E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

ব্র্যাকের প্রশিক্ষণ শেষে নারীরা পেলেন পেশাদার চালকের সনদ 

২০২৬ জুন ২৩ ১৮:৪৮:৪৭
ব্র্যাকের প্রশিক্ষণ শেষে নারীরা পেলেন পেশাদার চালকের সনদ 

স্টাফ রিপোর্টার : চাহিদা সত্ত্বেও দেশে প্রশিক্ষিত নারী চালকের অভাব রয়েছে। যানবাহন চালনায় আগ্রহ থাকলেও লাইসেন্সধারী নারী চালকের সংখ্যা এখনো বেশ কম, পেশাদার নারী চালকের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। নারীরা চালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের চলাচল, আয় এবং আর্থিক স্বাধীনতার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ জন্য প্রয়োজন উন্নতমানের প্রশিক্ষণ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।  

আজ মঙ্গলবার ঢাকার মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা এসব কথা বলেন।

পেশাদার নারী চালকদের প্রশিক্ষণের সমাপনী ও সনদ বিতরণ উপলক্ষে ‘চালকের আসনে নারী: সাফল্য উদযাপন, সড়ক নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও অন্তভুর্ক্তিমূলক পরিবহন খাত’ (উইমেন বিহাইন্ড দ্য হুইল: সেলিব্রেটিং অ্যাচিভমেন্ট, অ্যাডভান্সিং রোড সেফটি অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ট্রান্সপোর্ট) শীর্ষক অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য আন্না মিনজ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তামারা হাসান আবেদ।

নারী চালকদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক আহমেদ নাজমুল হুসেইন। কর্মসূচির প্রকল্প ব্যবস্থাপক এম খালিদ মাহমুদ অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে সমাপনী বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের ড্রাইভিং স্কুলে সফল প্রশিক্ষণ শেষে পেশাদার চালকের আসনে বসতে প্রস্তুত এমন ১০ জন নারীর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ তুলে দেওয়া হয়। এই নারীরা ব্র্যাক ড্রাইভিং স্কুলে তিন মাসের নিবিড় আবাসিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। সর্বাধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধাসম্পন্ন এই গাড়িচালনা প্রশিক্ষণে তারা তাত্ত্বিক ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এর পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগের প্রশিক্ষণ এবং জেন্ডার ও সুরক্ষা (সেফগার্ডিং) বিষয়ক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণও পেয়েছেন। ব্র‍্যাক ড্রাইভিং স্কুল এখন পর্যন্ত ১৫৯ জন নারীকে পেশাদার চালক হিসেবে প্রস্তুত করেছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাবিবুর রশিদ বলেন, সামাজিক বাধা ও প্রচলিত ধারণার কারণে পরিবহন খাতে নারীদের উপস্থিতি দীর্ঘদিন খুবই সীমিত ছিল। বর্তমান সরকার প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, গতিনিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মতো নানা উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট বাস-সেবা, নারী চালকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং লাইসেন্স উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

হাবিবুর রশিদ বলেন, ব্র্যাক সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচি নারী চালকদের প্রশিক্ষণ, মোটরসাইকেল চালনা প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে। বিশেষ করে গণপরিবহন ও জনপরিসরে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তাদের অবদান প্রশংসার দাবি রাখে। প্রশিক্ষিত নারী চালকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা সমাজে নারীর সক্ষমতার একটি শক্তিশালী উদাহরণ তৈরি করেছেন। প্রতিমন্ত্রী ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বলেন, তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে এবং দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি সংসদ সদস্য আন্না মিনজ বলেন, পেশাদার নারী চালক তৈরির এই উদ্যোগটি নারীকে সমৃদ্ধ করার একটি অনন্য উদাহরণ। তবে নারী চালকদের দুটি চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারীরা বাস বা গণপরিবহন চালাবে, এটি সহজে মেনে নিতে আমাদের সমাজ এখনো প্রস্তুত নয়। তাই এই পেশায় নারীদের কর্ম সংস্থানের সুযোগ এখনো সীমিত। দ্বিতীয়ত, জনপরিসরে নারীদের টয়লেট বা অন্যান্য সুযোগসুবিধার বিষয়গুলো এখনো সেভাবে গড়ে উঠেনি। তবে সরকার নারীদের জন্য যে বিশেষ গণপরিবহনের পরিকল্পনা নিয়েছে, সেখানে ব্র্যাকের এই প্রশিক্ষিত চালকেরা বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান বলেন, গণপরিবহনে নারী যাত্রী এবং নারী চালকদের জন্য আরও সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে বিআরটিএ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যোগ্য নারী চালকেরা যাতে লাইসেন্স প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যথাযথ সহযোগিতা ও সেবা সহজে পান, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সহায়তা করা হবে। নিরাপত্তা ও দক্ষতার মান বজায় রেখে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে আরও নারীবান্ধব করার জন্য কাজ চলছে।

সভাপতির বক্তব্যে ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তামারা হাসান আবেদ বলেন, আজকের এই আয়োজন নারীর ক্ষমতায়ন, নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবহন ব্যবস্থার প্রতি সম্মিলিত অঙ্গীকারের একটি উজ্জ্বল প্রতিফলন। মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে একটি ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্র্যাক দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। দক্ষ ও দায়িত্বশীল চালক তৈরি এবং নিরাপদ সড়ক ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে ব্র্যাক সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেশের সড়ক নিরাপত্তা খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে।

তামারা হাসান আবেদ বলেন, এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত এই দক্ষ নারী চালকদের জন্য দেশে এবং দেশের বাইরে আরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দক্ষ নারী চালকদের চাহিদা বাড়ছে। ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের পাশাপাশি একজন নারী ড্রাইভারকে মৌলিক নার্সিং সংক্রান্ত কেয়ারগিভিং দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণও যুক্ত করা যেতে পারে। এতে করে নারীরা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বহুমুখী চাহিদার সঙ্গে আরও ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারবেন এবং বিদেশে উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করবেন।

আহমেদ নাজমুল হুসেইন ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু করেন। তারই ধারাবাহিকতায় এসব কার্যক্রম চলছে। এই নারী চালকেরা তিন মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ পেয়েছে। এর পর ব্র্যাকের ট্রান্সপোর্ট বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জ্যেষ্ঠ গাড়িচালকদের অধীনে শিক্ষানবিশ পেশাদার গাড়িচালক হিসেবে আরও তিন মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০০১ সাল থেকে ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সড়ক ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা বাড়ানো এই কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কমিউনিটি পর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ সড়ক ব্যবহার সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ প্রদান। এ ছাড়া এই কর্মসূচির আওতায় গণপরিবহনে নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবহন খাতের কর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানো, পরিবহন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে।

২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক ড্রাইভিং স্কুল থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে ১৩ হাজার প্রশিক্ষণার্থীকে ডিফেন্সিভ চালনা ও সাড়ে ১২ হাজার প্রশিক্ষণার্থীকে সাধারণ চালনা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৪০৯ জনকে গাড়ি চালনার প্রশিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।

(পিআর/এসপি/জুন ২৩, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

২৩ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test