E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

লুটপাট ও ধর্মান্ধতার কবলে বাংলাদেশ

২০২১ সেপ্টেম্বর ১৩ ১৪:১৩:২৩
লুটপাট ও ধর্মান্ধতার কবলে বাংলাদেশ

আবীর আহাদ


দেশের অর্থনীতি আজ এক অদ্ভুত গতির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই গতির ঘূর্ণাবর্তে একদিকে কিছু লোক হঠাত্ করে বিশাল বিশাল কোটিপতি বনে যাচ্ছে, অন্যদিকে একই গতিতে বিপুলসংখ্যক লোকজন দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়ে যাচ্ছে। মূলত: লুটপাটীয় আর্থসামাজিক ব্যবস্থার ফলশ্রুতিতে অর্থনীতিতে এসব অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিভিন্ন ব্যাংক, লিজিং কোম্পানি, পুঁজিবাজার, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পসহ কেনাকাটা খাত থেকে শতসহস্র কোটি টাকা লুটপাট হয়ে গেলেও, এর সাথে জড়িত রাঘব বোয়ালদের বিচার বা শাস্তি হচ্ছে না। তা না-হওয়ার পশ্চাতে কী রহস্য লুকিয়ে আছে, সেগুলো দেখারও কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা যেনো বাংলাদেশে নেই! সেই লুটপাটের সিংহভাগ টাকা কীভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে, সেসব বিষয়েও কেউ খতিয়ে দেখছে কিনা তাও জানা যাচ্ছে না! এসব লুটপাট বন্ধ ও এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কিছুই করণীয় আছে বলেও মনে হয় না! এর অর্থ কি এই যে, এসব অপরাধকর্মের সাথে রাষ্ট্রের বিভিন্ন উচ্চস্তরের লোকজনও জড়িত? তারাও কি ঘুষ বা কমিশন খেয়ে ঐসব অপকর্মের হোতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না? তাদেরকে রক্ষা করছেন? এসবের উত্তর জানা থাকলেও বলার ক্ষমতা কারো নেই !

সতেরো কোটি মানুষের ছোট্ট একটি দেশ। এদেশ থেকে গুটিকতক দুর্নীতিবাজ-লুটেরা এভাবে লুটপাটের হোলিখেলায় দেশ-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলে সীমাহীন সুখসাগরে জীবনযাপন করছে, অপরদিকে সাধারণ মানুষ দিনকে দিন আর্থিকভাবে চরম টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। কয়েক কোটি শিক্ষিত বেকারসহ দেশের স্বাধীনতার অধিকাংশ সূর্যসৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধারা চরম অনিশ্চয়তার আবর্তে পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় হাজার হাজার অমুক্তিযোদ্ধা এমনকি রাজাকারদের অবস্থান, সমাজে মানবিক মর্যাদা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়, সভ্যতা ও ভব্যতায় পচন, ভিন্নমতের প্রতি আক্রোশ, নৈতিকতার নিম্নগামিতা, শিক্ষা ব্যবস্থায় ধস, পাশবিকতা, ধর্ষণ, অনাচার ও অন্যান্য অসামাজিক কর্মকাণ্ড চরমভাবে জেঁকে বসেছে! আর সবচেয়ে বড়ো অবক্ষয় হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অঙ্গীকার থেকে দেশকে পুরোপুরি অমানবিক ধনতন্ত্রের দিকে টেনে নিয়ে আসা হয়েছে যেখানে অর্থই হলো সকল ক্ষমতা ও সম্পর্কের চাবিকাঠি; যেখানে দেশপ্রেম, সততা, মেধা ও ত্যাগের এক পয়সা মূল্য নেই!

অপরদিকে রাজনীতিকে রাজনীতিকদের জন্যে কঠিন থেকে কঠিনতর করা হয়েছে! দেশকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে গণবিরোধী আমলাতন্ত্রের গ্রিবে। সবকিছু পর্যবেক্ষণ করলে এ ধারণা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে,
ক্ষমতার সাথে জড়িত অসৎ ও সুবিধাবাদী রাজনীতিক, লুটেরা ব্যবসায়ী-শিল্পপতি ও দুর্নীতিবাজ আমলারা জোটবদ্ধ হয়ে একে অপরকে সহযোগিতা ও রক্ষা করছে; দেশকে লুটেপুটে খাচ্ছে। আর সবচেয়ে একটি ভয়ঙ্কর কালো আইন করা হয়েছে, তাহলো, দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মচারী/কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে! প্রশ্ন হলো, সরকার বলতে এখানে কাকে বুঝানো হয়েছে তা স্পষ্ট নয়।অপরদিকে কোনো ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ হলে একথা বলতে নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হবে না যে, যে কর্তৃপক্ষ কারো দুর্নীতির বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমতি দেবেন, সে-কর্তৃপক্ষ নিজেই তো বড়ো দুর্নীতিবাজ! ফলে কোনো দুর্নীতিবাজ অন্য কোনো দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে মামলার অনুমতি দিতে পারে না, এটাই সত্য। অর্থাত্ সবকিছুর মূলে রয়েছে অর্থের ভাগাভাগি। এই যে রাজনীতিকে জটিলকরণ ও অর্থের ভাগাভাগির কার্যক্রম এ কুটিল চক্রান্তের রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক ব্যবস্থার জাঁতাকলে দেশ ও জাতি পিষ্ট হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ার ফলশ্রুতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পদদলিত হচ্ছে।

দেশের এমনসব আর্থসামাজিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দেউলিয়াপনাকে পুঁজি করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অঙ্গীকারের বিপক্ষ শক্তি হিশেবে ধর্মীয় জঙ্গিবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির চরম উত্থান ঘটেছে। গ্রামেগঞ্জে হাটেমাঠে শহরেনগরে মাদ্রাসা-মসজিদে প্রচারমাধ্যমে ওয়াজ নসিহতের নামে চলছে অশিক্ষিত মূর্খ গোঁয়ার ধর্মান্ধ মোল্লাদের লাগামহীন সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ও উস্কানির বন্যা। এরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি চরম বিষোদ্গার করে এগুলোকে কুফরি মতবাদ বলেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, ইসলামী ধর্মের মধ্যে থাকা আহমদীয়া সম্প্রদায়কে কাফের ঘোষণাসহ যাকে-তাকে অমুসলমান মুরতাদ নাস্তিক ও বিধর্মী বলে ফতোয়া দিচ্ছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরম বন্ধু ভারতকে বাংলাদেশের শত্রু হিশেবে চিহ্নিত করে এদেশের মানুষকে ভারতবিরোধী করার লক্ষ্যে তারা আদাজল খেয়ে নেমেছে। ভারত বিরোধিতার নামে তারা ইসলাম ধর্মের আবরণে পাকিস্তানি প্রেমকে জাগ্রত করছে। মোট কথা বাংলাদেশকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে ঐ গুটিকতক দুর্নীতিবাজ লুটেরা ও মাফিয়াদের সাথে গাটছড় বেঁধে দেশের রাজাকার চেতনার ধর্মান্ধ মোল্লা সমাজ হেন কোনো কাজ নেই যা তারা সুচারু করে যাচ্ছে। সবকিছু পর্যালোচনা করে মনে হয় যেনো তাদের এসব অপকর্মের পশ্চাতে সরকারের মধ্যকার আরেকটি সরকারের ইন্দন কাজ করছে ! মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়ে দেশপ্রেম সংঘটিত করা যেখানে উচিত ছিলো, সেখানে হেফাজতের রাজাকারদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে শহর নগর বন্দর গ্রাম ও গঞ্জের সর্বত্র নানান কিংভূতকিমাকারি আরবী নামের মাত্রাতিরিক্ত মসজিদ মাদ্রাসা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করে ইসলামের নামে মূলত: ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা প্রচার ও প্রসার ঘটিয়ে সেগুলোকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা রাষ্ট্রীয় মূলনীতিমালার বিপক্ষে বিষোদ্গার করা হচ্ছে। দেশের মানুষের বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের রাস্তাঘাটের উন্নয়নসহ এ করোনা মহামারীকালে যেখানে চিকিৎসা সেবা সবচে' জরুরী, তা না করে সেখানে অতিসম্প্রতি হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উপজেলা উপজেলায় মডেল মসজিদ তৈরি করা হচ্ছে কাদের স্বার্থে ? যেখানে দেশের আনাচেকানাচে মসজিদ-মাদ্রাসা গিজগিজ করছে, মাদ্রাসা ও মসজিদ কেন্দ্রিক রাজনীতির নামে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ধর্মান্ধ রাজনীতির চর্চা হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাশবিকতা ও বলৎকারের মতো অপকর্ম সংঘটিত হয়, সেখানে ধর্মের কোন স্বার্থে এসব ব্যয়বহুল অপ্রয়োজনীয় মসজিদ তৈরি করা হচ্ছে তা আমাদের বোধগম্য নয়।

দেশের এহেন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, দুর্নীতি লুটপাট ও মাফিয়াতন্ত্রসহ ধর্মান্ধ অপশক্তির বিরুদ্ধে যে নৈতিক আদর্শিক ও দেশপ্রেমমূলক ব্যবস্থা নিয়ে সরকার অগ্রসর হবে, তারও তেমন ন্যূনতম পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। সরকার যেনো যখন যেমন তখন তেমন ধরনের অবস্থার মধ্যে হাবুডুবু খেয়ে শুধু দিন পার করার নীতিতে চলছে। আদর্শ, চেতনা ও সুদূরপ্রসারী হিসেব না রেখে শুধুমাত্র ক্ষমতা ভোগ ও লুটপাটের সহযোগী বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অকারণ নীরব ভাগিদারের অপবাদ নিয়ে আর যা-ই হোক দেশের মানুষের কল্যাণ করা যায় না। দেশবাসীর মন জয় করা যায় না।

মুক্তিযুদ্ধের সাগরসম রক্ত ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সীমাহীন শৌর্য ত্যাগ ও বীরত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কি একটি দুর্নীতিবাজ লুটেরা মাফিয়া ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়ে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হতেই থাকবে? সাম্প্রতিক দেশের সবচেয়ে বড়ো জঙ্গি রাজাকার সংগঠন হেফাজতে ইসলাম নষ্টামি ভণ্ডামি গুণ্ডামি ও অরাজকতা সৃষ্টি করার একটা পর্যায় এসে চরমভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। সরকার এ সুযোগে হেফাজতে ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মীয় রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোকে আইন করে নিষিদ্ধসহ সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী রাষ্ট্রধর্ম ও বিসমিল্লা উঠিয়ে দিতে পারে। হেফাজতে ইসলাম তথা মোল্লাদের ধর্মব্যবসা ও নানান অনৈতিক কার্যকলাপের কারণে দেশের জনমত এখন তাদের বিপক্ষে অবস্থান করছে । মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে যদি সত্যিই আওয়ামী লীগ সরকারের দায়বদ্ধতা থাকে তাহলে তারা দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একই সঙ্গে দুর্নীতিবাজ লুটেরা ও মাফিয়াদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারে। এদের বিরুদ্ধে জনমত বহু পূর্ব থেকে সংঘটিত হয়ে আছে। আওয়ামী লীগকে মনে রাখতে হবে, দুর্নীতিবাজ লুটেরা ধর্মান্ধ ও মাফিয়া চক্র এক ও অভিন্ন। একটির সাথে আরেকটির যোগসূত্র রয়েছে। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এক্ষুনি যা করার করতে হবে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতার রাজনৈতিক জীবনে এমন সুবর্ণ সুযোগ কোনোদিন আসেনি। এখন এসেছে। এ সুযোগটি যদি তারা কাজে লাগাতে পারে, তাহলে দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ দেশবাসী আওয়ামী লীগের পেছনে ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা দৃঢ়তা নিয়ে অবস্থান নেবে ।

আমাদের সন্দেহ হচ্ছে, আজ আওয়ামী লীগের ভেতরেই যে দুর্নীতিবাজ লুটেরা মাফিয়া ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির শক্তিশালী অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে, তাদের বাধা অতিক্রম করে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড দেশকে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের মূলধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন কিনা! তবে যদি তারা তার দল ও দলের বাইরের অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তর থেকে বেছে বেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের সৎ মেধাবী ও ত্যাগী লোকদের সরকারের মধ্যে অবস্থান দেন, তাহলে তার দলের ভেতরের ও বাইরের দুর্নীতিবাজ লুটেরা মাফিয়া ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তি কিছুই করতে পারবে না । বল এখন আওয়ামী লীগের কোর্টে। কীভাবে খেলে তারা গোল দেবে, সেটি এখন তাদের এখতিয়ারে ।

লেখক :মুক্তিযোদ্ধা লেখক গবেষক।

পাঠকের মতামত:

২১ সেপ্টেম্বর ২০২১

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test