E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

দেশের গন্ডি পেরিয়ে দিনাজপুরের আলু এখন বিশ্ববাজারে

২০২৬ মে ০৬ ১৮:৩০:০৫
দেশের গন্ডি পেরিয়ে দিনাজপুরের আলু এখন বিশ্ববাজারে

শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর : দিনাজপুরের আলু এখন বিশ্ববাজারে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন-বিএডিসির উদ্যোগে দেশের সীমানা পেরিয়ে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে দিনাজপুরের আলু। সালমা রহমান নামে এক নারী উদ্যোক্তা বিদেশে আলু রপ্তানি করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তিনি উচ্চ মূল্য কৃষকের কাছে আলু ক্রয় করে বিদেশে রপ্তানি করছেন। কৃষক
অন্যান্য ফসলের চেয়ে লাভ বেশি হওয়ায় আলু চাষে ঝুঁকছেন।

বাছাই, ওজন, প্যাকিং, উত্তোলন,বহনসহ নানান কাজে স্থানীয় আলু চাষিদের পাশাপাশি, কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা বেড়েছে। বিদেশে আলু রপ্তানি হওয়ায় এই দৃশ্য এখন প্রতিনিয়ত চোখে পড়ছে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায়। দেশের সীমানা পেরিয়ে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে দিনাজপুরের আলু। বিশ্ববাজারে দিনাজপুরের আলু স্থান পাওয়ায় অনেকের হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও আলু বাছাই ও প্যাকেট করায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।

কর্মরত নারী শ্রমিক আলেয়া বেগম জানালেন, বিদেশে আলু রপ্তানিকারক নারী উদ্যোক্তা সালমা ম্যাডামের এখানে কাজ করে আমার সংসার চলছে। স্বামী অসুস্থ্য হয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় পড়ে আছে। আমার উপার্জিত টাকা দিয়ে সংসার পরিচালনা, স্বামীর চিকিৎসা ও সন্তানের পড়া-লেখা চলছে। শুধু আমি নয়, এখানে নারী-পুরুষ সাড়ে তিনশো মানুষ কাজ করছি।

ভবেশচন্দ্র, উজির, রমজান, আরমান, চানমিয়া, শান্তনা, মরিয়ম, শর্মিলা, নেপাল চন্দ্র, আজাহার, আকবর, নুরুল ইসলামসহ অনেকেই জানালেন, আলু বিদেশে রপ্তানি মৌসুমে তারা উপার্জন ভালোই করেন। সংসারও চলে ভালো। কিন্তু মৌসুম শেষ হলে তাদের অন্য কাজ খুঁজতে হয়। অনেক সময় কাজ না। পরিবার-পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়। এই কাজ স্থায়ী হলে তারা ভালো থাকতে পারতেন। কিন্তু, স্থায়ী না হওয়ায় তারা সমস্যায় ভুগছেন।

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশেও রপ্তানি হচ্ছে নারী উদ্যোক্তা সালমা রহমানের আলু। চলতি মৌসুমে তিনি বিদেশে রপ্তানি করেছেন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেট্রিক টন আলু।
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার নওপাড়া তরতবাড়ী এলাকায় বিশাল পরিধি নিয়ে গড়ে তোলা এগ্রোনমি এক্সপার্ট ইনপোর্ট প্রা: লি: ও এগোনমি ইনোভেটিভ এগ্রো এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নারী

উদ্যোক্তা সালমা রহমান জানালেন, ২০২১ সাল থেকে তারা বিদেশে আলু রপ্তানি করে আসছেন। অপ্রত্যাশিত সড়ক দূর্ঘটনায় তার স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি নিজেই এই হাল ধরেছেন। মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আলু রপ্তানি করে আসছেন। রাজধানী ঢাকার নয়া পল্টন চায়না টাউনে তাদের অফিস রয়েছে। এবছর বিএডিসির বীজ প্লট নিয়ে তিনি প্রায় ৭ শত বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছেন, কন্ট্রাক্ট গ্রোর মাধ্যমে। সেই প্রসেসিং করে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছেন। তিনি ইতোমধ্যে সাড়ে তিন হাজার মেট্রিক টন আলু রপ্তানি করেছেন। তবে এ বছর তার পাঁচ হাজার মেট্রিক টন আলু রপ্তানির টার্গেট রয়েছে। তিনি কৃষক পর্যায়ে ১৭ টাকা কেজি দিরে আলু ক্রয় করেছেন।

সরকারকে রপ্তানিকারক প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার আহবান জানিয়ে নারী উদ্যোক্তা সালমা রহমান আরো জানান, সরকার যদি ইনোভেটিভ বাড়িয়ে দেন, তাহলে আমরা আরো বেশি আলু বিদেশে রপ্তানি করতে পারবো। কারণ, পাকিস্তানের কারণে আমরা আলু রপ্তানিতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছি। আমার এই প্রতিষ্ঠানে সাড়ে পাঁচশো কৃষক-শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সরকারের সহযোগিতা একান্ত কাম্য।

শুধু সালমা রহমান নয়, বিএডিসির উদ্যোগে অনেক ব্যবসায়ি দিনাজপুরের আলু বিদেশে রপ্তানি করছেন। প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি আলু ক্রয় করে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে আলু রপ্তানি করছেন মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে।

বিদেশে আলু রপ্তানিকারক আনিস উদ্দীন রিয়াজ জানান, এখন সানশাইন জাতের আলু রপ্তানি করছি।মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, শ্রীলংকাসহ বিভিন্ন দেশে আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। বিএডিসি থেকে বীজ নিয়ে এ জাতের আলু উৎপাদন এবং বিদেশে রপ্তানিতে বেশ সাফল্য অর্জিত হয়েছে আমাদের। কিন্তু একদিক দিয়ে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। কারণ, আলু অল্প সময়ের জন্য উঠে। ৪০/৪৫ দিনে মাঠ খালি হয়ে যায়। এই আলু রেখে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে যদি আমরা আলু রপ্তানি করতে পারি, তাহলে পাকিস্তান আমাদের কাছে হেরে যাবে। আমরাই বিশ্বের আলু বাজার দখল করে রাখতে পারবো। এজন্য আলু সংরক্ষণে ওয়্যার হাউজ প্রয়োজন। ওয়্যার হাউজ এ রেখে সারা বছর আমরা আলু রপ্তানি করতে পারবো।

এখন আমরা যে আলু পাঠাই তা আস্তে আস্তে কালার (রং) নিষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে হিমগার- ওয়্যার হাউজ এর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। তাহলে আমরা সারা বছর আলু রপ্তানি করতে পারবো। আগে প্রমোদনা ছিলো ২৫ শতাংশ। এখন তা কমিয়ে ৫ থেকে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে আমাদের ক্ষতি হচ্ছে। কৃষক উৎসাহ হারাচ্ছে। বাজারে ৭/৮ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু আমরা বিএডিসি কৃষক পর্যায় থেকে বাছাইকৃত আলু নিচ্ছি ১৭ টাকা কেজি দরে। মাঠ থেকে হাউজে আনতে আমাদের ১৮ টাকা পড়ছে। আমরা যাদের কাছে আলু নিচ্ছি তারা লাভ পাচ্ছেন। কিন্তু বাজারে আলু বিক্রি করে কৃষকের উৎপাদন খরচ উঠছেনা। তাই কৃষকের পাশে সরকারের দাঁড়ানো উচিৎ।

মূলত: সানসাইন অর্থাৎ বিএডিসি আলু-এক জাতের আলু বেশি রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। আর এ জাতের আলু উৎপাদন ও বিদেশে রপ্তানিতে সহযোগিতা এবং পরামর্শ দিয়ে আসছে,বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন-বিএডিসি।

বিএডিসির দিনাজপুর অঞ্চলের উপপরিচালক আবু জাফর মোহাম্মদ নেয়ামতউল্লাহ্ জানিয়েছেন, 'মূলত: ২০২১ সাল থেকে দিনাজপুরের আলু বিশ্ববাজারে স্থান পেলেও এবার প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি হয়েছে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে। এক সময় আলু রপ্তানি নিয়ে সমস্যায় ছিলাম আমরা।তখন উন্নত জাতের আলু ছিলো না। বর্তমানে সানসাইন অর্থাৎ বিএডিসি আলু-এক বায়ারদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে।তাদের চাহিদা অনুযায়ী সানসাইন অর্থাৎ বিএডিসি আলু-এক এর সাইজ, সেভ, কালার সবগুলোই আকর্ষণী হওয়ার বিদেশে আলু রপ্তানি বাড়ছে। পাকিস্তান এক সময় বেশি আলু রপ্তানি করতো, সেই জায়গাটি অলরেডি বাংলাদেশ দখল করতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের মুজিকা জাতের আলুর স্থান এখন বাংলাদেশের সানসাইন অর্থাৎ বিএডিসি আলু-এক দখল করতে পেরেছে। আমাদের আলু রপ্তানি বেড়ে যাচ্ছে বহুগুনে। আমরা উন্নত মানের আলু বীজ দিয়ে সহায়তা করায় অনেকে এখন আলু উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় ৪৫ থেকে ৮৬ শতাংশ, সিংগাপুরে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ, নেপালে ২২ থেকে ৫৯ শতাংশ এবং শ্রীলংকায় ২ থেকে ৬৫ শতাংশ আলু রপ্তানি বেড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ০.৩৬ শতাংশ,ভারত থেকে ০.৮৬ শতাংশ এবং পাকিস্তান থেকে ১৫ শতাংশ আলু বিশ্ববাজারে রপ্তানি হচ্ছে।

(এসএস/এসপি/মে ০৬, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

০৬ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test