E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

মহাদেবপুরে পরিযায়ী পাখির অভয়াশ্রম গড়লেন হাজী মোয়াজ্জেম

২০২১ জানুয়ারি ২৬ ১৫:২৭:১৬
মহাদেবপুরে পরিযায়ী পাখির অভয়াশ্রম গড়লেন হাজী মোয়াজ্জেম

মহাদেবপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি : ডানা মেলে আকাশে পাখিদের উড়াউড়ি। আবার কখনোবা নদীর স্বচ্ছ পানিতে জলকেলি। রাঙ্গা ময়ূরী আর বালিহাঁসের দিনভর খুনসুটির এই দৃশ্য চোখে পড়বে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলা সদরে আত্রাই নদে। পরিযায়ী পাখির কলতানে এক নান্দনিক পরিবেশ। পাখির জলকেলি ডানা ঝাপটানোর মনোরম দৃশ্য দেখতে দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীরা আসছেন প্রতিদিন।

শীতের হিমেল হাওয়ায় হাজার হাজার মাইল দূর থেকে উড়ে আসা হাজারো অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর এই এলাকা। এসব পরিযায়ী পাখি নদীর স্বচ্ছ জলরাশির সঙ্গে মিতালী করে দিনভর খুনসুটিতে মেতে থাকছে। বালি হাস, রাঙ্গা ময়ূরী, ছোট স্বরালী নামক পরিয়াযী পাখি দেখা মিলেছে নদীতে। চলতি শীত মৌসুমে অন্তত ১০ প্রজাতির কয়েক লাখ পরিযায়ী পাখি এসেছে আত্রাই নদীতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

পাখির অবাধ বিচরণ নিশ্চিতে কাজ করছে এলাকায় একঝাঁক তরুণ। তাদের সাথে নতুন করে যোগ দিয়েছেন হাজী মোয়াজ্জেম হোসেন। উপজেলা সদরের আত্রাই নদে পরিযায়ী পাখির অভয়াশ্রম গড়ে তুলে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন তিনি। আত্রাই নদের পুরাতন ব্রীজ এলাকা থেকে শুরু করে উজানে দেড় কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত অসংখ্য বাঁশের ঘেড় তৈরী করেছেন পরিকল্পিতভাবে। এগুলোতে এখন ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি বসছে। পাখিগুলো দেখার জন্য প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখানে ভীড় জমাচ্ছেন।

হাজী মোয়াজ্জেম বলেন, প্রতিবছর শীত মওসুমে সুদুর সাইবেরিয়াসহ বিভিন্ন হিমশীতল এলাকা থেকে পরিযায়ী পাখি এই এলাকায় এসে থাকে। এবারও এসেছে। কিন্তু পাখিগুলোর বসার জায়গা না থাকায় রাতদিন নদের পানিতে ভাঁসছিল। এই অবস্থা দেখে তিনি প্রথমে পুরাতন ব্রীজ এলাকায় কয়েকটি বাঁশ দিয়ে ঘেড় তৈরী করেন। সেখানে পরিযায়ী পাখিগুলো বসা শুরু করে। এটা দেখে উৎসাহীত হয়ে তিনি দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অসংখ্য ঘেড় তৈরী করেন। এতে তার দুই লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়েছে। তিনি পাখি শিকার না করার আহ্বান জানিয়ে নদের বিভিন্ন স্থানে বিশাল

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকার বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পাখি ও বন্যপ্রাণী নিয়ে গবেষণা ও সুরক্ষার কাজ করে আসছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে তারা পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরী করতে পারছিলেন না। তিনি তাদের সাথে আলোচনা করে সকলের সম্মতি নিয়ে পাখি প্রেমিদের দেয়া ছক মোতাবেক ঘেড় তৈরী করেন। ভবিষ্যতে এখানে প্রয়োজনীয় আরও অবকাঠামো তৈরী করবেন বলেও তিনি জানান।

হাজী মোয়াজ্জেম হোসেন মূলত: একজন বালু ব্যবসায়ী। মহাদেবপুর সরকারী বালুমহালের লিজ গ্রহিতা সাঈদ হাসান তরফদার শাকিলের কাছ থেকে চুক্তির ভিত্তিতে তিনি উপজেলার বুড়াশিবতলা পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলন করে ব্যবসায় পরিচালনা করে আসছিলেন। সম্প্রতি কয়েক ব্যক্তি অভিযোগ করেন যে, বালু উত্তোলনের শব্দে এলাকায় পরিযায়ী পাখি থাকছেনা। তারা ওই স্থান থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানান। তারা বালুর পয়েন্ট থেকে শুরু করে আরও উজানে পাখির অভয়াশ্রম গড়ারও দাবি জানান। এর প্রেক্ষিতে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তার কর্মচারির জরিমানার আদেশ দেন।

হাজী মোয়াজ্জেম জানান, সরকার এই বালুমহাল থেকে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব পায়। স্মরণাতীত কাল থেকে ওই পয়েন্টে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। পুরো শীতকাল বালু তুলতে না পারলে তারা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখিন হবেন। বালুর পয়েন্টের অদূরে অভিযোগকারী একজনের খাঁচায় মাছ চাষের প্রকল্প রয়েছে। পাখিরা যাতে সে প্রকল্পের ক্ষতির কারণ না হয় সেজন্য পাখিদের বালুর পয়েন্টের দিকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

এমতাবস্থায় যাতে করে পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণে সুবিধা হয়, আবার বালুমহাল থেকে সরকারের রাজস্ব প্রাপ্তিতে কোন সমস্যার সৃষ্টি না হয় সেসব দিক বিবেচনা করে বালু উত্তোলনের পয়েন্ট বাদ দিয়ে উপজেলা সদরের দিকে তিনি অসংখ্য ঘেড় তৈরী করেন। পাখিগুলো উপজেলা সদরের কাছাকাছি বসায় এখন প্রতিদিন অসংখ্য উৎসাহী সহজে পাখি দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। তার এ অভয়াশ্রম তৈরীতে সার্বিকভাবে সাংবাদিক কিউ, এম, সাঈদ টিটো, সাংবাদিক কাজী সামছুজ্জোহা মিলন, সাংবাদিক আমিনুর রহমান খোকন, পাখি গবেষক মুনসুর সরকার সার্বিক সহযোগিতা করেছেন বলেও জানান।

মহাদেবপুরের প্রাচীন কুঞ্জবন বিচিত্র্য পাখি উৎপাদন বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক প্রবীণ ও অভিজ্ঞ পাখি গবেষক মুনসুর সরকার বলেন, পাখি ও বন্যপ্রাণীর সুরক্ষায় যে কেউ এগিয়ে আসলে তাদেরকে স্বাগত জানানো হবে। হাজী মোয়াজ্জেম হোসেন বিস্তর টাকা খরচ করে পাখি সুরক্ষার যে কাজ করেছেন, সে ব্যাপারে স্থানীয় পাখিপ্রেমীদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে এখানে একটি পাখির অভয়াশ্রম গড়ার জন্য পাখি ও বন্যপ্রাণী বিষয়ক স্বেচ্ছসেবী সংগঠন বিবিসিএফের কেন্দ্রীয় সভাপতি, সম্পাদক, উপদেষ্টা সাংবাদিক গোলাম রসুল বাবু, নওগাঁ জেলা শাখার সভাপতি ও হাসানপুর পাখি কলোনি জীবন এর পরিচালক ইউনুসার রহমান হেবজুল, কুঞ্জবন বিচিত্র পাখি উৎপাদন বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, জোয়ানপুর পাখি কলোনির পরিচালক এস এম মাহফুজ, মগলিশপুর পাখি কলোনির পরিচালক আকরাম হোসেন, নিরাপদ নওগাঁর চেয়ারম্যান সাংবাদিক এম সাখাওয়াত হোসেন, নিশান এর পরিচালক মহিদুল ইসলাম প্রমুখ বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ রাজশাহীর বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও আবাসস্থল উন্নয়ন প্রকল্পের ওয়ার্ল্ড লাইফ অফিসার বরাবর একটি আবেদন করেন। আবেদনে উপজেলা বন কর্মকর্তা, মৎস্য কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের মতমতও নেয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষ বিষয়টির অনুমোদন দিয়ে গত রোববার (২৪ জানুয়ারী) এবিষয়ে মহাদেবপুর ডাকবাংলো মিলনায়তনে পরিযায়ী পাখি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক এক পথসভার আয়োজন করে। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ রাজশাহী অঞ্চলের ওয়ার্ল্ড লাইফ অফিসার রাহাত খান, আঞ্চলিক বন পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির, ওয়ার্ল্ড লাইফ রেঞ্জার হেলিম রায়হান, ফরেস্টার ইউসুফ প্রমুখ এতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

(কেজে/এসপি/জানুয়ারি ২৬, ২০২১)

পাঠকের মতামত:

০৫ মার্চ ২০২১

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test