E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

উন্নত রাষ্ট্র গঠনে মানসম্মত কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই

২০২১ জানুয়ারি ২৫ ১৯:৩৮:২৩
উন্নত রাষ্ট্র গঠনে মানসম্মত কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই

প্রভাষক নীলকন্ঠ আইচ মজুমদার 


যে শিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে ব্যবহার করে কোন একটি নির্দিষ্ট পেশায় নিযুক্ত হতে পারে তাই কারিগরি শিক্ষা। এসব শিক্ষা ব্যবস্থায় তত্ত্বীয় পড়াশুনার চেয়ে ব্যবহারিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারিগরি শিক্ষা সম্পর্কে কথা বলতে হলে প্রথমেই বলতে হবে কারিগরি শিক্ষা নিয়ন্ত্রণের একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কারিগরি বোর্ড সম্পর্কে। এ বোর্ডের উপর দায়িত্ব রয়েছে সারা দেশের কারিগরি শিক্ষার ট্রেড সমূহ পরিচালনা করার।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষা পরিচালনা ও সনদপত্র প্রদানের জন্য ১৯৫৪ সালে ইস্ট পাকিস্তান বোর্ড অব এক্সামিনেশন ফর টেকনিক্যাল এডুকেশন নামে একটি বোর্ড স্থাপতি হয়। উদ্দেশ্য ছিল দেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সংগঠন পরিচালন, তদারকি, নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নের দায়িত্ব পালন, পরীক্ষা পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও বোর্ড কর্তৃক গৃহীত পরীক্ষায় উর্ত্তীণ ব্যক্তিবর্গকে ডিপ্লোমা/সার্টিফিকেট প্রদান। অতঃপর ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষিতে এবং ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং ও ট্রেড পর্যায়ে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ, সনদপত্র প্রদান, পরিদর্শন ও মূল্যায়নের জন্য একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। ফলে ১৯৬৭ সালের মার্চ গেজেট নং-১৭৫ এল.এ প্রকাশিত এবং ১নং সংসদীয় আইনের বলে ইস্ট পাকিস্তান টেকনিক্যাল এডুকেশন বোর্ড নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপতি হয়, যার বর্তমান নাম বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।

যে বোর্ডটি বর্তমানে দেশের কারিগরি শিক্ষার অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে । এর মাধ্যমেই দেশের সকল ধরনের বৃত্তিমূলক ট্রেড পরিচালিত হয়ে আসছে। ছোট এই ভূখন্ডে বিপুল জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটাতে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে নবরুপে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই এটা সকলের ভাবনা। সাধারণ শিক্ষা মানুষকে যেমন নির্দিষ্ট কর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখে তার বিপরীতে কারিগরি শিক্ষা মানুষকে কর্মমূখী শিক্ষার মাধ্যমে খুব কম সময়ের মধ্যেই মানুষকে পেশা জগতে সম্পৃক্ত হতে পারে এবং যার ফলে মানুষ জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে সক্ষম হয় এবং উপার্জনের সক্ষমতা অর্জন করে।

এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষাকে মাধ্যমিক স্তরে বাধ্যতামূলক করেছে এবং কলেজ পর্যায়ে কারিগরি ট্রেড খোলার জন্য সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি -২০১০ এ বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। বাজেটে বরাদ্ধ বৃদ্ধিসহ কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কারিগরি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করেছে। মুজিবর্ষে এসব কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাজ করে যাচ্ছে সরকার। এসএসসি, এইচএসসি ভোকেশনাল, দাখিল ভোকেশনাল, জাতীয় দক্ষতামান বেসিক ট্রেড, এইচএসসি (বিএম) , ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল, ডিপ্লোমা ইন এগ্রিকালচার ও ফিসারি, ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ডিপ্লোমা ইন এনিম্যাল হেলথ, সার্টিফিকেট ইন মেডিকেল ইন এনিম্যাল হেলথ।

নবম ও দশম শ্রেণিতে ভোকেশনাল ট্রেড চালু রয়েছে। আর এই কারিগরি শিক্ষার অন্যতম একটি শাখা হচ্ছে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা (বিএম)। এ শাখায় মাধ্যমিক স্তরের বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, মানবিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ছাত্র/ছাত্রীরা ভর্তি হয়ে নিজকে স্বয়ং সম্পূর্ন করে গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়াও সাধারণ শিক্ষায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ। যুযোপযোগী বিষয় হিসাবরক্ষণ, ব্যাংকিং, কম্পিউটার অপারেশ, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন এর মতো ট্রেডে অধ্যয়ণ করে বর্তমান কর্মসংস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে চলার যোগ্যতা অর্জন করছে। যদিও এ শাখায় বৃত্তিমূলক শিক্ষার তেমন প্রাধান্য নেই কেবল কম্পিউটার শিক্ষায় অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ থেকে একদিকে যেমন ঝড়ে পড়া হ্রাস পাচ্ছে অন্যদিকে কম মেধা সম্পন্ন শিক্ষার্থীরা হাতে কলমে শিক্ষা লাভ করে কর্মসংস্থান করতে সক্ষম হচ্ছে। ব্যাবেইস’র ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬ হাজার ৮৩৫টি। এরমধ্যে সরকারি ৮৬৬টি ও বেসরকারি ৫ হাজার ৯৯৯টি। শিক্ষার্থী ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৪ জন। এতে যুক্ত করা হয়েছে ৬ মাস মেয়াদি বিভিন্ন শর্ট কোর্স। এই কোর্সের আওতাধীন ২হাজার ৬’শটি ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে যেসব কোর্স পরিচালনা হচ্ছে তা থেকে কতটুকু কারিগরি জ্ঞান অর্জন করতে পারছে শিক্ষার্থীরা তা নিয়ে উদ্বেগ থেকে যায়। কাগজপত্রে এসব প্রতিষ্ঠান মান অর্জন করলেও বাস্তবে বেশির ভাগই প্রতিষ্ঠানই মান অর্জন করতে পারেনি। প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানেই রয়েছে দক্ষ শিক্ষকের সংকট।

ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি শিক্ষকের সংখ্যা। অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দেওয়ায় দিন দিন তৈরি হচ্ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। সাধারণ শিক্ষায় পড়াশুনা করা শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ছোট এ জনসংখ্যাবহুল দেশে কখনও সম্ভব নয়। এছাড়াও বৈশ্বিক চাহিদার ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষা অনেকটাই প্রািতযোগিতাহীন। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষার্থী কেবল চাকুরির নেশায় ঘুরতে ঘুরতে লক্ষ্যহীণ হয়ে পড়ছে।তরুণরা হয়ে পড়ছে বিপদগামী। এতে করে বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। পৃথিবীতে যত দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমবৃদ্ধি অর্জন করেছে তার বেশির ভাগই অর্জিত হয়েছে কারিগরি শিক্ষার ফলের মাধ্যমে। শিল্পের দিকে যত ধাবিত হবে দেশ ততই প্রয়োজন হবে কারিগরি শিক্ষা।

পৃথিবীর সব দেশেই কারিগরি শিক্ষায় যে শ্রমিক যত বেশি জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছে তার সুফলও তত বেশি হয়েছে। আমাদের দেশ থেকে যেসব মানুষ কর্মসংস্থানের জন্য অন্য দেশে পাড়ি দিচ্ছে তারাও বিদেশে গিয়ে খুব একটা আয় রোজগারের পথ খুঁজে পাচ্ছে না বলেই জানা যায়। দেশে-বিদেশে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মীর চাহিদা থাকা সত্বেও জনবলকাঠমো গড়ে তুলতে পারছিনা। প্রশ্ন হলো আমাদের দেশে এ কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে বা সফলতার মুখ দেখছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় কারিগরি শিক্ষাটাও সার্টিফিকেট সর্বস্ব হয়ে যাচ্ছে। ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র ঘরে উঠছে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান বেশি হলে সুফল পাবে শিক্ষার্থীরা একথা সত্য। তবে এসব প্রতিষ্ঠান হতে হবে মানসম্মত। মানহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপর্যয় ডেকে আনবে।

এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারের পক্ষ থেকে মনিটরিং এর ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। কিভাবে চলছে কে চালাচ্ছে সেগুলো শুধুই কাগজেপত্রে।অনেক ক্ষেত্রেই দেখা ছয় মাসের কম্পিউটার কোর্স করা শিক্ষার্থীরা কিংবা দুই বছরের বিএম কোর্স করা শিক্ষার্থীরারা কোন দিন কম্পিউটার অনই করেনি কিন্তু ফলাফল এ প্লাস। কি বিচিত্র বৃত্তিমূলক শিক্ষা ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে ? প্রশ্ন হলো এসব কেন হচ্ছে ? যত্রতত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘরে উঠা, পরিদর্শনের দূর্বলতা, একটিমাত্র বোর্ডের উপর এতসব কোর্স পরিচালনার দায়িত্ব, বোর্ডের জনবল কম থাকা, সিলেবাসগত জটিলতা, পরীক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি মূলত এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সঠিক ফল না পাওয়ার কারন। ২০০৪ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে দেশের ৪৯টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে প্রথম ও দ্বিতীয় পালায় পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে কিন্তু প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই রয়েছে শিক্ষক সংসকট। তাহলে প্রশ্ন হলো আসন বৃদ্ধি করে আমরা কেমন শিক্ষা দিতে যাচ্ছি।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষায় উন্নত দেশগুলো অনেক এগিয়ে গেছে। সেই তুলনায় বলা যায়, বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে বহু দিক থেকে। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এবং মানসম্মত কারিগিরি শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে হলে একটি সঠিক নীতিমালা প্রয়োজন। যখন তখন এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নীতি পরিবর্তনের ফলে তৈরি হচ্ছে হ-য-ব-র-ল পদ্ধতি। চলতি বছরে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় বাজেট বরাদ্ধ রাখা হয়েছে ৮ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। যা বিগত বছরের তুলনায় ৮৮৪ কোটি টাকা বেশি। বিভিন্ন সময় সুশীল সমাজ এবং শিক্ষাবিদদের পক্ষ থেকে শিক্ষায় বরাদ্ধ বৃদ্ধি করার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষাকে একটি বিভাগে অর্ন্তভূক্ত করে রাখা হয়েছে যার ফলে এ শিক্ষায় গুরুত্ব কম পাচ্ছে এ কথা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই।

আর বাজেটের যে অর্থ থাকে তার বেশির ভাগই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণে। যার ফলে শিক্ষার মানন্নোয়নে এত অল্প বাজেট কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না। শিক্ষার মান বাড়াতে বাজেট বরাদ্ধ যেমনি বৃদ্ধি করতে হবে তেমনি এ বাজেট যেন সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো দক্ষ জনবল কাঠামো গড়ে তোলা। সরকারের উচিত কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে আগ্রহী করে তোলা। না হলে বাজেট যতই বৃদ্ধি করা হউক না কেন তা কোন কাজে আসবে না। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে গুরুত্ব দেওয়ার কথা হলেও বিভন্ন কারণে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

আগামীর পৃথিবী হবে প্রযুক্তি নির্ভর ও পরিবর্তনমুখী। তাই দেশকে সাজাতে হলে এবং পৃথিবীর সাথে টিকে থাকতে হলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিয়ে করতে সময়োপোগী। ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে যে পরিমান দক্ষ জনবল প্রয়োজন তা আমরা সৃষ্টি করতে পারছিনা তাই এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছি আমরা। আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে যে হাতে কলমে বাস্তবধর্মী শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের জীবন পরিবর্তন ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবো। আর এ কারিগরি শিক্ষা ২০৪১ সালের উন্নত রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যেতে পারে।

লেখক : শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

০২ মার্চ ২০২১

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test