E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শই উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ

২০২১ এপ্রিল ১৬ ১৪:২৩:১৬
ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শই উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ

আবীর আহাদ


১৯৪৭ সাল । হিন্দু-মুসলিম দুই জাতি । এ দ্বি-জাতিতত্ত্বের বিষফলে মহাভারত বিভক্ত হয়ে সৃষ্টি হলো ভারত ও পাকিস্তান । ভারত তার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিশেবে গ্রহণ করলো ধর্মনিরপেক্ষতা , অপরদিকে পাকিস্তান তার রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় সাম্প্রদায়িকতাকে মূলমন্ত্র হিশেবে গ্রহণ করে ইসলামকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেশটার নামকরণ করলো ইসলামী রিপাবলিক অব পাকিস্তান । অর্থাত্ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান দু'টি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ভারত হিন্দুত্ব পরিহার করে দেশকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার দিকে নিয়ে গেলো, অন্যদিকে পাকিস্তান মুসলমানিত্বকে মূলনীতি হিশেবে গ্রহণ করে দেশটাকে সাম্প্রদায়িক চেতনার মধ্যে নিয়ে গেলো !

পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নামধারী মুসলমান হলেও তিনি কখনো ধর্মকর্ম পালন করতেন না । শুধুমাত্র সর্বময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহণের লক্ষ্যে তিনি ইসলামকে ব্যবহার করে পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিলেন । জিন্নাহ সাহেবের সেই মুসলমানিত্বের চেতনায় পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ইসলামী হুকুমত কায়েম করতে যেয়ে পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববাংলার মানুষের ভাষা সংস্কৃতি কৃষ্টিকে পাকিস্তানি ইসলামীকরণ করার চক্রান্তে মেতে উঠেছিলো । পাশাপাশি স্বৈরতন্ত্রী শাসন ও বল্গাহীন শোষণের যে হোলিখেলার জন্ম দিয়েছিলো, সেসবের প্রতিকারে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এদেশের মানুষ এক সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানকে দুমড়ে দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে ।

এই যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্ববাংলার মানুষের জাগরণ, এর পশ্চাতে মূল চালিকাশক্তি ছিলো অসাম্প্রদায়িকতা তথা ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ----যে চেতনায় বাংলার মুসলমান হিন্দু বৌদ্ধ খৃস্টানসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠী উজ্জীবিত হয়েছিলো । এদেশের মানুষ সেই ঘোর বিপদে সাহায্যকারী হিশেবে প্রতিবেশি ভারতকে বেছে নিয়েছিলো । তৎকালীন অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ ভারতও আমাদের অসাম্প্রদায়িকতায় প্রীত হয়ে সবকিছু উজাড় করে দিয়ে আমাদের পাশে এসে শুধু দাঁড়াইনি, মিত্রবাহিনী বেশে মুক্তিবাহিনীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাঁরা রক্ত ঝরিয়েছিলো । শোনা যায়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের চৌদ্দ হাজার সেনার জীবনপাত ঘটেছে । অপরদিকে খণ্ডিত পাকিস্তান সেই ইসলামী চেতনায়ই হাবুডুবু খাচ্ছে, নিজদেশের মানুষ বিশেষ করে বালুচিস্তানের ওপর ধারাবাহিক গণহত্যা চালিয়েই যাচ্ছে । তারা ইসলামকে এমনই গলাধঃকর করেছে যে, তারা এখন বিশ্বের মধ্যে একমাত্র ইসলামী সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের উপাধি লাভ করেছে ।

বঙ্গবন্ধুর তিরোধান পর্যন্ত বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক তথা ধর্মনিরপেক্ষতা চেতনার ওপর সুদৃঢ় অবস্থানে ছিলো । কিন্তু তাঁর সকরুণ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সামরিক দুই শাসক জিয়া-এরশাদ পাকিস্তানি চেতনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের জাতীয় সংবিধানে একজন 'বিসমিল্লাহ' ও অন্যজন 'রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম' লিপিবদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধ তথা ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে জাতীয় জীবনে ইসলাম ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়ে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ধর্মীয় সংখ্যালঘুতে পরিণত করে সাম্প্রদায়িকতাকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছেন । পরবর্তীতে খালেদা জিয়া আদর্শিকভাবে জিয়া-এরশাদকে সর্বাত্মক অনুসরণ করেছেন । এরপর হাসিনা আওয়ামী লীগের যুগ ।

শেখ হাসিনা যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেন, ততদিনে আমাদের জাতীয় জীবনে দুই জেনারেল ও খালেদা-নিজামীর ঐ বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের প্রভাবে বাঙালি-মানস, বিশেষ করে কয়েকটি প্রজন্মের মনোজগতে ইসলামের তথাকথিত ধর্মীয় ছোঁয়া লেগে গিয়েছে । সেই ছোয়ার কুপ্রভাবে একটি গোষ্ঠীর মধ্যে ইসলামী জঙ্গিপনা তথা আইএসের জঙ্গিবাদী জোশ প্রবলভাবে গেঁথে গিয়েছে । সারা দেশের প্রতিটি শহর গঞ্জ গ্রামে সেই জোশের প্রভাবে গড়ে উঠেছে হরেক রকম আরবীয় কিংভূতকিমাকার নামের মাদ্রাসা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রাথমিক ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । এসব মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেনো গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিদ্বন্দ্বী দর্শনের আদলে । যে দেশটি গড়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধ তথা ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে, সেই দেশের জাতীয় আদর্শ মুক্তিযুদ্ধকে প্রকারান্তরে ইসলামবিরোধী, ধর্মনিরপেক্ষতা গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে কুফরি মতবাদ বলে লেখায় রেখায় বক্তব্যে বিবৃতিসহ নানান বইপুস্তকে প্রকাশ করা হয় । ফলে বঙ্গবন্ধু-কন্যা ও আওয়ামী লীগ নেতা হিশেবে শেখ হাসিনাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পাশাপাশি মদিনা সনদ বাস্তবায়নের একটি ধুম্রজালিক কথা বলে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হতে হয়েছে ।

ইতিমধ্যে ধর্মীয় রাজনীতির ধারক-বাহক স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী জঙ্গি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রভাবকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক অপকৌশল হিশেবে আরেক জঙ্গিবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সহযোগিতা নিতে গিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পাশ কেটে চলেছেন । সেই বিষক্রিয়ার ফলশ্রুতিতে হেফাজতে ইসলাম শেখ হাসিনার হাতে পরিপুষ্ট হয়ে এখন সুযোগ বুঝে তারা শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে বলা চলে এক অঘোষিত যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে । হেফাজতে ইসলামকে কাছে টানা ছিলো আওয়ামী লীগের চরমতম ভুল রাজনৈতিক কৌশল । স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের প্রতিহত করার জন্য তিনি মুক্তিযোদ্ধা সম্প্রদায়কে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে তাদেরকে শক্তিশালী করতে পারতেন । এটা ছিলো চেতনার প্রশ্ন । দশজন রাজাকারের বিরুদ্ধে একজন মুক্তিযোদ্ধাই যথেষ্ট । তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা জানে কিভাবে কী করতে হয় । কিন্তু তা না করে তিনি মৌলবাদী হেফাজতকে খুশি করার লক্ষ্যে আমাদের পাঠ্যপুস্তকে ইসলামী সাম্প্রদায়িকতা মেশানো লেখাগুলো সন্নিবেসিত করে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে খাঁটো করেছেন ।

সর্বোপরি আমাদের জাতীয় সংবিধানে যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ নিহিত যেমন,-----বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম----সেখানে কোনো হাতই দেননি ; বরং সেগুলোকে আরো পোক্ত করেছেন । আগেই বলেছি, তিনি জিয়া-এরশাদের ধর্মর্প্রীতির সাথে তাল মিলিয়ে 'মদিনা সনদ বাস্তবায়নে'র কথা বলেছেন ! উপরন্তু অতীতের সব শাসককে ছাড়িয়ে গিয়ে তিনি ইসলামের নামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সবচে' বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন ! অবশ্য পাশাপাশি হিন্দু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও কিছু কিছু অর্থ দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন । অথচ শেখ হাসিনা সরকার এসবকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে যদি গ্রাম উপজেলা ও বড়ো বড়ো শহরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতেন, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যকার যোগ্যতাসম্পন্নদের রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পৃক্ত করতেন, প্রশাসন থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের উচ্ছেদ করতেন তাহলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ নবচেতনায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জাগ্রত হতো ।

কিন্তু তাঁর চলমান শাসনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শোভা পাচ্ছে কাগজে কলমে বক্তৃতায় । বাস্তবে তথা রাষ্ট্র পরিচালনায় তার কোনোই প্রতিফলন নেই । বীর মুক্তিযোদ্ধারা যে জাতীয় চেতনার শক্তি----এ-ধারণা থেকে সরে এসে সরকার মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নামমাত্র ভাতা দিয়ে করুণার পাত্রে পরিণত করেছে । এদেশের জনগণ মনেপ্রাণে ধার্মিক তবে তারা মোটেই সাম্প্রদায়িক নন ; ধর্মান্ধ নন । রাজনৈতিক নেতা ও ধর্মীয় মোল্লারাই মূলত: সাম্প্রদায়িকতাকে পুঁজি করে রাষ্ট্রক্ষমতা ও সামাজিক কর্তৃক বজায় রাখার লক্ষ্যে ধর্মকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিশেবে গণ্য করে ; ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের তাড়িয়ে তাদের জায়গা-জমি দখল করাই তাদের আরেকটি মূল লক্ষ্য ।

আমরা উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কুপ্রভাব নিয়ে কথা বলছিলাম । এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, দ্বিজাতিতত্ত্বকে মুছে ফেলে আমরা পূর্ববাংলার বাঙালিরা যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম, সেই বাংলাদেশকে সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতিক ও ধর্মীয় মোল্লারা তাদের শাসন-শোষণ ও প্রভাবপ্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার কারণে আবার সেই দ্বিজাতিতত্ত্বকে ফিরিয়ে এনে নানান ছলেবলেকলেকৌশলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্য করে প্রতিবেশি ভারতে ঠেলে দেয়া হচ্ছে । এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭০ সালে যেখানে এদেশের জনসংখ্যার ২০/২১ ভাগ ছিলো হিন্দু, তাদের সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ৬/৭ ভাগ !

ঐ দ্বিজাতিতত্ত্বের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে । কিন্তু বঙ্গবন্ধুর করুণ তিরোধানের মধ্য দিয়ে অদ্যাবধি বাংলাদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা জেকে বসে পরিপুষ্ট অবস্থানে বিরাজ করছে যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী ।

দ্বিজাতি তত্ত্বের বিষক্রিয়ায় ভারত প্রজাতন্ত্রের জন্ম হলেও দেশটির সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ কিছুকাল আগ পর্যন্ত-----বিশেষ করে জাতীয় কংগ্রেস নেহের- ইন্দিরা গান্ধী ও বিজেপির অটলবিহারী বাজপেয়ীর শাসনামল পর্যন্ত শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বলবৎ ছিলো । কিন্তু বাজপেয়ী পরবর্তী বিজেপির লালকৃষ্ণ আদভানি ও নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের হাত ধরে আরএসএস দর্শনের হিন্দুত্ববাদের স্ফূরণ ঘটতে ঘটতে বর্তমানে এনআরসি (NRC) ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা চরিত্র হারিয়ে গিয়ে হিন্দুত্ববাদী তথা সেই সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি তত্ত্ব বলা চলে পুরোপুরি ফিরে এসেছে ।

একথা বলতে মোটেই অত্যুক্তি হয় না যে, ইসলাম ধর্ম অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের প্রতি আদর্শগত সহনশীল হলেও ইসলামের অনুসারী মুসলমানদের মধ্যে 'আমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ ধর্ম'----এ-ধরনের একটি অন্ধ অহমিকা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের চাইতে অনেক বেশি । এই অহমিকার অন্ধত্ব থেকে তাড়িত হয়ে মুসলমানরা অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের তথাকথিত বিধর্মী বা কাফের গণ্য করে থাকে । তারই ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের একশ্রেণীর তথাকথিত মুসলমান মোল্লা ও তাদের অনুসারী, এমনকি শাসকদের কারণে সেই সাতচল্লিশ সাল থেকে হাল আমল পর্যন্ত হিন্দুরা ভারতে চলে যাচ্ছে । অবশ্য সাতচল্লিশের দেশবিভাগের ফলে কয়েক লক্ষ মুসলমান ভারত থেকে অবিভক্ত পাকিস্তানে চলে এসেছিলো । তবে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর কোনো ভারতীয় মুসলমান উৎপীড়িত হয়ে বাংলাদেশে আসেনি বা আসে না ।

সাতচল্লিশ থেকে হাল পর্যন্ত পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যাওয়া কয়েক কোটি হিন্দু সে-দেশের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রভূত সমস্যা সৃষ্টি করে আসছে । পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা ভারতে চলে যাওয়ার ফলে ভারতের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সম্পর্কে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হতে হতে একসময় তাদের মনোজগতেও ধর্মীয় চেতনা তথা হিন্দুত্ববাদী চিন্তাচেতনার উন্মেষ ঘটেছে । অপরদিকে সাংবিধানিকভাবে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ মুসলিম রাষ্ট্রের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়ার ফলে ভারতের মধ্যেও হিন্দুত্ববাদের চেতনার জাগরণ ঘটছে । ভাবখানা যেনো এই : তোমার ধর্ম আছে, আমার কি নেই ? তুমি যখন মুসলমান, আমি তখন হিন্দু।

এভাবেই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের দেখানো পথে আজকে ভারত হাঁটছে । সাতচল্লিশের ভারত ভাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের সৃষ্টি এবং পাকিস্তান ভাগ হয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে----এটা যেমন সত্য, তারচে' এটাই বড়ো সত্য যে, আজ থেকে মাত্র কয়েক বছর আগে পর্যন্ত ভারতের মনোজগতে ছিলো ভারতীয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টির চেতনা, অপরদিকে পাকিস্তানের জন্ম থেকে এবং বাংলাদেশে পঁচাত্তর সাল থেকে অদ্যাবধি চলছে ধর্মের কচকচানি ! এভাবেই আজ তিনটি দেশ, ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ধর্মের করালগ্রাসে ক্ষতবিক্ষত হয়ে চলেছে । শান্তি সম্পীতি ও সহমর্মিতা আজ ধুলায় লুণ্ঠিত । তিনটি দেশই আজ একে অপরের ধর্মীয় শত্রুতে পরিণত হয়ে পড়েছে যা শান্তিপ্রিয় মানুষের কাম্য নয় ।

এখন আমাদের এ উপমহাদেশের বুকে শান্তি স্বস্তি ও সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে হলে দেশ তিনটির রাষ্ট্রপরিচালনা তথা সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন সাধন করতে হবে । ধর্ম নয়, অসাম্প্রদায়িকতা তথা ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট পরিচালনার মূলমন্ত্র হিশেবে গণ্য করতে হবে । মনে রাখতে হবে, ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত বিশ্বাস কিন্তু রাষ্ট্র সবার । ধর্মকে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি করতে গেলে রাষ্ট্রটি টিকে না । প্রমাণ পাকিস্তান । ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র হলে সারা বিশ্বের মুসলমানদের একটি রাষ্ট্র হতো, তেমনি হিন্দু খৃস্টান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের একটি করে রাষ্ট্র হতো । তা যখন নেই এবং হবেও না, তখন সব রাষ্ট্র গড়ে উঠুক ও পরিচালিত হোক অসাম্প্রদায়িকতা তথা ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের ভিত্তিতে ।

আমাদের উপমহাদেশের বুকে ভারতীয় রাজনীতিকরাই সবচে' পরিপক্ক বলে আমরা জানি । আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু ভারতে এনআরসি (NRC) ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (CAA) প্রতিক্রিয়ায় যা ঘটছে তা আমাদের কাম্য নয় । আমরা ধর্মনিরপেক্ষ ভারত দেখতে চাই । চাই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানি শাসকরাও একই আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে যার যার রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে ফিরে আসুক । এ-ফিরে আসার পথ দেখাক ভারত, যেহেতু সে সবার চেয়ে সবদিক থেকে বড়ো । তিনটি দেশের শাসকদের আরো মনে রাখতে হবে যে, তাদের ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী কিন্তু তাদের রাষ্ট্র কিন্তু স্থায়ী । ক্ষমতার উদগ্র লালসায় সংকীর্ণ ধর্মীয় উন্মাদনার বিষময়তা সৃষ্টি করে উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষের জানমাল সহায়সম্পদ ও মানমর্যাদা নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারো নেই ।

পরিশেষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে উদ্ধৃতি দেই-

ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে জন, মারে আর শুধু মরে ।।

লেখক :চেয়ারম্যান , একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।

পাঠকের মতামত:

১২ মে ২০২১

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test