E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

‘১৫ বছরের ভুল নীতিতে জ্বালানি খাত গভীর সংকটে’

২০২৬ জুলাই ২৩ ০০:৩১:২১
‘১৫ বছরের ভুল নীতিতে জ্বালানি খাত গভীর সংকটে’

স্টাফ রিপোর্টার : বিগত সরকারের ১৫-১৬ বছরের দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাব ও ভুল নীতির কারণে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত গভীর সংকটে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। এ সংকট থেকে উত্তরণ এবং খাতটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার (২২ জুলাই) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরের একটি ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে।

বিচার বিভাগ থেকে গণমাধ্যম-কোনো ক্ষেত্রই এর বাইরে ছিল না। বিশেষ করে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার উপলব্ধি হয়েছে, গত দেড় দশকে জ্বালানি খাতে কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল না; যা হয়েছে, তা ছিল কেবল ধোঁকাবাজি।

তিনি বলেন, বিগত সরকার ২৮ থেকে ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলে বাহবা নেওয়ার চেষ্টা করেছে। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল ভিত্তি যে জ্বালানি, সেই জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
গত ১৫ বছরে দেশে একটি নতুন গ্যাসকূপও খনন করা হয়নি। পুরো দেশকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।

আমদানিনির্ভরতার পরিণতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশে এলএনজি খালাসের জন্য মাত্র দুটি এফএসআরইউ রয়েছে। এর একটি অকার্যকর হয়ে পড়ায় এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাবে সারা দেশে, বিশেষ করে ময়মনসিংহ অঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে গেছে। ফলে সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি ও যানজট সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ভোলায় গ্যাস ও পাইপলাইন না থাকা সত্ত্বেও সেখানে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। পরিকল্পনাহীনভাবে নির্মিত এসব কেন্দ্র এখন কার্যত ‘জাদুঘরে’ পরিণত হয়েছে। অলস পড়ে থেকে এগুলো রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়ের কারণ হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে এ খাতে বকেয়া বিলের পরিমাণ প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকা।

তিনি বলেন, সার্বভৌম গ্যারান্টির (Sovereign Guarantee) আওতায় ক্যাপাসিটি চার্জের চুক্তি করা হয়েছিল। এটি একটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক আর্থিক অঙ্গীকার। এখন অর্থ পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আদালতে যাবে এবং রাষ্ট্রকে সেই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এই বিপুল বকেয়া জাতীয় রাজস্বের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। বিষয়টি সমাধানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

নিজের ব্যবসায়ী জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমি ব্যবসায়ীদের কষ্ট বুঝি। এ দেশে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত গোপন ও সেবা-সংক্রান্ত ব্যয় বহন করে ব্যবসা করা কতটা কঠিন, তা আমি জানি। আমাদের শিল্প-কারখানা টিকিয়ে রাখতে হবে। ব্যাংকিং খাতের সংকটে অনেক সাধারণ মানুষ ও অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী নিঃস্ব হয়েছেন। এই জটিল পরিস্থিতিতেও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত আমাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।

সৌরবিদ্যুৎকে ভবিষ্যতের প্রধান শক্তির উৎস হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি সরকার একটি নতুন সৌরবিদ্যুৎ নীতি ঘোষণা করেছে, যা সম্পূর্ণ বিনিয়োগবান্ধব। এমনকি সিপিডির মতো সংস্থাও এ নীতির প্রশংসা করেছে। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

তিনি জানান, নতুন নীতির আওতায় সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগে কর ছাড়, কাস্টমস শুল্ক হ্রাস, সৌর প্যানেল স্থাপনকারী ভবনের মালিকদের আয়করে বিশেষ সুবিধা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) ও রেলওয়ের অব্যবহৃত জমি ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে দেশে অন্তত ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মধ্যেই নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হবে বলেও জানান তিনি।

বিদ্যুৎ খাতের লোকসান ও অদক্ষতা কমাতে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, সরকারের কাজ বাল্ক পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা। খুচরা পর্যায়ের বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারি খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়াই উচিত। ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এ ব্যবস্থা সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, পেট্রোলিয়াম ও তেল আমদানিতে সরকারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা হবে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় মোবাইল অ্যাপ ও কিউআর কোডের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহের পরিকল্পনাও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

বক্তব্যের শেষে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ডিস্ট্রিবিউশন প্রাইভেটাইজেশন ও সৌরবিদ্যুৎ খাতে আমরা ব্যাপক বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করছি। আপনারা প্রস্তাব নিয়ে আসুন, সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। দেশকে এই সংকট থেকে বের করে আনতেই হবে।

(ওএস/এএস/জুলাই ২৩, ২০২৬)













পাঠকের মতামত:

২৩ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test