা। একজন রিকশাচালক কিংবা অন্তজ শ্রেণীর মানুষকে ‘ভাই’ বলা শুধু সৌজন্য নয়; সামাজিক দূরত্বের উর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা। একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্মানের সম্পর্ক তৈরি করা শুধু ভালো শিক্ষকতার লক্ষণ নয়; ভবিষ্যৎ নাগরিকের মানবিক বোধ নির্মাণেরও অংশ। শিক্ষক হিসেবে তিনি এই কাজটি নীরবে করে গেছেন তাঁর পুরো পেশাগত জীবনে। এখন আমাদের দায়িত্ব হবে তাঁর সেই নীরব শিক্ষাকে উচ্চকণ্ঠ স্লোগানে নয়, জীবনের আচরণে বহন করা। সম্ভবত একজন শিক্ষকের জন্য এর চেয়ে বড় উত্তরাধিকার আর কিছু হতে পারে না। কালের পরিক্রমায় ছাত্ররা তাঁর সব কথা মনে না রাখলেও তাঁর কাছ থেকে তারা যে মর্যাদা পেয়েছে, অন্য মানুষকে সম্মান করতে শিখেছে, সেই স্মৃতি ও উপলব্দি কিন্তু অম্লান থেকে যাবে। সাঈদ-উর রহমান স্যারের প্রতি সবচেয়ে যথার্থ শ্রদ্ধাঞ্জলি হবে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য তাঁর মতো আরও শিক্ষক তৈরি করা যাঁরা পাণ্ডিত্যে বড়, চিন্তায় স্বাধীন, আদর্শে দৃঢ়, অন্যায় প্রতিরোধে প্রতিবাদী, আচরণে বিনয়ী এবং মানুষের মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন। এমন একশজন শিক্ষকই হয়তো একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বদলে দিতে পারেন; আর একটি বদলে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ই হতে পারে একটি জাতির চিন্তা ও চরিত্রকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার মত বিশ্ববিদ্যার আলয়।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।

পাঠকের মতামত:

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test