E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Walton New
Mobile Version

শরীয়তপুরে আইনাঙ্গন উত্তপ্ত

আইনজীবীদের কোটি টাকা আত্মসাৎ, সমিতির বর্তমান ও সাবেক সভাপতি বহিস্কার, চেম্বার বরাদ্দ বাতিল

২০২৩ মে ১৭ ১৭:১০:২২
আইনজীবীদের কোটি টাকা আত্মসাৎ, সমিতির বর্তমান ও সাবেক সভাপতি বহিস্কার, চেম্বার বরাদ্দ বাতিল

কাজী নজরুল ইসলাম, শরীয়তপুর : শরীয়তপুর জেলায় কর্মরত সকল আইনজীবীদের কল্যাণ তহবিলের স্থায়ী আমানত (এফডিআর) এর প্রায় দুই কোটি টাকা (১কোটি ৯২ লাখ ৪৯ হাজার ৩৬৮ টাকা) আত্মসাতের অভিযোগ যথাযথ তদন্তে প্রমানিত হওয়ায় ক্রমশঃই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে শরীয়তপুরের আইন অঙ্গন। শরীয়তপুর জেলা আইনজীবী সমিতির বর্তমান সভাপতি আবু সাঈদ ও সাবেক সভাপতি জহিরুল ইসলাম কর্তৃক গত দুই যুগেরও অধিক সময় থেকে জমাকৃত বিপুল পরিমানের এই অর্থ আত্মসাৎ করায় আইনজীবী সমিতির সভায় তাদের সদস্য পদ স্থগিত ও তাদের জন্য বরাদ্দকৃত চেম্বার বাতিল করা হয়েছে। আত্মসাৎকৃত সমূদয় অর্থ ফেরৎ দেয়ার জন্য আগামী ২৫ মে, ২০২৩ পর্যন্ত সময় দিয়ে নোটিশ জারি করা হয়েছে।

অভিযুক্ত দুই আইনজীবী নেতা বর্তমান সাধারণ সম্পাদক কর্তৃক সম্পাদিত সভা সমূহ এবং তাদের বিরুদ্ধে আনীত পদক্ষেপ অবৈধ ও সমিতির গঠনতন্ত্র পরিপন্থী বলে দাবী করেছেন। তবে, সমিতির এফডিআরকৃত অর্থ তুলে নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বর্তমান সভাপতি আবু সাঈদ।

শরীয়তপুর জেলা আইনজীবী সমিতি সূত্রে জানা যায়, সমিতিতে ২৫৫ জন নিবন্ধিত আইনজীবী আছেন। তাদের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রতিবছর কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির নেতৃত্বে ওকালতনামা, নীল কাগজ, জামিননামা বিক্রি ও চারতলা ভবনের ৬২টি কক্ষের ভাড়া আদায় করা হয়। সকল আইনজীবীদের আয়ের ওই টাকা থেকে ৫০% টাকা সমিতির সদস্যদের কল্যাণের জন্য ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা হয়। পূর্বের জমাকৃত টাকা সহ ২০১২ সাল থেকে এফডিআর চালু করা হয়। ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকে ৬৫ লাখ টাকা এফডিআর করা হয়।

২০১৯ সাল পর্যন্ত আরও ৬৫ লাখ টাকা এফডিআর দেখানো হয়। ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এফডিআরের ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ও এর লভ্যাংশের ৫০ লাখ টাকাসহ মোট ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে আবু সাঈদ দুই দফা সভাপতি ও দুই দফা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আর জহিরুল ইসলাম একবার সভাপতি ও দুবার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এ বছর আবার আবু সাঈদ সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তাজুল ইসলাম। সমিতির দায়িত্ব গ্রহণের পর কল্যাণ তহবিলের কাগজপত্র বুঝে নেওয়ার সময় এফডিআরের খোঁজ নিতে গিয়ে তিনি টাকা আত্মসাতের তথ্য পান। বিষয়টি আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করেন।

গত ২৪ এপ্রিল আইনজীবীদের নিয়ে তিনি জরুরী সভা করে এ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম ও এ্যাডভোকেট আবু সাঈদের সদস্য পদ স্থগিত করেন এবং ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ইতমধ্যে আবু সাঈদ আত্মসাতকৃত টাকা থেকে সমিতির তহবিলে ৪০ লাখ টাকা ফেরৎ দেন। ৮ মে তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর গত ১০ মে পূনরায় তাজুল ইসলাম সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি এ্যাডভোকেট কামরুল হাসানের সভাপতিত্বে সাধারণ সভা করে অভিযুক্ত দুই আইনজীবী নেতার বহিস্কারাদেশ বহাল রাখেন এবং তাদের জন্য সমিতি ভবনে বরাদ্দকৃত চেম্বার দুটি বাতিল ঘোষণা করেন। আগামী ২৫ মে তারিখের মধ্যে আত্মসাৎকৃত বাকি ১ কোটি ৫২ লক্ষ টাকা ফেরৎ প্রদানের জন্য নোটিশ করেন। ১৪ মে পূনরায় আইনজীবী সমিতির কার্যকরি কমিটির সভায়ও অনুরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহিত হয়।

তদন্ত কমিটি কর্তৃক উপস্থাপিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, শরীয়তপুরস্থ আইএফআইসি ব্যাংকে ২০১২ সালের ১ মার্চ ১০ লক্ষ টাকা, ২০১৭ সালের ২২ আগষ্ট ১৫ লক্ষ টাকা, ২০১৭ সালের ১১ সেপ্টম্বর ৫ লক্ষ টাকা, ২০১৭ সালের ১১ নভেম্বর ৬ লক্ষ টাকা, ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারী ৯ লক্ষ টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকে ২০১২ সালের ১০ এপ্রিল ৫ লক্ষ টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী ১০ লক্ষ টাকা এবং কো-অপারেটিভ ব্যাংকে ২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল ৫ লক্ষ টাকা এফডিআর করা হয়। ৬ বছরে ৪টি ব্যাংকে ৮টি হিসাব নাম্বারে ৬৫ লক্ষ টাকা এফডিআর করা হয়।

উক্ত এফডিআরকৃত টাকার লভ্যাংশ সহ ৯১ লক্ষ ২৯ হাজার ৮৬৪ টাকা ২০১৯ ও ২০২০ সালের বিভিন্ন সময়ে তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেন এ্যাডভোকেট আবু সাঈদ ও জহিরুল ইসলাম। তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছেন, ৬৫ লক্ষ টাকার এফডিআর ২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস পর্যন্ত গচ্ছিত থাকলে লভ্যাংশের পরিমান দাঁড়াতো ১ কোটি ১৯ লক্ষ টাকা। তদন্ত টিমের সদস্যবৃন্দ বিগত দিনের বার্ষিক সাধারণ সভার রেজ্যুলেশন পর্যালোচনা করে দেখেন, ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ সালের বার্ষিক সাধারণ সভায় সাধারণ সম্পাদকের দাখিলকৃত প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে শুধু মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ৬টি এফডিআর এর হিসাব নাম্বারে ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা জমা রয়েছে।

উক্ত টাকা ২০২৩ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত জমা থাকলে লভ্যাংশ সহ ১ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা সকল আইনজীবীদের আপদকালিন সঞ্চয় ও সম্পদ হিসেবে ভোগ করা সুযোগ পেতেন। উল্লেখ্য, এ্যাডভোকেট আবু সাঈদ ২০০৩, ২০০৬, ২০০৭, ২০১১, ২০১২, ২০১৪, ২০১৫,২০১৮, ২০২১ ও ২০২২ সালে মোট দশ মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক এবং ২০১৯, ২০২০ ও ২০২৩ সালে তিন মেয়াদে শরীয়তপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম ২০১৩, ২০১৬, ২০১৯ ও ২০২০ সালে মোট চার মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক এবং ২০২১ ও ২০২২ সালে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

শরীয়তপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম বলেন, সমিতির কল্যাণ তহবিলের এফডিআরের ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা ও এর লভ্যাংশের ৫০ লক্ষ টাকাসহ মোট ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে মর্মে প্রাথমিকভাবে জানতে পারি। ২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস পর্যন্ত এই টাকার লভ্যাংশ হতো ১ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা। ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এসব টাকা আত্মসাৎ করা হয়। তখন সমিতির সভাপতি আবু সাঈদ ও সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম দায়িত্বে ছিলেন। বিষয়টি সামনে এলে বিভিন্ন ব্যাংকে খোঁজ নেওয়া হয়। কোনো ব্যাংকেই আইনজীবী সমিতির নামে এফডিআরের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তখন চাপে পড়ে আত্মসাতের দায় স্বীকার করে এডভোকেট আবু সাঈদ ৪০ লাখ টাকা সমিতির ফান্ডে ফেরত দেন। তাজুল ইসলাম আরও বলেন, গত ২৪ এপ্রিল প্রাথমিক পর্যায়ে কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ওই দুজনের সমিতির সদস্য পদ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ঘটনাটি তদন্তের জন্য এডভোকেট বজলুর রশিদ আকন্দকে প্রধান করে এডভোকেট লুৎফর রহমান ঢালী, এডভোকেট মোঃ নজরুল ইসলাম, এডভোকেট মৃধা নজরুল কবির ও এডভোকেট শহীদুল ইসলাম সজীবকে সদস্য করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে সিনিয়র সহ-সভাপতি এডভোকেট কামরুল হাসান শাহ আলমের সভাপতিত্বে ১০ মে সকল আইনজীবীদের নিয়ে জরুরী সাধারণ সভার আয়োজন করা হয়। এ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাদের চেম্বারের বরাদ্দ বাতিল করা হয়। আগামী ২৫ মে তারিখের মধ্যে বাকি ১ কোটি ৪২ লক্ষ টাকা জমা দেয়ার জন্য তাদেরকে নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা ফেরৎ না দিলে তাদের বিরুদ্ধে যথযথ আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

১০ মে অনুষ্ঠিত সাধারণ সভায় শত শত আইনজীবী অভিযুক্ত দুই নেতার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পরেন। এ সময় সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট মতিউর রহমান, এডভোকেট বজলুর রশিদ আকন্দ, এডভোকেট রাশেদুল হাসান মাসুম, এডভোকেট হানিফ মিয়া, এডভোকেট মোতালেব মাদবর, এডভোকেট মির্জা হযরত আলী (পিপি), এডভোকেট লুৎফর রহমান ঢালী, এডভোকেট আলী আহাম্মদ খান, এডভোকেট মোঃ জুলফিকার আলী, এডভোকেট আলমগীর হোসেন মুন্সী (জিপি), শরীয়তপুর পৌরসভার মেয়র এডভোকেট পারভেজ রহমান জন, এডভোকেট কবির হোসেন, এডভোকেট খবির হোসেন, এডভোকেট মুরাদ হোসেন, এডভোকেট শহিদুজ্জামান সিকদার তারা, এডভোকেট আসাদুজ্জামান জুয়েল, এডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসেন, এডভোকেট মাহবুবুর রহমান স্বপন, এডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন মোল্লা, এ্যাডবোকেট মেহেদী হাসান হামিদী প্রমূখ অভিযুক্ত দুই নেতাকে ভৎসনা করে বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, দীর্ঘদিন আইনজীবী সমিতির দায়িত্বে থাকা এ্যাডভোকেট আবু সাঈদ ও জহিরুল ইসলাম জেলার সকল আইনজীবীদের সাথে প্রতারণা করেছেন। জেলার শত শত প্রবীন-নবীন আইনজীবী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের আমানতের টাকা ফেরৎ চেয়েছেন।

সমিতির সাবেক সভাপতি এ্যাড্ভোকেট জহিরুল ইসলাম বলেন, আমি ২০১৯ ও ২০২০ সালে সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলাম এবং আবু সাঈদ ছিলেন সভাপতি। আমার সরল বিশ্বাসকে পূঁজি করে আবু সাঈদ আমার কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে আইনজীবীদের কল্যান তহবিলের এফডিআর এর টাকা তুলে নিয়ে নিজে ব্যবহার করে আমার সাথে এবং সকল আইনজীবীদের সাথে প্রতারণা করেছেন। আমি একটি টাকাও নেইনি বা খরচ করিনি। এ বিষয়ে এ্যাডভোকেট আবু সাঈদ বর্তমান সাধারণ সম্পাদকের কাছে লিখিত চিঠিতে স্বীকার করেছেন, এই অপরাধের সাথে আমি জহিরুল ইসলাম সম্পৃক্ত নই।

শরীয়তপুর জেলা আইনজীবী সমিতির বর্তমান সভাপতি আবু সাঈদ বলেন, আইনজীবী সমিতির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্রয়োজনে, বিভিন্ন সমস্যার কারনে আমি বছর শেষে হিসেব মেলাতে পারিনি। সেখানে ৪০ লক্ষ টাকার গড়মিল দেখা যায়। তখন এ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম এবং আমি স্বাক্ষর দিয়ে টাকা তুলেছি। এ জন্য জহিরুল ইসলাম কোন ভাবেই দায়ী নন। আমি ইতিমধ্যে ৪০ লক্ষ টাকা ফেরৎ দিয়েছি এবং সমূদয় বাকি টাকা ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধের জন্য অঙ্গীকার করেছি এবং নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছি। কিন্তু তারা আমাদের সদস্য পদ স্থগিত করেছেন এবং আমাদের চেম্বার বাতিল করেছেন । এটা অবৈধ এবং সমিতির গঠনতন্ত্র পরিপন্থী। কারণ, যেহেতু আমি এখনো জীবীত এবং সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করিনি, সেহেতু আমার অনুপুস্থিতিতে তাজুল ইসলাম কর্তক তরিঘরি সভা করে গৃহিত যাবতীয় সিদ্ধান্ত অবৈধ।

(কেএনআই/এসপি/মে ১৭, ২০২৩)

পাঠকের মতামত:

২৫ জুলাই ২০২৪

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test