E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

 

ব্র্যাকের আরও তিনটি শিখন তরীর উদ্বোধন

২০২৬ জুন ১৫ ১৮:২৯:৪৫
ব্র্যাকের আরও তিনটি শিখন তরীর উদ্বোধন

স্টাফ রিপোর্টার : শিশুদের পরিবেশ, ডিজিটাল ও ইতিহাস বিষয়ে শেখাতে ব্র্যাকের অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন তরীর বহরে তিনটি নতুন তরী যুক্ত হয়েছে। এ নিয়ে ব্র্যাকের শিখন তরীর সংখ্যা দাঁড়াল ৬-এ। এসব ভাসমান শিক্ষাক্ষেত্র নদীকে পরিণত করছে শ্রেণিকক্ষে এবং খেলাধুলা ও হাতে-কলমে শেখার অভিজ্ঞতা পৌঁছে দিচ্ছে দেশের সবচেয়ে দুর্গম নদীভাঙন ও হাওরাঞ্চলের শিশুদের কাছে। এসব তরী নদীবেষ্টিত অঞ্চলের শিশুদের এমন সব প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, যেগুলোর অভিজ্ঞতা তারা আগে কখনও পায়নি।

নারায়ণগঞ্জের কদম রসুল দরগাহ মাঠে আজ সোমবার, নতুন শিখন তরীগুলো উদ্বোধন করেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্‌। শিখন তরীর কার্যক্রম ও উপকরণগুলো বিশেষভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য সাজানো হয়েছে, তবে অন্যান্য শিক্ষার্থী এবং দর্শকেরাও এখানে শেখার আনন্দ অনুভব করতে পারবেন।

অনুষ্ঠানে আসিফ সালেহ্‌ বলেন, মুখস্তবিদ্যা দিয়ে হয়তো পরীক্ষায় পাস করা যায়, কিন্তু বাস্তব জীবনে সমস্যার সমাধান করা যায় না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় ঘাটতি হলো, শ্রেণীকক্ষে শেখার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সংযোগটি শিক্ষার্থীদের সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয় না।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে সমস্যা অনেক, কিন্তু সমাধান দেওয়ার মানুষ কম। আমি চাই শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সমস্যা সমাধানের জন্য যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক। ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হলে শুধু তথ্য মুখস্ত করলেই হবে না; বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।

আসিফ সালেহ্ বলেন, আমরা বইয়ে যা পড়ি, খবর ও ইন্টারনেটে যা দেখি, সেগুলোকে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বোঝার সুযোগ তৈরি করাই শিখন তরীর মূল উদ্দেশ্য। এ কারণেই এই নৌকাগুলা দেশর বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করবে এবং শিক্ষার্থীদের সরাসরি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানা, বোঝা ও শেখার সুযোগ সৃষ্টি করবে।

অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মাইগ্রেশন কর্মসূচির পরিচালক সাফি রহমান খান বলেন, ব্র্যাকের জন্য এই তরীগুলো শুধু শিক্ষার উপকরণ নয়। এগুলো এমন কিছু জায়গা, যা শিশুদের কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করে এবং এমন সব জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যেগুলোর অভিজ্ঞতা তারা অন্য কোথায়ও হয়তো কখনো পেত না।

ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির হেড অব সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজেস নিভিন রেজা বলেন, হাওর ও নদীবেষ্টিত অঞ্চলের শিশুদের জন্য এই তরীগুলো অনেক সময় প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, রোবোটিকস, পরিবেশগত সিমুলেশন, অগমেন্টেড রিয়েলিটি, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, ইন্টারঅ্যাকটিভ গল্প বলা কিংবা হাতে-কলমে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শিবানী সরকার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাইয়ুম খান এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজমল হোসেন। তারা শিখন তরীগুলো ঘুরে দেখেন।

২০১১ সালে ব্র্যাক দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যাপ্রবণ এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষাচালু করেছিল শিক্ষাতরী। সেই কার্যক্রম শেষ হয়ে গেলে কয়েকটি তরী অবশিষ্ট ছিল। ব্র্যাকের ৫০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির উদ্যোগে এই তরীগুলোকে খেলাধুলা ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শেখার জায়গায় রূপান্তর করা শুরু হয়। চালু হয় ব্র্যাকের অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন তরী। প্রথম তিনটি তরী ছিল বিজ্ঞান, গণিত ও মূল্যবোধভিত্তিক।

নতুন তরীগুলোর মধ্যে পরিবেশ তরী তুলে ধরেছে বাংলাদেশের শিশুদের জীবনের অন্যতম বড় বাস্তবতা জলবায়ু পরিবর্তনকে। ভাসমান পরিবেশভিত্তিক শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে তৈরি এই তরীতে শিশুরা পরিবেশ সচেতনতা, টেকসই জীবনধারা, জীববৈচিত্র্য, দূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য এবং পরিবেশগত দায়িত্ববোধ সম্পর্কে শিখছে।

ডিজিটাল তরী নদীবেষ্টিত অঞ্চলের শিশুদের এমন সব প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, যেগুলোর অভিজ্ঞতা তারা আগে কখনও পায়নি। তরীর ভেতরে শিশুরা অংশ নিতে পারবে অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর), ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর), রোবোটিকস ও ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিজিটাল লার্নিং কার্যক্রম।

ইতিহাস তরীতে প্রবেশ করে শিশুরা ছয়টি ভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে। তরীর ভেতরে রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানভিত্তিক কার্যক্রম, খনন অভিজ্ঞতা, গল্পভিত্তিক ইনস্টলেশন, চিত্রভিত্তিক বর্ণনা এবং মানচিত্রভিত্তিক অনুসন্ধান, যার মাধ্যমে শিশুরা বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে।

ভোলা থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত নদীপথে ভ্রমণ করা এই উদ্যোগ ইতিমধ্যে ১৬টি জেলার ৭৭টি স্থানে পৌঁছে দিয়েছে আনন্দময় ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা। এ পর্যন্ত এই তরীগুলোর মাধ্যমে শেখার সুযোগ পেয়েছে ৭৯ হাজার ১৮৫ জন শিক্ষার্থী; ৪৬২ জন নারী স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞান, গণিত, মূল্যবোধ, ইতিহাস, পরিবেশ ও ডিজিটাল প্রযুক্তি এই ছয়টি বিষয়ে এমন শিক্ষার অভিজ্ঞতা অনেক শিশুর কাছেই ছিল সম্পূর্ণ নতুন।

প্রতিটি তরী একটি এলাকায় সাধারণত সাত থেকে ১০ দিন অবস্থান করে এবং প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এতে শিশুদের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষও অংশ নিতে পারেন। প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের সহজে প্রবেশ নিশ্চিত করতে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ র‌্যাম্প।

ব্র্যাকের অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন তরী কেবল শিশুদের আনন্দ দেওয়ার উদ্যোগ নয়। এটি জলবায়ু সংকট, শিক্ষাবৈষম্য, সীমিত অভিজ্ঞতা, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও সুযোগের অসমতার মতো বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি নতুন প্রচেষ্টা। ব্র্যাকের কাছে এই তরীগুলো এমন এক ভবিষ্যতের প্রতীক, যেখানে নদী কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়, বরং হয়ে ওঠে সম্ভাবনার পথ।

(পিআর/এসপি/জুন ১৫, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১৫ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test