E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

মিয়ানমার করিডর ও স্থলপথে চীন সংযোগ: সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

২০২৬ অক্টোবর ১৫ ১৯:১৪:৪৭
মিয়ানমার করিডর ও স্থলপথে চীন সংযোগ: সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

ড. মাহরুফ চৌধুরী


মানবসভ্যতার ইতিহাসে বাণিজ্যপথ কখনো কেবল পণ্য পরিবহনের মাধ্যম ছিল না; বরং তা ছিল সভ্যতার বিকাশ, সংস্কৃতির বিনিময় এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রাচীন সিল্ক রোড যেমন চীন, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপকে যুক্ত করে শুধু পণ্য নয়, জ্ঞান, প্রযুক্তি, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতিরও বিস্তার ঘটিয়েছিল, তেমনি আধুনিক বিশ্বে করিডর, বন্দর, মহাসড়ক ও রেলপথকে কেন্দ্র করে নতুন ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতা গড়ে উঠছে। আজকের বিশ্বে একটি বাণিজ্যপথের গুরুত্ব শুধু কত দ্রুত পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছায়, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই পথ কোন কোন উৎপাদনকেন্দ্র, বাজার, বন্দর ও ভোক্তা অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ তৈরি করছে এবং তার মাধ্যমে কী ধরনের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে তার ওপরও নির্ভর করে। এই কারণেই আধুনিক করিডরগুলোকে অনেক সময় ‘অর্থনৈতিক ধমনী’ হিসেবে দেখা হয়, যার মাধ্যমে পণ্য, পুঁজি, প্রযুক্তি, মানুষ ও তথ্যের প্রবাহ একটি অঞ্চলের উৎপাদন কাঠামোকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে পারে।

একবিংশ শতাব্দীতে যে রাষ্ট্রগুলো সংযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করবে, তারাই অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ পাবে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অধ্যয়নে অবকাঠামোগত সংযোগকে শুধু পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন হিসেবে নয়, বরং বাজার সম্প্রসারণ, বাণিজ্য ব্যয় হ্রাস, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলে (রিজিওনাল ভ্যালু চেইন) অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে স্থলবেষ্টিত বা তুলনামূলকভাবে দূরবর্তী উৎপাদন ও বাজারকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সমুদ্রবন্দরকে যুক্ত করতে পারলে একটি করিডর তার নিজস্ব ভূগোলের সীমাবদ্ধতাকে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করতে পারে। ফলে আধুনিক বিশ্বে ‘কোথায় একটি দেশ অবস্থিত’ এই প্রশ্নের পাশাপাশি ‘কোন কোন অঞ্চলের সঙ্গে দেশটি কতটা কার্যকরভাবে সংযুক্ত’ এই প্রশ্নটিও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে স্থলপথে সংযোগের প্রশ্নটি এই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ। বিষয়টি কেবল একটি সড়ক বা রেলপথ নির্মাণের প্রশ্ন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, আঞ্চলিক বাণিজ্য, শিল্পায়ন, সরবরাহব্যবস্থা এবং ভূ-রাজনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে চীনের ইউনান প্রদেশ, মিয়ানমারের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চল এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম-কেন্দ্রিক বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে কার্যকর স্থল ও বহুমাত্রিক সংযোগ গড়ে উঠতে পারলে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনকে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার একটি নতুন অর্থনৈতিক অক্ষ তৈরি হতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের জন্য শুধু চীনা বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে না; বরং বাংলাদেশ নিজেও বৃহত্তর আঞ্চলিক উৎপাদন, বাণিজ্য ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

তবে এই সম্ভাবনাকে সরল অবকাঠামোগত প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। একটি কার্যকর করিডর তখনই অর্থনৈতিকভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস, পণ্য পরিবহন, গুদাম ও লজিস্টিকস অবকাঠামো, ডিজিটাল বাণিজ্যব্যবস্থা, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন এবং আঞ্চলিক বাজারের সমন্বয় ঘটে। অর্থাৎ সড়ক নির্মাণ করিডরের সূচনা হতে পারে, কিন্তু করিডর অর্থনীতি গড়ে ওঠে তার চারপাশে উৎপাদন, বাণিজ্য ও সেবার একটি সমন্বিত বাস্তুতন্ত্র (ইকোসিস্টেম) তৈরি হলে। তাই মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলসংযোগের প্রশ্নটি একই সঙ্গে একটি পরিবহন প্রকল্প, একটি বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূ-অর্থনৈতিক কৌশলের প্রশ্ন। এখানেই নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে সুযোগের পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক, অবকাঠামোগত, নিরাপত্তাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশ বহুদিন ধরেই সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় অঞ্চলগুলো অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত উন্নত হলেও ইউনান ও আশপাশের অভ্যন্তরীণ প্রদেশগুলো তুলনামূলকভাবে সমুদ্রবন্দর থেকে দূরে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পরিবহন ও আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে তাদের অনেকাংশেই চীনের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় বন্দরগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা চীনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের উন্নয়ন, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য বিকল্প সরবরাহপথ তৈরির প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে চীনের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নকে পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলের তুলনায় অধিক ভারসাম্যপূর্ণ করার যে দীর্ঘমেয়াদি নীতি, তার সঙ্গে দক্ষিণমুখী আঞ্চলিক সংযোগের বিষয়টিও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

ফলে চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো দক্ষিণমুখী সংযোগের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে আরও কার্যকর যোগাযোগ এবং বিদ্যমান বাণিজ্যপথের পাশাপাশি বিকল্প পথ তৈরি করা। এটি শুধু দূরত্ব কমানোর প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সরবরাহশৃঙ্খলের (সাপ্লাই চেইন) বৈচিত্র্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি। এই লক্ষ্য থেকেই চীন মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর, তেল ও গ্যাস পাইপলাইন, অর্থনৈতিক করিডর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক বিভিন্ন সংযোগ প্রকল্পে বিনিয়োগ করে আসছে। কিয়াউকফিউ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত এই বন্দর ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো চীনের ইউনানকে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে একটি সরাসরি ভূ-অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বারের সম্ভাবনা তৈরি করে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের মাধ্যমে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় বাজার ও পরিবহনব্যবস্থার সংযোগ বৃদ্ধির বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গেও এটি যুক্ত।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি স্বাভাবিক সম্ভাব্য অংশীদার। কারণ ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, মিয়ানমার, দক্ষিণ এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগবিন্দু। তবে বাংলাদেশের গুরুত্ব শুধু মানচিত্রে মধ্যবর্তী অবস্থানের কারণে নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম ও অন্যান্য সমুদ্রবন্দর, ক্রমবর্ধমান শিল্পভিত্তি, বৃহৎ ভোক্তা বাজার এবং দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সংযোগ। ফলে একটি কার্যকর স্থলপথ যদি চীনের ইউনানকে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলে এই সংযোগ কেবল দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনের পথ হিসেবে কাজ করবে না; বরং তা বৃহত্তর আঞ্চলিক উৎপাদন ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

যদি কুনমিং থেকে ম্যান্ডালে, সেখান থেকে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চল ও রাখাইন হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সঙ্গে কার্যকর সড়ক ও রেল সংযোগ গড়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করতে পারে। এমন একটি করিডর কার্যকর হলে চট্টগ্রামকে শুধু বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির বন্দর হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক ট্রানজিট ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে (হাব) রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি হবে। এর মাধ্যমে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পণ্য বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারে; একইভাবে বাংলাদেশের শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য রপ্তানি পণ্যও স্থলপথে দ্রুততর আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই ধরনের সংযোগ বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নতুন শিল্প, গুদামজাতকরণ, পরিবহন, সীমান্তবাণিজ্য ও লজিস্টিকস সেবা বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ করিডরটি যদি কেবল ‘পথ’ হিসেবে না থেকে উৎপাদন ও বাণিজ্যের একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অক্ষ হিসেবে গড়ে ওঠে, তবে এর প্রভাব বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-অর্থনৈতিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে।

একসময় বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারকে নিয়ে বিসিআইএম করিডোর (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর) ধারণা ব্যাপক আলোচনায় এসেছিল। এর পেছনে ছিল চারটি দেশের ভৌগোলিক নৈকট্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করার একটি উচ্চাভিলাষী ধারণা। যদিও রাজনৈতিক ও কৌশলগত নানা কারণে এই উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি, তবুও এর অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক যুক্তি আজও অটুট রয়েছে। বিসিআইএমের মূল দর্শন ছিল সংযোগের মাধ্যমে চারটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও মানুষের চলাচল বৃদ্ধি করা এবং বিচ্ছিন্ন জাতীয় অর্থনীতিগুলোকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা। অর্থাৎ এর লক্ষ্য ছিল শুধু একটি মহাসড়ক বা রেলপথ নির্মাণ নয়; বরং পরিবহন অবকাঠামোর সঙ্গে উৎপাদন, বাজার, বিনিয়োগ ও মানবিক যোগাযোগের সমন্বয়ে একটি আন্তঃনির্ভরশীল আঞ্চলিক অর্থনীতি গড়ে তোলা। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় প্রকল্পটির কাঠামো, অংশগ্রহণকারী বা অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু সংযোগের প্রয়োজনীয়তা কমেনি। বরং সরবরাহশৃঙ্খলের বৈচিত্র্য, আঞ্চলিক উৎপাদন এবং বিকল্প বাণিজ্যপথের গুরুত্ব বৃদ্ধির কারণে তা আরও বেড়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এই সংযোগের গুরুত্ব তাই বহুমাত্রিক।

প্রথমত, এটি বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রধানত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকেন্দ্রিক। এই বাজারগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অতিরিক্ত বাজার-নির্ভরতা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, বাণিজ্যনীতি পরিবর্তন, ভোক্তা চাহিদার ওঠানামা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সময় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাজার বৈচিত্র্যকরণ (মার্কেট ডাইভার্সিফিকেশন) তাই বাংলাদেশের রপ্তানি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া প্রয়োজন। এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজার, বিশেষ করে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, মিয়ানমার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল ভোক্তা ও উৎপাদন বাজারের সঙ্গে উন্নত সংযোগ বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য (যন্ত্রপাতি) এবং ডিজিটাল ও পেশাগত সেবার মতো খাতও এই বাজার সম্প্রসারণের সুবিধা পেতে পারে। তবে শুধু ভৌগোলিকভাবে বাজারের কাছাকাছি পৌঁছানো যথেষ্ট নয়; প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, পণ্যের মান, মানদণ্ডের স্বীকৃতি, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এবং দ্রুত কাস্টমস ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই সংযোগ বাস্তব রপ্তানি সম্ভাবনায় রূপ নেবে।

দ্বিতীয়ত, সংযোগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে রাজধানীকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে আনতে পারে। বাংলাদেশের উন্নয়ন দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। এর ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত থেকেছে। একটি কার্যকর আঞ্চলিক করিডর এই ভৌগোলিক কেন্দ্রীভবন কিছুটা পরিবর্তন করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। যদি আঞ্চলিক করিডর বাস্তবায়িত হয় এবং এর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সড়ক, রেল, নৌপথ ও বন্দর অবকাঠামোর কার্যকর সংযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি এবং বৃহত্তর পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চল নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। শিল্প, গুদামজাতকরণ, পরিবহন, পর্যটন এবং বিভিন্ন সেবাখাতের বিকাশ স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার করতে পারে। এর ফলে রাজধানী ও কয়েকটি বড় শহরের ওপর কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের চাপ কিছুটা কমার পাশাপাশি আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে। উন্নয়ন অর্থনীতির ভাষায়, এটি অবকাঠামোকে শুধু প্রবৃদ্ধির উপকরণ হিসেবে নয়, বরং স্থানভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের (স্পেশাল ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট) হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ একটি ট্রানজিট ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পেতে পারে। বিশ্বের বহু সফল অর্থনীতি প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নয়, বরং তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে দক্ষ অবকাঠামো, বন্দর, বাণিজ্যিক সেবা এবং লজিস্টিকস সক্ষমতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করে গড়ে উঠেছে। সিঙ্গাপুর, দুবাই কিংবা নেদারল্যান্ডসের উদাহরণ দেখলে বোঝা যায়, কৌশলগত অবস্থান নিজে কোনো অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; সেটিকে সম্পদে পরিণত করতে প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, বাণিজ্যবান্ধব নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। বঙ্গোপসাগরের উপকূল, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য বন্দর, অভ্যন্তরীণ নৌপথ এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলের অবস্থানকে যদি সমন্বিত লজিস্টিকস ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে বাংলাদেশ শুধু নিজস্ব আমদানি-রপ্তানির গন্তব্য বা উৎস হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যসেবার একটি কেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে। এতে শুধু ট্রানজিট ফি নয়, বন্দরসেবা, গুদামজাতকরণ, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, বিমা, ব্যাংকিং, প্যাকেজিং, মেরামত, পরিবহন ও অন্যান্য সহায়ক সেবার মাধ্যমে বহুগুণ বেশি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে মিয়ানমার করিডরের প্রকৃত মূল্য শুধু একটি নতুন পথ পাওয়ার মধ্যে নয়; বরং সেই পথকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের নিজস্ব লজিস্টিকস অর্থনীতি কতটা বিকশিত হতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত।

তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রথমত, মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বর্তমানে এই ধরনের আঞ্চলিক সংযোগের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতাগুলোর একটি। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি সড়ক, রেল বা বাণিজ্যিক করিডর বাস্তবায়নকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে। একটি আন্তর্জাতিক করিডর শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না; তার জন্য প্রয়োজন নিরাপদ ভূখণ্ড, কার্যকর প্রশাসন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, আইনগত নিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতায় এসব পূর্বশর্ত অনিশ্চিত। ফলে বাংলাদেশের জন্য এই প্রশ্নটি কেবল অর্থনীতির নয়; নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার (স্ট্র্যাটিজিক রিস্ক ম্যানেজমেন্ট) সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ বর্তমানে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয়দাতা এবং এই সংকটের মূল উৎস মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। ফলে মিয়ানমারের সঙ্গে যেকোনো বৃহৎ সংযোগ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করার সময় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি মানবিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। বরং বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে এই যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে যে, আঞ্চলিক সংযোগ, সীমান্তবর্তী অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সফলতা অনেকাংশে রাখাইন অঞ্চলে টেকসই শান্তি, নিরাপদ পরিবেশ এবং জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠার ওপর নির্ভরশীল। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সংযোগকে শুধু অর্থনৈতিক অবকাঠামো হিসেবে না দেখে শান্তি ও উন্নয়নের পারস্পরিক সম্পর্কের অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা যায়। উন্নয়ন অধ্যয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো স্থিতিশীলতা ছাড়া অবকাঠামো টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে না; আবার অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক সুযোগের অভাবও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতাকে আরও গভীর করতে পারে। তাই মিয়ানমার করিডরের প্রশ্নে অর্থনৈতিক সংযোগ ও আঞ্চলিক শান্তিকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে যে সংযোগের সুবিধা একমুখী না হয়ে পারস্পরিক হয়। অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা গেছে, কিছু দেশ বৃহৎ করিডর প্রকল্পে অংশ নিয়েও প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে পারেনি। এর একটি কারণ হলো, তারা নিজেদের শিল্পভিত্তি, বন্দর সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ, স্থানীয় সরবরাহশৃঙ্খল এবং নীতিগত প্রস্তুতিকে একই গতিতে এগিয়ে নিতে পারেনি। ফলে করিডর দিয়ে পণ্য চলে গেলেও তার বড় অংশের মূল্য সংযোজন অন্যত্র থেকে গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই ঝুঁকি বিবেচনা করা জরুরি। শুধু রাস্তা বা রেলপথ নির্মাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিল্পনীতি, বন্দর উন্নয়ন, কাস্টমস সংস্কার, লজিস্টিকস অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি, ডিজিটাল বাণিজ্যব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সমন্বয়। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি করিডর অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে দেশটি শুধু ট্রানজিটের ভূখণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হবে না; বরং উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন, আর্থিক সেবা এবং পুনঃরপ্তানির মাধ্যমে করিডরের অর্থনৈতিক মূল্যশৃঙ্খলের (ভ্যালু চেইন) একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারবে।

এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন করিডর কোনো লক্ষ্য নয়; করিডর হলো একটি মাধ্যম। লক্ষ্য হলো জাতীয় সমৃদ্ধি। কোনো সংযোগ প্রকল্পের মূল্যায়ন তাই শুধু কত কিলোমিটার সড়ক বা রেলপথ নির্মিত হবে, কত পণ্য পরিবাহিত হবে কিংবা কত ট্রানজিট রাজস্ব আসবে এসব সূচকে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দেখতে হবে, সেই সংযোগ বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়াতে পারছে। একই সঙ্গে এর পরিবেশগত, সামাজিক, নিরাপত্তাগত ও আর্থিক ঝুঁকিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। অর্থাৎ একটি প্রকল্পের সাফল্য নির্ধারিত হবে তার অবকাঠামোগত আকার দিয়ে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নে তার নিট অবদানের মাধ্যমে।

এই কারণেই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। তারা চাইলে দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কেবল মানচিত্রের একটি বাস্তবতা হিসেবে রেখে দিতে পারেন; আবার চাইলে অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিল্প, মানবসম্পদ ও কূটনীতির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে সেটিকে অর্থনৈতিক শক্তি ও কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করতে পারেন। মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে স্থলপথে সংযোগের প্রশ্নটি সেই বৃহত্তর সম্ভাবনারই একটি অংশ। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত অতি-আশাবাদী বা অতি-সন্দেহপ্রবণ কোনোটিই নয়; বরং সম্ভাবনা, ব্যয়, ঝুঁকি ও জাতীয় স্বার্থের একটি সুসংহত মূল্যায়নের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে এগোনো। মিয়ানমারের পরিস্থিতি অনুকূল হলে যাতে বাংলাদেশ প্রস্তুত থাকে, আবার পরিস্থিতি অনুকূল না হলে যাতে অতিরিক্ত ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে এই দ্বৈত প্রস্তুতিই হতে পারে বাস্তববাদী নীতির ভিত্তি। শেষ পর্যন্ত মিয়ানমার করিডরের প্রকৃত গুরুত্ব এখানেই: এটি শুধু চীনের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য নতুন পথ নয়; বরং বাংলাদেশের ভূগোলকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনে রূপান্তর করা যায়, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে স্থলপথে সংযোগের সম্ভাবনা তাই একই সঙ্গে আকর্ষণীয় এবং জটিল। একদিকে চীনের ইউনান প্রদেশকে মিয়ানমার হয়ে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা, অন্যদিকে মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, রাখাইন অঞ্চলের সংঘাত, রোহিঙ্গা সংকট এবং সীমান্ত নিরাপত্তার বাস্তবতা সবকিছু মিলিয়ে এটি এমন একটি উদ্যোগ, যার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। বিশেষ করে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত যে কোনো আন্তঃরাষ্ট্রীয় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন এমন একটি নীতি, যেখানে সম্ভাব্য করিডরকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার ওপর।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে রোহিঙ্গা সংকটও এই সমীকরণের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয়দাতা হওয়ায় মিয়ানমারের সঙ্গে বৃহৎ আঞ্চলিক সংযোগ নিয়ে আলোচনায় মানবিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পাবে। তাই বাংলাদেশ চাইলে সংযোগের প্রশ্নটিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় রাখাইন অঞ্চল শুধু মিয়ানমার বা বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং বৃহত্তর বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের জন্যও অর্থনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে সংযোগ ও শান্তি এই দুটি বিষয়কে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং পরস্পর-নির্ভরশীল উন্নয়ন প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, করিডরের সম্ভাব্য সুবিধা যেন শুধু ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে পণ্য চলাচলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে করিডর প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সবসময় সমান অর্থনৈতিক মূল্য অর্জন করতে পারেনি। কারণ করিডরের সঙ্গে নিজেদের শিল্প, বন্দর, লজিস্টিকস, মানবসম্পদ, প্রযুক্তি ও নীতিগত সক্ষমতাকে যথেষ্ট দ্রুত সংযুক্ত করতে না পারলে একটি দেশ মূলত ট্রানজিট ভূখণ্ডে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন ‘করিডর থেকে অর্থনীতি’ এবং ‘অর্থনীতি থেকে মূল্য সংযোজন’ এই দুই ধাপকে একসঙ্গে পরিকল্পনা করা। চট্টগ্রাম ও অন্যান্য বন্দর, পূর্বাঞ্চলের শিল্পভিত্তি, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, সড়ক-রেল-নৌ সংযোগ, কাস্টমস ব্যবস্থা এবং দক্ষ মানবসম্পদকে সমন্বিতভাবে উন্নত করতে পারলে সম্ভাব্য করিডর বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে।

এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন করিডর কোনো লক্ষ্য নয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, করিডর হলো একটি মাধ্যম আর লক্ষ্য হলো জাতীয় সমৃদ্ধি। যদি কোনো সংযোগ প্রকল্প বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে, তবে তা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। আবার যদি কোনো প্রকল্পের ব্যয়, ঝুঁকি, নিরাপত্তাগত দায় বা অর্থনৈতিক নির্ভরতা সম্ভাব্য সুবিধাকে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে শুধু ভূ-রাজনৈতিক আকর্ষণের কারণে সেটিকে গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত প্রকল্পকেন্দ্রিক নয়, ফলাফলকেন্দ্রিক। জাতীয় স্বার্থে কোন পথ নির্মিত হচ্ছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই পথ বাংলাদেশের মানুষের জন্য কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করছে সেটা বিবেচনায় নেওয়া।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে তাই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কেবল মানচিত্রের বাস্তবতা হিসেবে রেখে দেওয়া যায়; আবার অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিল্প, মানবসম্পদ, কূটনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে সেটিকে অর্থনৈতিক শক্তি ও কৌশলগত সম্পদে রূপান্তরও করা যায়। মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে স্থলপথে সংযোগ সেই বৃহত্তর সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বিবেচনার বিয়য়। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথ সরল নয় এবং এর সময়সীমাও অনিশ্চিত। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে দূরদর্শী পদক্ষেপ হতে পারে সম্ভাব্য সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা তৈরি করা, সম্ভাব্য রুট ও বিকল্প রুট নিয়ে সমীক্ষা চালানো, বন্দর ও লজিস্টিকস সক্ষমতা বাড়ানো, সীমান্ত অবকাঠামো আধুনিক করা এবং একই সঙ্গে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখা।

শেষ পর্যন্ত মিয়ানমার করিডর বাংলাদেশের জন্য শুধু চীনের সঙ্গে একটি নতুন স্থলপথের সম্ভাবনা নয়; এটি নিজের ভূগোলকে কীভাবে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা যায়, তার একটি বড় সুযোগ ও পরীক্ষা। বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি তাই কেবল ‘চীনের সঙ্গে সংযোগ হবে কি না’ এতটুকু নয়; বরং ‘সংযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশ তার কতটা মূল্য নিজের অর্থনীতি, শিল্প ও মানুষের উন্নয়নে রূপান্তর করতে পারবে’ সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যদি জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সমন্বিত করে এগোনো যায়, তবে বঙ্গোপসাগর থেকে ইউনান পর্যন্ত সম্ভাব্য এই সংযোগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। ভূগোল তখন আর শুধু অবস্থান থাকবে না; সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার মাধ্যমে সেটিই হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি।

(পর্ব-৪ : চলবে)

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।

পাঠকের মতামত:

১৫ অক্টোবর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test