E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

জুমের ধান কাটায় ব্যস্ত জুমিয়ারা, রয়েছে কিছু আক্ষেপও

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২২ ১৫:১৯:৫৩
জুমের ধান কাটায় ব্যস্ত জুমিয়ারা, রয়েছে কিছু আক্ষেপও

রিপন মারমা, কাপ্তাই : আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রায় জুমচাষ আজও তাদের জীবিকা নির্বাহের মূল চালিকাশক্তি ও অবিনাশী ঐতিহ্য। রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার দুর্গম পাহাড়গুলোতে এখন চলছে জুমের সোনালি ধান কাটার ধুম ও ধান মাড়াইসহ উৎসবমুখর ব্যস্ততা। বহুমুখী প্রতিকূলতা ও নানা সংগ্রামের মধ্যেও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার এই লড়াইয়ে জুমিয়াদের মুখে যেমন সোনালি হাসির ঝিলিক রয়েছে, তেমনি রয়েছে কিছু না পাওয়ার আক্ষেপ ও হতাশা।

কাপ্তাই উপজেলার চিৎমরম জামাইছড়ি, সীতাপাহাড়, চাকুয়াপাড়া, মৈদং, আড়াছড়ি, কাপ্তাই হরিণছড়া, ব্যাঙছড়ি, ওয়াগ্গা রামপাহাড় এবং মইংপাড়াসহ পাহাড়জুড়ে এখন জুমচাষের এক নান্দনিক সমারোহ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে চিৎমরমের জামাইছড়ি প্রায় এক হাজার ফুট উঁচুতে মারমা সম্প্রদায়ের জুমিয়ারা বংশপরম্পরায় এই প্রাচীন চাষাবাদ চালিয়ে আসছেন।

চলতি মৌসুমে কাপ্তাই উপজেলায় মোট ৩৩৬ হেক্টর জমিতে জুমচাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে পাহাড়ি জাতের বিভিন্ন ধানের ব্যাপক আবাদ হয়েছে। জুমচাষকৃত ধানগুলোর মধ্যে রয়েছে তুর্কি ধান, গ্যালন ধান, দুলি ধান, মাংসাই ধান, বাসমতি ধান, বাঁশ ধান, পাত্তিকী ধান, বিন্নি ধান (সাদা ও লালসহ) এবং কবরকসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি জাত।

ধানের পাশাপাশি জুমের বহুমুখী ফসলের তালিকায় রয়েছে— কলা, হলুদ, আদা, পেঁপে, পাহাড়ি আলু, তিল-তিষী, পাহাড়ি মরিচ, বেগুন, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, শিম, ভুট্টাসহ হরেক রকমের শাকসবজি।

পাহাড়ে জুমচাষ করা মুখের কথা নয়। তীব্র রোদ, বৃষ্টি আর বন্যপ্রাণীর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় ছোট্ট মাচাং ঘর তৈরি করে রাত পাহারা দেন জুমচাষিরা। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে পাহাড় পরিষ্কার করে জুমের উপযোগী করার পর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে বীজ রোপণ করা হয়। এরপর তিন মাস পর ভাদ্র মাস থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে এসব ফসল ঘরে তোলেন জুমিয়ারা। বর্ষার বৃষ্টির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে পরিচালিত এই চাষাবাদে জুমিয়াদের প্রচুর শারীরিক শ্রম দিতে হয়।

জুমিয়াদের তথ্যমতে, জুমচাষে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হলেও উপযুক্ত আবহাওয়া ও ভালো ফলন পেলে দুই লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব হয়। তবে এবারে ফলন নিয়ে কিছু হতাশার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা। সময়মতো কীটনাশক ও সঠিক পরিচর্যার অভাবে কিছু ধান ও নানাবিধ ফসল পোকার আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় জুমিয়া সুইহ্লামং মারমা ও উসুইসিং মারমা আক্ষেপ করে জানান, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে যদি সময়মতো নিয়মিত সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা পেতেন, তবে তাঁরা আরও অনেক বেশি লাভবান হতে পারতেন।

এছাড়া পানির তীব্র সংকট কৃষকদের উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল ফলানোর ক্ষেত্রে সরকারিভাবে সেচ বা পানির ব্যবস্থা করলে তাঁরা আরও বড় পরিসরে চাষাবাদ করতে পারতেন বলে আশা প্রকাশ করেন মৈদং ও ব্যাঙছড়ি পাহাড়ের জুমচাষি সাইংসুই ও স্বপ্না মারমা।

কাপ্তাই উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের বিভিন্ন পাহাড়ি জমিতে নিয়মিত জুমচাষ হয়ে থাকে। এ বিষয়ে কাপ্তাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (কৃষিবিদ) মো. আহসান হাবীব জানান, পাহাড়ের মানুষের কাছে জুমচাষ একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা এবং কৃষি বিভাগ থেকে তাঁদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হয়ে থাকে। জুমচাষের ফলে পাহাড়ি মাটির কিছু ক্ষতি হলেও প্রতিবছর স্থান পরিবর্তন করে চাষ করার কারণে বড় ধরনের ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ মানুষ জুম নির্ভর। জুমের ফলন ভালো হলে পাহাড়ে খাদ্য ঘাটতি দেখা যায় না। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যদি জুমচাষ করা যায় এবং উন্নত জাতের বীজ ও সার সহজলভ্য হয়, তবে ফলন দুই থেকে তিন গুণ বাড়বে। এতে জুমিয়ারা কেবল নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফসল বিক্রি করতে পারবেন এবং একই জমিতে সারা বছর চাষাবাদের সুযোগ সৃষ্টি হলে তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে।

প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি করে বেঁচে থাকা কাপ্তাইয়ের এই পাহাড়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের জুমচাষ কেবল জীবিকার তাগিদ নয়, এটি তাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও টিকে থাকার এক অনন্য সংগ্রামের গল্প।

(আরএম/এএস/সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test