E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Walton New
Mobile Version

এমপি আনারের মৃত্যু ঘিরে রহস্য

২০২৪ মে ২২ ১৯:৫৩:২৯
এমপি আনারের মৃত্যু ঘিরে রহস্য

অরিত্র কুণ্ডু, ঝিনাইদহ : সাতদিন নিখোঁজ থাকার পর ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ)আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারের মরদেহ উদ্ধার করেছে ভারতীয় পুলিশ। বুধবার কলকাতার নিউটাউনে একটি আবাসিক এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ খবর তার নির্বাচনী এলাকা কালীগঞ্জে আসার পর চলছে শোকের মাতম। নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারন মানুষের আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠছে শহরের ভুষণ সড়ক। এদিকে সংসদ সদস্য আনারের হত্যাকাণ্ডের পর জেলাজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তার হত্যাকাণ্ড নিয়ে জন নানামত পোষন করছেন।

এমপি আনারের উত্থান-
আনোয়ারুল আজিম আনারের রাজনৈতিক উত্থান ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থেকেই। এক সময় সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রন করলেও পরে যোগদানদের রাজনীতিতে। সর্বশেষ কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করে আসছিল। আনোয়ারুল আজিম আনার আওয়ামীলীগ থেকে তিন মেয়াদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ইন্টাপোলের ওয়ান্টেড আসামি ছিলেন এই জনপ্রতিনিধি। অস্ত্র ও বিষ্ফোরক পাচারের মূলহোতা হিসাবে পুলিশের খাতায় তার নাম ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কয়েক বছর ধরাছোয়ার বাইরে থেকে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও চরমপন্থিদের মাফিয়া হিসাবে পরিচিত পান। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র,বিষ্ফোরক,মাদকদ্রব্যে,সোনা চোরাচালান ও চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে ৯টির বেশি মামলা হয়।

ঝিনাইদহ রাজনৈতিক কর্মীদের সাথে কথা বলেন জানা গেছে,১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় থাকা সময়ে আনার মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। এক সময় দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের মাদক সম্রাট হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।

এই মাদক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে যান তিনি। ১৯৯১ সালে আরেক শীর্ষ চোরাচালানি পরিতোষ ঠাকুরের সঙ্গে মিলে সোনা চোরাচালানের সাথে জড়িয়ে পড়েন আনার। সোনার বড় বড় চালান রাজধানী থেকে মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করতেন।

১৯৯৬ সালে আনার বিএনপি থেকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে যোগ দেন। মাদক ও সোনা চোরাচালানের ব্যবসার সাথে কালীগঞ্জ পৌরসভার এক কমিশনারের হাত ধরে অস্ত্র চোরাকারবারে জড়িয়ে পড়েন তিনি। তার অবৈধ অস্ত্রের চালান চরমপন্থি ক্যাডার সামসেল ওরফে রবিন ও আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী মুকুলের কাছে বিক্রি হতো।

২০০৭ সালে চুয়াডাঙ্গার লোকনাথপুর এলাকা থেকে ১৩কেজি সোনা আটক করে তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআর। চোরাচালানিরা জানতে পারে, দর্শনার ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম সোনাগুলো ধরিয়ে দিয়েছে। ওই ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সাইফুল।

ওই হত্যা মামলায় আনারসহ আসামি করা হয় ২৫ জনকে। কুষ্টিয়ার চরমপন্থি নেতা মুকুল, শাহীন রুমী,পরিতোষ ঠাকুর, আনারসহ ১৯ জনের বিরুুদ্ধে পরের বছর আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

২০১২ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিতোষ, আনারসহ বেশ কয়েকজন ওই মামলা থেকে অব্যাহতি পান।

জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে ধীরে ধীরে আনারের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো কমে যেতে শুরু করে। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হলে ক্ষমতার দাপটে বেশিরভাগ মামলা থেকে নিজেকে মুক্ত করেন আনার।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ-
২০১৪ সালের দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয় প্রায়ত সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নানের সাথে। পরে আনোয়ারুল আজিম আনার দলীয় মনোনয়ন পেলে আব্দুল মান্নানের সাথে বিরোধ আরো তীব্র হয়। তখন কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আনার ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য হওয়ায় তখন থেকেই কালীগঞ্জ উপজেলাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। উপজেলার প্রতিটা ইউনিয়নে নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে দলীয় পদপদবী ও চেয়ারম্যান নির্বাচিত করান। এ নিয়ে তৃণমূলে বিভেদ বেড়ে যায়। এরই জেরে ২০১৫ সালে আনারের কর্মী-সমর্থকদের হাতে নিশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন কোলা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের তৎকালিন সভাপতি আনন্দ মোহন ঘোষ। এভাবেই তার কর্মকাণ্ড নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে হামলা-মামলাসহ নানা ভাবে হয়রানী করা হতো। সর্বশেষ সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচন নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠে কালীগঞ্জের রাজনীতির মাঠ। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুর নেতৃত্বে আনারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী একটি গ্রুপ তৈরি হয়ে পড়ে।

হত্যাকাণ্ড নিয়ে যা বলছেন স্থানীয়রা-
সংসদ সদস্য আনার নিখোঁজের পর থেকেই নানা রকম গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে দলীয় নেতা-কর্মীসহ সাধারন মানুষের মধ্যে। আজ দুপুরে হত্যাকাণ্ডের খবরের পর স্থানীয়রা জানায়, তিনি ভারতে একা একা যাওয়ায় সকলের মধ্যে কৌতুহলের সৃষ্টি হয়। চোরাকারবারিদের সাথে মতোবিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন আনার। এদিকে তার পরিবারের সদস্যরা নিখোঁজের পরেও কেনো ভারতে গেলেন না এনিয়েও অনেকে প্রশ্ন তোলেন। রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রতিপক্ষরা ভারতে চোরাকারবারিদের সাথে যোগসাজস করে প্রলোভন দেখিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে বলেও তারা জানান।

এমপির মৃত্যুতে শোকে বিহ্বল ঝিনাইদহ-
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারের মরদেহ উদ্ধারের খবর শুনে কালীগঞ্জে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেছেন। অনেকেই এমপির মৃত্যুর খবরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

বুধবার কলকাতা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ খবর আসার পর এমপির বাড়ি ও দলীয় কার্যালয়ের সামনে আত্মীয়স্বজন, নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কান্নার রোল পড়ে গেছে। তাদের আহাজারিতে পুরো এলাকায় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।

এমপি আনারের এ ধরনের মৃত্যু তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না আত্মীয়স্বজন, নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। ভারতীয় ও বাংলাদেশের মিডিয়ার খবর প্রচারের পর সংসদীয় আসনের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী তার বাড়ির সামনে জড়ো হয়েছেন। এ সময় দলীয় নেতাকর্মীরা এমপি আনার হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি জানান।

আনোয়ারুল আজিম আনার ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে একটানা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

(একে/এএস/মে ২২, ২০২৪)

পাঠকের মতামত:

১৪ জুন ২০২৪

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test